সদুর ইচ্ছে করছিল যে ছুটে গিয়ে বৌকে বলে, ভাল চাস তো পায়ে ধরে মাপ চাই গে যা! কিন্তু জানে সে কথা বলা বৃথা। স্বয়ং বৈকুণ্ঠের নারায়ণ এলেও সত্যকে স্বমতে আনতে পারবেন না। অনেক গুণ আছে বৌয়ের, কিন্তু ওই এক মহৎ দোষ। জেদ। মেয়েমানুষের এত জেদ? আজকের ব্যাপারটাকে সদু যেন কোন দিক থেকেই সমর্থন করতে পারছে না।
তাই চেষ্টা সে এদিক থেকেই করে।
তা বাড়ি ছেড়ে তোমরা যাবে কেন শুনি? বাড়ি কি তোমার ছেলে-বৌয়ের?
না হোক, যেখানে ওর মুখ দেখতে হবে সেখানে থাকব না, ব্যস! এতক্ষণে মুখ খোলেন নীলাম্বর, এ কথাটি বলেন তিনিই।
তা বাড়ি থেকে তো অমনিমুখে যাওয়া চলবে না, ভাত-ডাল চড়িয়েছি আমি। মুখে দিতে হবে। এ যেন আপাতত সমুদ্রে বালির বাঁধ।
চড়িয়েছিল সত্যিই, কিন্তু রান্নাঘরের অবস্থা সম্পর্কে এখন আর কোন জ্ঞান নেই সদুর। কাঠ পুড়ে উনুন নিভে ঠাণ্ডা হয়ে বসে আছে নিশ্চিত।
সহসা নীলাম্বর একটা প্রবল হুঙ্কার দিয়ে মাটিতে পা ঠোকেন, ভাত-ডাল! এ ভিটেয় আমি আর জলগ্রহণ করব ভেবেছিস তুই?
সদুর বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। মামীর সঙ্গে সে অনেক কথা চালাতে পারে, কিন্তু মামা? উল্লাসীর হাতে পান-জল খাওয়া ইত্যাদি করে বহু ইতিহাস তো তার জানা। তবু তো কই ভয়ে মরে নি। আর ওই বৌ কোথায় পেল সেই ভয়-জয়ের মন্ত্র, যে মন্ত্রের জোরে স্বচ্ছন্দে বলা যায় উনি তো পতিত, শালগ্রামের পূজো করা ওঁর উচিত নয়?
বেশী গভীরে ভাবার ক্ষমতা থাকে না সদুর, শুধু ভাবতে থাকে, নবাটা আবার আজকেই হাটে দেরি করছে। আর এই ভয়ানক দুর্দিনে কি হাটবারও হতে হয়?
সদু কি করবে?
গিয়ে বৌয়ের পায়ে ধরবে? না কি রান্নাঘরে শেকল তুলে দিয়ে কোথাও আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকবে? তারই বা এত ভয়-পাবার কী আছে– তার দোষে তো আর নবকুমারের মা-বাপ দেশত্যাগী হচ্ছে না?
সাহস দেখে কি সাহস জন্মায়?
দুঃসাহস দেখে দুঃসাহস?
তাই সে হঠাৎ অন্য মূর্তি ধরে, ঠিক আছে, চুলোয় জল ঢেলে দিই গে। বলে চলে যায়।
আশ্চর্য আশ্চর্য!
গিয়ে দেখে সত্য কিনা রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে শাক বাছছে। মুখ দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
সদুর আর সহ্য হয় না। সে বলে ওঠে, ও পিণ্ডির কাজ করে আর কী হবে? গিলবে কে? বাড়ির কর্তা-গিন্নী তো সংসার ত্যাগ করছে!
সদুকে অবাক করে দিয়ে সত্য বলে, সংসার ত্যাগ করা অত সোজা নয় ঠাকুরঝি! সংসার ত্যাগ করতে বসে কেউ সমস্ত সংসারটাকে পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে যেতে চায় না! মিছে ভাবছ, কেউ কোথাও যাবে না। উনুনে আমি কাঠ ঠেলে দিয়েছি, তুমি দেখ এইবার।
তা সত্যর কথাই ঠিক।
শেষ পর্যন্ত কত্তা- গিন্নী দেশত্যাগের বর্জন করে থেকেই গেলেন। শুধু ভাত খাবার সময় একটু বেশী সাধ্যসাধনা করতে হল সদুকে!
