বলে কল্পিত ওদিকের দিকে তাকায় সদু।
এলোকেশী বলেন, ছেদ্দায়-অছেদ্দায় দৈনিক একবার শ্বশুর-শাশুড়ীর পায়ে মাথাটা নোয়ানো, আজ থেকে বুঝি সে বরাদ্দ বন্ধ?
নীলাম্বর মহিম্নস্তবের মাঝখানে উৎকর্ণ হয়ে ওঠেন। ততক্ষণে সদু হাওয়া। ওখানে গিয়ে এস্তেব্যস্তে বলে, কী রে বৌ, এখনো পেন্নামটা ঠুকে আসিস নি বুঝি?
সত্য হাতের কাজ সেরে উদাস মুখে বসেছিল। ঘাড় না ফিরিয়েই বলে, না।
শাশুড়ীর টনক নড়েছে। যা যা, চট করে সেরে আয়।
যেন ভুলে গেছে সত্য, তাই মনে পড়িয়ে দেওয়া।
সত্য গম্ভীরভাবে বলে, দুজনে একত্রে বসে, একজনকে প্রেণাম করলাম, একজনকে করলাম না, ভাল দেখায় না। ঠাকরুন এদিকে আসুন, তখন হবে।
সদু এবার বিরক্তি গোপন করে না। বলে, তোর আবার বড় বেশী বাড়াবাড়ি বৌ! স্বভাব দোষ আর কটা বেটাছেলের নেই? তালুই মশাইয়ের মতন দেবচরিত্র কি আর সবাই? তা বলে স্বভাব-দোষের অপরাধে শ্বশুরের পাওনা পেন্নামটা রদ হয়ে যাবে?
বাবার কথা তুলে কাজ নেই ঠাকুরঝি, তবে আমার যাতে মন নেয় না, সে কাজ আমি করতে পারি না। এক হিসাবে উনি পতিত। শালগেরামের পূজো ওঁর দ্বারা হওয়াই উচিত না।বলে সত্য জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। বোধ করি মানসিক উত্তেজনাতেই।
সদুর কিছুক্ষণ আর বাকশক্তি থাকে না।
খানিক ‘খ’ বনে দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলে, তোর মত লেখাপড়া শিখি নি বৌ, এ কথা বোঝবার ক্ষমতা নেই। আমি সার বুঝি, যে যা করে করুক, আমার কর্তব্য আমি করে যাব।
মনে অভক্তি দেখানোটাই কি কর্তব্য ঠাকুরঝি?
সদু চট করে এ কথার জবাব দিতে পারে না, কি যেন একটা বলতে যায়, কিন্তু ইত্যবসরে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন বাঘিনী। মনের মধ্যে তার সন্দেহের ধোয়া। যেন বুঝেছেন একটা কিছু হয়েছে।
বাঘিনীর মতই হাঁক করে রঙ্গস্থলে পড়েন তিনি, কোতব্য অকোতব্যের কথা কি হচ্ছে রে সদু?
সদু চুপ।
সত্যও চুপ।
এলোকেশীই ফের প্রশ্ন করেন, মুখে কথা নেই কেন? কী শলাপরামর্শ হচ্ছিল দুজনে শুনি? তুই সদু আমার খাবি পরবি আর আমারই বৌ ভাঙাবি? কবে বিদেয় হবি তুই আমার সংসার থেকে?
কথাটা নুতন নয়, এটাই এলোকেশীর কথার মাত্রা। প্রতিবাদ সদু কোনদিনই করে না, কিন্তু আজ হঠাৎ বিচলিত স্বরে বলে ওঠে, শলা-পরামর্শ আমি তোমার বৌকে কোনদিন দিই নি মামী, সৎ পরামর্শই দিই। সত্যিমিথ্যে বৌই বলুক।
বৌয়ের অবশ্য শাশুড়ীর সামনে কথা বলবার কথা নয়। কিন্তু সত্য যখন-তখনই নিয়ম লঙ্ন করে বসে, তাই আজও ফস্ করে বলে, সে কথা হাজারবার সত্যি। ঠাকুরঝি আমাকে সৎ পরামর্শই দিতে এসেছেন। কিন্তু সে পরামর্শ আমার মনে নেয্য বলে না ধরলে তুমি ইদিকে এসেছ ভালই হয়েছে- বলে সত্য মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে শাশুড়ীর পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে বলে, যতই যা হোক তুমি সতীলক্ষ্মী।
সতীলক্ষ্মী অবশ্য প্রথমটা বেশ কিছু হকচকিয়ে যান, তারপর বলেন, এ সবের মানে কি সদি?
