সত্য গম্ভীর স্বরে বলে, ঠাকুরের যদি এখনো জাত থেকে থাকে, শালগেরাম নাড়ার অধিকার থেকে থাকে তো আমারও কলকাতায় গিয়ে জাতের হানি হবে না।
আবার সেই এক কথা, পুরুষের আড়াই পা বাড়ালেই শুদ্ধ, মেয়েমানুষের তাই হবে? চামড়া দেওয়া কলের জল খেতে হবে, তা জান?
খেতে হলে খাব। সেখানের আরও দশজন ব্রাহ্মণ-সজ্জনের যা গতি হচ্ছে, তাই হবে। কেন, হালদার-বাড়ির মেজ ছেলে যায় নি কলকাতায়?
বৌ নিয়ে যায় নি!
তা মরা বৌকে কি আর শুশান থেকে তুলে নিয়ে যাবে?
হালদারের ছেলে গেছে চাকরি করতে সত্য দৃঢ়ভাবে বলে, তুমিও ভাই যাবে।
আমি? উপহাসের হাসি হেসে ওঠে নবকুমার, আমি যাব কেন বল?
কেন নয়? তুমি যত ইংরেজি শিখেছ, এ তল্লাটে আর কেউ শেখেনি।
অন্য দিন হলে নবু অবশ্যই স্ত্রীর এই স্বীকৃতিতে বিগলিত হত। কিন্তু আজ নেই সে সুর। তাই বলে, শুধু বিদ্যে থাকলেই তো হবে না।
সত্য জাড়া ভুরু কুঁচকে বলে, তা আর কি থাকা দরকার?
বিপদের মুখে ফস্ করে সত্যি কথাই বলে বসে নবু, দরকার সাহসের।
সত্য এক মিনিট চুপ করে থেকে ঝুপ করে শুয়ে পড়ে বলে, আচ্ছা সেটা তোমার আছে।
কিন্তু এত বড় আশ্বাসেও কি বিশেষ কাজ হল? হল না। নবকুমার ক্রুদ্ধ চিৎকার করলো, পরের চাকরি করতে যাবই বা কেন? ঘরে আমার ভাতের অভাব? দেখেশুনে চালাতে পারলে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে কাটিয়ে দিতে পারি তা জানো? কি জন্য করবো দাসত্ব?
সত্য গম্ভীরভাবে উত্তর দিলে, বসে খাবো এ বাসনা ঘোচাবার শিক্ষা পেতেই যাওয়া দরকার।
চলল অনেক কথা-কাটাকাটি। আর বহুক্ষণ কাটাকাটি করে নবকুমার এই কথাই ব্যক্ত করল, আমার দ্বারা হবে না, এই স্পষ্ট বলে দিচ্ছি।
মৃত্যও দৃপ্তস্বরে বলে উঠল, আমিও স্পষ্ট বলে রাখছি, কলকাতায় আমি যাব যাব যাব যে মানুষ কলকাতায় গেলে আকাশের বজ্জর এসে মাথায় পড়ে কিনা তা দেখব।
কিন্তু সে দৃশ্য কবে দেখতে পেয়েছিল সত্য? তখুনি কি?
না, দেখতে তার আরো অনেকদিন লেগেছিল।
ভিজে ন্যাকড়াকে তাতিয়ে শুকিয়ে সে ন্যাকড়ায় সলতে পাকিয়ে তাতে প্রদীপ জ্বালাতে হলে সময় একটু লাগবে বৈকি। ততদিনে সত্য দুটি ছেলের মা হয়েছে।
২৫. শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্তের অচ্ছেদ্য শৃঙ্খলা
শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বসন্তের অচ্ছেদ্য শৃঙ্খলার শূলে বন্দী এই নিয়মতান্ত্রিক পৃথিবী রাজ্যটার প্রধান প্রজা মানুষগুলোর জীবনের কিন্তু না আছে নিয়মের নিশ্চিন্ততা, না আছে শৃঙ্খলার আশ্বাস। তাকে না বিধাতা, না প্রকৃতি, কেউ কোনদিন দেয় নি নিশ্চিত নিয়মের ভরসা।
তাই সহজ সুস্থ মানুষও রাতে ঘুমুতে যাবার আগে স্থির বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারে না, সকালের আলো সে দেখবেই! বলতে পারে না, তার ভরা বসন্তের মাঝখানে বজ্রের অভিশাপ নেমে আসবে না, শরতের সোনালী আলোকে মুছে দিয়ে শুরু হয়ে যাবে না অপ্রতিরোধ্য ধারা বর্ষণ।
না, জোর করে এসবের কিছুই বলতে পারে না মানুষ। সে জানে না কখন তার আশায় গড়া সুখের ঘরখানি তছনছ করে দিয়ে যাবে অতর্কিত মৃত্যুর নিষ্ঠুর থাবা অথবা সে ঘরকে বিকল করে দিয়ে যাবে আকস্মিক দুর্ঘটনা অথবা দুরারোগ্য ব্যাধি। কে বলবে এই অনিয়মের দেবতা কোথায় বসে আছেন তার অমোঘ নিয়ম নিয়ে!