থেকে গেলেন অবশ্য নবকুমারের নির্বেদে। নবকুমার দুজনের পায়ে মাথা খুঁড়ে “রক্তগঙ্গা” হতে চাইল, আর মায়ের পা ছুঁয়ে শপথ করল বৌকে শাসন করে দেবে।
ছেলের এতটা কাতরতা সহ্য করতে না পেরেই বোধ করি ওঁরা এ যাত্রায় যাত্রা স্থগিত রাখলেন।
আর এই এতদিনের মধ্যে কখনো যা করে নি নবু, আজ তাই করে বসল। দিনের বেলায় কথা কয়ে বসল বৌয়ের সঙ্গে।
কিন্তু বৌকে কি বাগ মানাতে পেরেছিল নবু? বকে, খোশামোদ করে, পায়ে পড়তে গিয়ে? না, এ কথা কোনদিন সত্যর মুখ দিয়ে বার করতে পারে নি নবকুমার, আমার অন্যায় হয়েছে। শুধু শেষ পর্যন্ত যখন নব আত্মঘাতী হবার ভয় দেখিয়েছিল তখন সত্য বলে উঠেছিল, ঘেন্না ধরে যাচ্ছে সবেতেই। পুরুষ না হয়ে মেয়েমানুষ হয়ে জন্মাও নি কেন তুমি, এই বিধেতার রহস্য। বেশ, ছেদ্দা শূন্য পেন্নামে যদি তোমাদের এত দরকার থাকে তো করব কাল থেকে সেই ন্যাকরা।
রাত্রে অবশ্য নবকুমারের ভিন্ন রূপ।
সুন্দরী তরুণী স্ত্রীর সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধের দুঃসহ কষ্ট বহন করবার মত শক্তি তার নেই, তাই যেচে বলে, মা-বাপকে শুনিয়ে শুনিয়ে একটু শাসন করতে হল, নইলে বলবে, ছেলে বৌকে মাথায় তুলে রেখেছে।
আজ আমার কথা কইতে মন নেই, ক্ষমা দাও।
বলে পাশ ফিরে শুয়েছিল সত্য।
আর বেশ কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ ধড়মড়িয়ে উঠে বলেছিল, আমি কলকাতায় যাব।
নবকুমার চমকে বলে, কলকাতায়! কলকাতায় যাবে তুমি? এতক্ষণে বুঝতে পারছি, মাথাটাই বিগড়েছে তোমার!
কেন, মাথা না বিগড়োলে কলকাতায় যায় না কেউ? তোমার মাস্টারের মাথা খারাপ?
মাস্টার? মাস্টারের সঙ্গে তোমার তুলনা? তিনি বেটাছেলে, একা যাচ্ছেন একা আসছেন, গিয়ে বন্ধুর বাসায় উঠছেন, তুমি কোন্টা করবে?
সত্য তীব্রস্বরে বলে বেটাছেলে আমি নয়, তুমি তো? তুমি যেতে পারবে না? তোমার সঙ্গেই যাব। বাসা করে থাকবো।
নবকুমার স্তম্ভিত হয়ে বলে, তোমার সঙ্গে সঙ্গে আমি তো উন্মাদ হই নি! মা-বাপ দেশ-ভিটে ছেড়ে যাব কিনা কলকাতায় বাসা করতে? কেন শুনি?
কেন তা শুনবে? দেখতে যাবে তোমাদের এই বারুইপুরের বাইরেও আর জগৎ আছে!
দেখে আমার দরকার?
সত্য চরম ধিক্কারের স্বরে বলে, দরকার? কী দরকার, তাও তোমাদের এই বারুইপুরের গর্তয় পড়ে থেকে বোঝার ক্ষমতা হবে না!
নবকুমার এ কথার অর্থ ধরতে পারে না, একটা জোরালো যুক্তিই জোর দিয়ে বলে, মেয়েমানুষ কলকাতায় যাবে! জাতধর্ম কিছু আর থাকবে তা হলে?