মানে বুঝতে আমিও অপারগ মামী, সদু বেজার মুখে বলে চলে যায়, বৌ পারে তো নিজে বুঝিয়ে বলুক!
সত্যিই আজ তার ভারী রাগ হয়েছে। এ আবার কী রে বাবা! তিলকে তাল করা! ডেকে অশান্তি টেনে আনা! বিশ্বভুবনে যে কথা কেউ কখনো শোনে নি, বলে নি, ভাবে নি– সেই কথা ওই মেয়ের মাথায় আসেই বা কী করে? আর বুকের পাটা? এযাবৎ সত্যর অনেক বুকের পাটা দেখেছে সদু, দেখে মূর্ছিত হব-হব হয়েছে, কিন্তু আজকের সঙ্গে যেন কোন দিনের তুলনাই হয় না!
তা সত্যিই তুলনা হয় না।
কারণ সদু চলে যেতে যেতে শুনতে পায় সত্য বলছে, বলতে মাথা কাটা গেলেও না বলে পারছি নে, ঠাকুরের পায়ের ধুলো মাথায় ঠেকাবার প্রিবৃত্তি আর আমার নেই। যতদিন না জানতাম, ততদিন–
কথার শেষাংশ শোনবার ক্ষমতা আর হয় না সদু। ঝপ করে বিনা প্রয়োজনে একটা ঘড়া নিয়ে ঘাটে চলে যায়।
.
অনেকক্ষণ পরে ঘড়া কাঁথে নিয়ে আস্তে আস্তে থাকায় দাঁড়ায়। কোথাও কেউ নেই, সব যেন নিথর তবে কি একটা হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে? এটা শ্মশানের নিস্তব্ধতা?
দাওয়ায় উঠে কিন্তু অবাক হয়ে গেল সদু। দেখে মাঝের ঘরের দরজার কাছে গোটা দুই তিন গামছাবাঁধা পুটুলি, আর মামা-মামী দুজনে মিলে এক খানা ছেঁড়া কাপড়ে বড় একটা ধামা বাঁধছেন। ধামা অবশ্য বোঝাই, কি আছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এটা অপ্রত্যাশিত। সদুর বুকের রক্ত হিম করে।
এই সময়টুকুর মধ্যে হঠাৎ গোছগাছ হয়ে গেল? আর কেনই বা হল?
এঁরা কি তাহলে বৌয়ের সঙ্গে পেরে না উঠে দেশত্যাগী হচ্ছেন?
কথাটা তাই। এ আর এক অভিনব রূপ এলোকেশীর।
সদুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই এলোকেশী বলেন, ননদ-ভাজে পুণ্যির সংসার কর সদু, পাপী তাপীরা বিদেয় হয়ে যাচ্ছে!
সদু ঘড়া নামিয়ে বসে পড়ে বলে, মামী তুমি কি ক্ষেপেছ?
তা ক্ষেপলে জগৎ দুষতে পারবে না সদু। দশে-ধর্মে সবাইকে শুধিয়ে এস, এতেও যদি মানুষ না ক্ষ্যাপে তো কিসে ক্ষ্যাপে!
ও তো একটা পাগল! ওর কথা আবার ধর্তব্য! গলা নামিয়ে বলে সদু।
পাগল! আঝাড়া কেউটে! তুই আর বৌয়ের হয়ে ওকালতি করতে আসিস না সদি। এত বড় একটা মান্যিমান মানুষ, পুতবৌয়ের ধিক্কারে জীবন বিসর্জন দিতে যাচ্ছিল। অনেক বুঝিয়ে নিবৃত্তি করে যাচ্ছি এখন গুরুপাটে। তার পর যা আছে অদৃষ্টে।
জোরে জোরে গাঠরি বাঁধতে থাকেন এলোকেশী।
