রাত্রে তাই ঘরে ঢুকেই প্রথম ওই কথাটাই পাড়ে সত্য, আচ্ছা, রোজ রাত্তিরে ঠাকুর কোথায় যান বল তো?
হ্যাঁ, কিছুদিন হল রাত্রির অধিকার পেয়েছে সত্য। সদুরই প্রচেষ্টায় আর সদুর প্রচেষ্টাটা নবকুমারের প্রতি করুণাতেই। নইলে বৌ তো কিছুতেই হেলে দোলে না।
নববধূর স্বপ্নে বিভোর নবকুমার অবশ্যই এ হেন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই থতমত খেয়ে বলে, কোথায় আবার! তুমি জান না?
জানলে তোমায় শুধোতাম না। নবকুমার গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, বাপ গুরুজন, তার কথা নিয়ে আলোচনা না করাই ভাল।
সত্য ভুরু কুঁচকে বলে, গুরুজনের নিন্দে করাই না হয় ভাল নয়, গুরুজনের কথা মাত্তরই কওয়া দোষ?
নবকুমার গম্ভীরতর হয়ে বলে, তা এ তো নিন্দেরই কথা। বামুনের ছেলে হয়ে বান্দী-পাড়ায় যাওয়া, তাদের হাতের পান-জল খাওয়া, এসব কি আর খুব গুণের কথা!
বান্দীপাড়ায় যাওয়া!
তাদের হাতে পান-জল খাওয়া!
সত্যকে যেন তার স্বামী হঠাৎ ধরে ধোবার পাটে আছাড় মারল।
সত্যও তাই থতমত খায়।
বলে, ও কথার মানে?
সত্যর বয়সের দিকে তাকায় না নবকুমার, বৌ সকল জ্ঞানের আধার হবে, এইটাই ধারণা তার। তাই উদাস গলায় বলে, মানে যদি না বোঝ তো নাচার! বাপের সম্পর্কে স্পষ্ট করে আর কী বলব? কথায় বলে– পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম। নইলে পথেঘাটে যখন উল্লাসী বান্দিনীকে দেখি, তখন কি আর রাগে ব্রহ্মাণ্ড জ্বলে যায় না? কিন্তু কী করব, মনকে প্রবোধ দিতেই হয়, ভাবতে হয় যতই হোক মাতৃতুল্য।
পূজনীয় পিতৃদেব সম্পর্কে কিছু বলব না বলেও সবটুকুই বলে ফেলে নবকুমার নিশ্চিন্ত হয়ে স্ত্রীকে সমাদর করে কাছে টানতে যায়।
কিন্তু এ কী!
নিত্যকার প্রফুল্ল প্রতিমা সহসা প্রস্তর-প্রতিমায় পরিণত হল কেন? সত্যিই সত্যর সর্বশরীর যেন পাথরের মতই কঠিন হয়ে উঠেছে।
আর সেই শরীরের মধ্যেকার মনটা?
সেই মনটাও কি কাঠ হয়ে উঠল? অজানিত একটা ভয়ে?
হ্যাঁ, ভয়েই।
অনেক অনেক দিন আগে বালিকা সত্যর নিঃশঙ্ক চিত্ত যেমন ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল কাটোয়ার বৌ শঙ্করীর এক অজানা অন্ধকার লোকের বার্তা শুনে, তেমনি ভয়ে। কিন্তু সেদিন ছিল শুধুই অন্ধকার, শুধুই ভয়। কিন্তু আজ সেই অন্ধকারের মাঝখানে জ্বলে উঠেছে একটা তীব্র বিদ্যুৎশিখার চোখ-ধাঁধানো আলো।
আজকের সত্য সেদিনের অবোধ বালিকা নয়, সংসার-তত্ত্বের অনেক কিছুই তার জানা হয়ে গেছে। তাই ভয়ের গাঢ় অন্ধকারের মাঝখানে দপদপ করে জ্বলে উঠেছে ঘৃণার বিদ্যুৎশিখা।
বার দুই চেষ্টার পর নবকুমার হতাশ হয়ে বলে, হলটা কি তোমার? সারা দিনের পর দুটো সুখ-দুঃখের কথা কইব, একটু হাসি-আনন্দ দেখব এই আশায় হাঁ করে থাকি—
সত্য রুদ্ধস্বরে বলে, হাসি-আনন্দ তো কুমোরবাড়ির হাঁড়ি-কলসী নয় যে ফরমাস দিলেই পাওয়া যায়, হাসি-আনন্দের মতন মন না থাকলে?