তবু রামকালী কবরেজের সংসারে উপর্যুপরি দুর্ঘটনাগুলো দেশসুদ্ধ লোককে হতচকিত করে দিল।
আগুন লেগে বাইরের বড় আটচালা ভস্মীভূত হয়ে যাওয়াটাতেও কেউ অতটা বিস্ময় বোধ করে নি, কারণ হুতাশনের ক্ষুধাটা ভাগ্যের মার হলেও তার মধ্যে মানুষের অসতর্কতা অথবা মানুষের কারসাজির ছাপটা স্পষ্ট দেখা যায়। তা ছাড়া রামকালীর উপর ভাগ্যের মারটা সেই প্রথম।
না, রামকালীর আটচালায় আগুন লাগার মধ্যে কেউ শত্রুর কারসাজি আবিষ্কার করতে যায় নি। ওটা যে নিতান্তই অসতর্কতার ফল এটা সবাই বুঝেছিল। ব্যাপারটা এই
এ বাড়ি থেকে আগুন সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া কাছাকাছির প্রায় প্রতিটি পড়শীরই নিয়ম। বরাবরই সে-সব বাড়ির কেউ না কেউ নিজেদের প্রয়োজন মাফিক সময়ে এসে এ বাড়ির রান্নাঘর থেকে একখানা জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে যায়। ঘরে তাদের উনানে শুকনো নারকেলপাতা, খটখটে খুঁটে অথবা সরু করে কুচনো কাঠকুটো ডালপালা সাজানোই থাকে, জ্বলন্ত কাঠখানা এনে তাতে সংযোগ করে দিতে পারলেই মিটে গেল কাজ।
কিন্তু এ তো সবে প্রথম।
এর কয়েক দিন পরেই দীনতারিণী ঘাট থেকে চান করে এসেই হঠাৎ শরীর কেমন করছে বলে পক্ষাঘাত হয়ে পড়লেন।
পক্ষাঘাত পাতক রোগ, দীনতারিণীর তা অজানা নয়। ছেলের দিকে তাকিয়ে তিনি অশ্রু কলঙ্কিত চোখের ইশারায় কাতর আবেদন করলেন, তাকে তাড়াতাড়ি পার করতে।
রামকালী শুধু কপালের ঘাম মোছার ছলে একবার কপালে হাত ঠেকালেন।
দিনতিনেক পরেই মারা গেলেন দীনতারিণী।
না, অত বড় বদ্যি হয়েও মাকে বাচাতে পারলেন না বলে কেউ দুষল না রামকালীকে। বরং দীনতারিণীর ভাগ্যিকে ধন্যি ধন্যি করতে লাগল সবাই। বলল, খুব গিয়েছে বুড়ী। ভুগল না ভোগাল না, এমন মৃত্যুই তো কাম্য।
তবে এ কথা বলতে ছাড়ল না, বছরটা একটু সাবধানে থেকো রামকালী, অগ্নির কোপ, তায় মহাগুরু নিপাত, সময়টা তোমার ভাল যাচ্ছে না।
পাড়ার বয়োজ্যষ্ঠরাই বলেন, এ ছাড়া আর কার সাহস।
রামকালীর কাকা-দাদা তো সাধাপক্ষে তাঁর সামনে আসেনি, সামনে আসে রাসু, কবরেজী শেখে কাকার কাছে। তবে প্রায়ই হতাশ করে কাকাকে। রামকালী কখনো ভ্রূকুটি করেন, কখনো হেসে ফেলে বলেন, তোর কিছু হবে না রাসু!
