হঠাৎ সত্যর সর্বশরীর আলোড়ন করে প্রবল একটা কান্নার উচ্ছাস আসে আর এই দীর্ঘকাল পরে বাপের ওপর তীব্র অভিমানে হৃদয় বিদীর্ণ হতে থাকে তার।
এ সংসারে এসে অনেক নীচতা অনেক ক্ষুদ্রতা অনেক হৃদয়হীনতা দেখেছে সত্য, সবই এদের অশিক্ষা-কুশিক্ষার ফল বলে সহ্য করে নিয়েছে, কিন্তু আজকে এই একটা বুড়ো লোকের চরিত্রহীনতার নোংরামি তাকে যেন আছড়ে মারছে।
তাই যে সত্য উৎপীড়নেও কখনো কাঁদে না, সে আজ কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে বলতে থাকে, বাবা বাবাগো, দশটা নয় পাঁচটা নয়, একটা মাত্তর মেয়ে আমি তোমার, দেখেশুনে এমন ঘরেও দিয়েছিলে! এত তুমি বিচক্ষণ, আর এই তোমার বিচার!
অনেকক্ষণ কেঁদে কেঁদে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে সত্য।
.
কিন্তু রাতে কম ঘুমিয়েছে বলে সকালবেলা পর্যন্ত ঘুমোবে, এত সুখ তো আর বৌ-মানুষের ভাগ্যে ঘটে না। যথারীতি ভোরে উঠে স্নানশুদ্ধ হয়ে নারায়ণের ঘরের গোছ করতে ঢুকল সত্য ভারাক্রান্ত মনে, আর অভ্যাসমতন চন্দন-পাটাখানা টেনে নিয়ে চন্দন ঘষতে গিয়েই কথাটা একটা বিদ্যুৎ-শিহরণ এনে দিল ওর মধ্যে।
সত্যর এই যত্ন করে চন্দন ঘষা, ফুল-তুলসী বাছা, ধূপ-ধুনোয় ঘর ভর্তি করে তোলার মূল্য কি?
এসব উপকরণ নিয়ে পূজো করবেন তো এখন নীলাম্বর বাঁড়ুয্যে! তার আবার কাশির ধাত বলে প্রাতঃস্নান করবেন না, মুখ হাত ধুয়ে তসর ধুতিখানা জড়িয়ে এসে পূজোর আসনে বসেন।
কিন্তু স্নান করলেই বা কি?
দেহ মন আত্মা সবই যার অশুচি, স্নানে আর কী শুদ্ধ হবে সে? হাত গুটিয়ে চুপ করে বসে থাকে সত্য হাঁটুতে মুখ রেখে। ফুল তোলা হয় না, তুলসী চয়ন হয়।
অনেকক্ষণ পরে সৌদামিনী কি কাজে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, কি হল বৌ, অমন করে বসে যে?
সত্য অবশ্য নির্বাক।
সদু ব্যগ্রভাবে দরজার চৌকাঠ অবধি এগিয়ে এসে বলে, শরীর খারাপ করছে?
সত্য মাথা নাড়ে।
তবে? বাপের বাড়ির জন্যে মন উতলা হচ্ছে বুঝি? সত্যি, কতকাল হয়ে গেল
সত্য হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, বাপেরবাড়ির জন্যে মন উতলা হতে কখনও দেখেছ ঠাকুরঝি, তাই বলছ? সদু তার বড় ননদ, তবু একটু প্রশ্রয় তার কাছে আছে।
সদু হেসে ফেলে বলে, তা দেখি নি বটে, তা হলে বরের সঙ্গে কেদল?
বকো না ঠাকুরঝি, অত তুচ্ছ ব্যাপারে তোমাদের বৌ হারে না। আমার মন ভাল নেই, আজ থেকে পূজোর ঘরের কাজ আর আমি করব না।
সদু হঠাৎ এই অভাবিত ঘোষণায় স্তম্ভিত হয়ে বলে, সে কি কথা বৌ!
ওই কথা ঠাকুরঝি। গুরুজনের কথায় বলতে কিছু চাই নে, কিন্তু ঠাকুর এসে পূজোর আসনে বসবেন মনে করে পূজোর গোছ করবার প্রবৃত্তি আমার হরে যাচ্ছে।
সদু ভয়ের চোটে নিজের মুখোনাতেই একবার হাত চাপা দিয়ে আস্তে-আস্তে বলে, ও কি সব্বনেশে কথা বৌ, মামীর কানে গেলে আস্ত থাকবি?