নির্বোধ নবকুমার পরিহাসের ব্যর্থ চেষ্টায় বলে, তা এতে তোমার এত মন খারাপের কী আছে? আমি তো আর কোনও বান্দিনীর সঙ্গে ভালবাসা
থামো থামো তীব্র ধিক্কারের স্বর ছড়িয়ে পড়ে বদ্ধ ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে।
শীতের রাতের সুবিধে, একটু গলা খুলে কথা কওয়া চলে। আর সত্যি কথা বলতে, সত্য এমন কিছু লজ্জাবতী বৌও নয়। গলার শব্দ তার যখন-তখন শুনতে পাওয়া যায়।
ধিক্কার দিয়ে সত্য গায়ের কথাটা টেনে গলা পর্যন্ত ঢেকে ওদিকে মুখ করে শুয়ে বলে, ওই ঘেন্নার কথা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লজ্জা হয় না তোমাদের? আমি কিন্তু এই পষ্ট বলে দিচ্ছি, এরপর থেকে যদি ঠাকুরকে আমি ছেদ্দাভক্তি না করতে পারি দুষো না আমায়।
এর পর নবকুমার কথা কইবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মনে মনে নিজেকে গালাগাল দিতে থাকে। ছি ছি, কী একটা গাধা সে! বললেই হত, বাবা কোথায় যায় আমি জানি না! বৌকে তো সে চেনে। ভাল মেজাজে আছে তো গঙ্গাজল, মেজাজ বিগড়ে গেল তো আগুনের খাপরা।
বাবা, কী যে একবগ্গা মেয়ে! কবে একদিন সেই নবকুমারের কী-একটা মিথ্যে কথা ধরে ফেলে একেবারে পাঁচ দিন কথা বন্ধ! অবশেষে নবকুমার নিতাইয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে একটা শাস্তরের শ্লোক আউড়ে বোঝায়, পরিবারের সঙ্গে মিথ্যে কথায় পাপ নেই, তবে বৌয়ের মুখের কুলুপ খোলে। অবিশ্যি শাস্ত্রবাক্য মেনে নিয়ে নয়, মুখ খোলে প্রতিবাদের মুখরতায়।
সেদিন তেজের সঙ্গে বলেছিল সত্য, থাক থাক, আর শাস্তর আওড়াতে হবে না। যে শাস্তর বলে মিথ্যে কথায় পাপ নেই, সেই শাস্তরে আমার অরুচি। পরিবার বুঝি একটা মানুষ নয়, ভগবান বাস করে না তার মধ্যে? এর পর আর তোমার কোন কথা মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বেস করব আমি?
সে যাই হোক, তবু ঝগড়ার সূত্রেও কথার দরজা খুলেছিল। এবার আবার কি না-জানি হয়!
আর সত্য?
সে ভাবছিল, ছি ছি, এই চরিত্র তার শ্বশুরের! যাকে ‘ঠাকুর’ বলে সম্বোধন করতে হয় তাকে। চরিত্রের অন্য বহুবিধ ক্রটি সে দেখেছে শ্বশুরের, নীচতা ক্ষুদ্রতা স্বার্থপরতায় গিন্নী এলোকেশীর থেকে কিছু কম যান না তিনি, এযাবৎ সে-সবই মনে মনে মেনে নিয়েছে সত্য আর ভেবেছে ত্রিসংসারে আমার বাবার মতন আর কজন হবে?
কিন্তু এ কী!
এ যে ঘৃণায় লজ্জায় সমস্ত রক্তকণা ছি-ছি করে উঠছে। এই বয়সে এই প্রবৃত্তি! আর সব চেয়ে আশ্চর্য কথা, এরা সে কথা সবাই জানে! অথচ সত্য নির্বোধ, সত্য ন্যাকা, তাই এতদিন দেখেও শ্বশুরের এই রাত-চরার অর্থ কোনদিন আবিষ্কার করার চেষ্টা করে নি। সত্যরা ঘুমিয়ে পড়ার অনেক পরে যে তিনি বাড়ি ফেরেন এ কথা তো বরাবরই দেখেছে। তার মানে বোঝে নি। না না, এ শ্বশুরকে সে ভক্তি-ছেদা করতে পারবে না, তাতে সত্যকে যে যাই বলুক।