সত্য মুখটা ফিরিয়ে শুকনো গলায় বলে, এ সংসারে আর আস্ত থাকবার বাসনা আমার নেই ঠাকুরঝি!
সদু প্রমাদ গনে।
এ আবার কী কথা রে বাবা! এর মূল কারণ যে সত্যর কালকের সেই শ্বশুর-সম্পর্কিত প্রশ্ন তাতে আর সন্দেহ নেই, বোধ করি প্রশ্নের উত্তর তার জানা হয়ে গেছে। কিন্তু তার সঙ্গে এই রণমূর্তির সঠিক সম্বন্ধ অনুমান করতে পারে না সদু।
পারবার কথাও নয়।
সদুর অনেক বয়স হয়েছে, এসব ব্যাপার তার কাছে কিছুই নয়। আশেপাশে অহরহ দেখতে দেখতে হাড়মাস কালি। কাজেই নিজের স্বামী-পুত্র ব্যতীত আর কারও চরিত্রহীনতায় যে এত বিচলিত হওয়া সম্ভব ও সদুর বোধের বাইরে।
কিন্তু অন্য বিষয়ে সদু বুদ্ধিমতী, তাই এ কথা নিয়ে বেশী বাজাবাজি না করে বলে, আচ্ছা বেশ, আমি চট করে চানটা সেরে এসে দিচ্ছি গুছিয়ে, তুমি চলে এস।
রাগ করো না ঠাকুরঝি, আমার মন কিছুতেই নিচ্ছে না তাই। তোমার কি কি কাজ আছে দেখিয়ে দাও, আমি করছি। বলে সত্যিই পূজোর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সত্য।
কিন্তু পূজোর ঘরের তুলসী-চন্দনের দায় না হয় সদু সামলালে, বধূজনোচিত আরও যে একটা কাজ রয়েছে সকালবেলাকার।
সে দায় কে সামলাবে?
সকালবেলা জল মুখে দেবার আগে শ্বশুর-শাশুড়ীর পদবন্দনা সত্যর নিত্য কর্মপদ্ধতির একটি অঙ্গ। এলোকেশীই শিখিয়েছেন সদু মারফৎ।
সত্যও অবশ্য সে শিক্ষা মেনেই চলেছে এযাবৎ।
কিন্তু আজ সত্যর ভয়ানক এক দুঃসাহসিক সংকল্প। আস্ত তাকে না থাকতে হয় তাও ভাল, তবু ওই অপবিত্র মানুষটার পায়ের ধুলো মাথায় নেবে না সে।
গুরুজন?
তা আর কি করা যাবে? গুরুজন যদি ইতরজনের মত আচরণ করে!
.
এলোকেশীও নিত্য সকালবেলা স্নান সেরে এসেই পূজোর ঘরে ঢোকেন। সাংসারিক কাজের তো কোন দায় নেই। সদু আছে, বৌ আছে। আর এলোকেশীর আছে দেব-দ্বিজে পরমা ভক্তি। নীলাম্বরও সারা সকাল ওইখানেই থাকেন, চণ্ডীর পুঁথি পড়েন, মহিম্নস্তব আওড়ান।
কর্তাগিন্নীর যাবতীয় বিশ্রম্ভালাপ এইখানেই। কারণ সে আলাপের যেটা প্রধান সময় সে সময়টা এলোকেশীর হাতের বাইরে। মশারী-বক্তৃতার উপায় কোথা?
তা এইখানেই রোজ একত্রে দুজনকে প্রণাম করে যায় সত্য।
কিন্তু আজ আর সত্যর দেখা নেই।
এলোকেশী কিছুক্ষণ পরে সদুকে ডেকে বিরক্তি ব্যঞ্জক স্বরে বলে, আজ আর নবাব-নন্দিনীর দেখা নেই যে! গেলেন কোথা?
ব্যাপার বুঝতে সদুর দেরি হয় না। এবং বৌয়ের এই বেখাপ্পা গোয়ে একটু বিরক্তই হয় সে, তবু সামলে নিয়ে বলে, যাবে আর কোথায়? এই তো ওই দিকে
