কিন্তু কাজ হয়নি। এলোকেশী শাপমন্যি দিয়ে ভূত ভাগিয়েছিল।
সত্যবতী বলেছিল, আমি বাবাকে কথা দিয়েছিলাম বিয়েতে যাবো
নবকুমার সদু মারফৎ সে কথা শুনে জবাব দিয়েছিল, সমাজে আমাদের মুখটা হেঁট হয়, এই যদি কেউ চায় তো যাক।
সদু ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হঠাৎ হেসে ফেলে বলেছিল, খুব তো বিজ্ঞের মত কথা বলছিস, আসল ব্যাপারটা কি বল্ দেখি? বৌকে তো এখনও ঘরে পাস নি, তবু এত মন-কেমন?
সদুর এই কথায় হঠাৎ নবকুমারের কর্তাত্ত্বি ঘুচে গিয়েছিল। য্যাঃ বলে ঝপ করে সরে গিয়েছিল। বোধ করি এ কথাও ভেবেছিল, সদুদি কি অন্তর্যামী?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যবতীই বেঁকে বসল। সদু যখন বহু চেষ্টায় রফা করেছিল, নেমন্তন্ন রক্ষা করতে নবকুমার যাবে, সেই সঙ্গে বৌ যাবে তিনটি দিনের কড়ারে, বরকনে বিদেয় হবে ওরাও চলে আসবে, তখন সত্যবতী হঠাৎ বলে বসল, দরকার নেই আমার এই একমুঠো ভিক্ষেয়। তিন দিনের মধ্যে তো পাড়া ভেসে যাক– বাড়ির সব লোকগুলোর মুখও দেখে ওঠা হবে না, সে যাওয়ায় লাভ! লোকে শুনবে সত্য এসেছিল, সত্য চলে গেছে, ছিঃ!
দেখ কথা! ভাত পায় না– গয়না চায়! মুষ্টিভিক্ষেই যে জুটছিল না, তবু বিয়েটাও তো দেখতে পাবি?
থাক, নাই দেখলাম। যার নেমন্তন্ন রক্ষের কথা সে যাক।
সে আর গিয়েছে!
সদু মন্তব্য করে। এবং ঠিকই করে। নবকুমার জোড়হাতে বলে, রক্ষে কর বাবা!
অতএব শেষ রক্ষা করেন নীলাম্বর।
তিনি রামকালীর প্রেরিত লোকের হাতে পত্র দিয়ে দেন, নবকুমার বাবা-জীবনের গর্ভধারিণী মৃত্যুশয্যায়, সে কারণে কাহারও যাওয়া সম্ভবপর হইল না, পত্রবাহকের হাতে লৌকিকতা বাবদ দুই টাকা পাঠালাম।
.
রামকালী সেই পত্র পেয়ে দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে আস্তে বলেছিলেন, ও টাকা দুটো তুই জলপানি খাস রাখু… আর শোন, বাড়ির মধ্যে বলে দিগে যা, সত্যর শাশুড়ী মরমর, তাই আসা সম্ভব হল না।
তারপর যথারীতি বিয়ে হয়ে গেছে, বৈশাখ কেটেছে, জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় সব কেটে গেছে, রামকালী তার জামাতা বাবাজীবনের গর্ভধারিণীর মৃত্যুসংবাদ পান নি।
এই না পাওয়াটা কি একটা মরুভূমির রুক্ষ বাতাসের মত? যে বাতাস সমস্ত কোমলতা আর সরসতা মুছে নিতে পারে? নইলে রামকালী আস্তে আস্তে এমন নীরস কঠিন হয়ে গিয়েছেন কেন? কেন বেহাইয়ের সঙ্গে দ্রতারক্ষা হিসেবে বেহানের কুশল সংবাদ প্রার্থনা করেন নি? কেনই বা ভেবেছেন, মেয়ে আনার জন্যে হ্যাংলামি করার মধ্যে অগৌরব আছে?
অন্তঃপুরের মধ্যে একখানি বিচ্ছেদ-ব্যাকুল মাতৃহৃদয় যে রামকালীর এই কাঠিন্যের সামনে মূক বেদনায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে, সেটা বোঝবার ইচ্ছে হয় নি কেন রামকালীর?
রামকালী কি ভেবেছিলেন, এবারও সেই একফোঁটা মেয়েটাই বাপের কাছে অহঙ্কারের পরিমাপ দেখিয়েছে! দৃঢ়তার অহঙ্কার, কাঠিন্যের অহঙ্কার! বলতে চেয়েছে, দেখ, আমিও কম যাই না! এই অভিমানহত পিতৃহৃদয়টি এই অন্ধকারে দিশেহারা হয়ে চুপ করে থেকেছে আর ভেবেছে, দেখা যাক!
কিন্তু কতদিন দেখবেন রামকালী?
অসমবয়সী এই দুটো মানুষের দাবা খেলার চালের অবসরে কত ব্যাপারই ঘটে গেল। যে ব্যাপারের একটা ঘটলেও মেয়ে বাপের বাড়ি ছুটে আসতে পারে। কিন্তু বলা তো চাই? মেয়ের বাপ গলায় বস্তর দিয়ে আবার আর্জি পেশ করবে তবে তো?
তা করছেন না রামকালী।
অতএব আরও একবার বর্ষা শরৎ শীত বসন্ত পার হয়ে গেল নিজস্ব নিয়মে।
২৪. নীলাম্বর বাঁড়ুয্যে নিত্যনিয়মে
নীলাম্বর বাঁড়ুয্যে নিত্যনিয়মে সন্ধ্যা-গায়ত্রী আহ্নিকপূজো ইত্যাদি সেরে গৃহদেবতা নারায়ণশিলার প্রসাদী বাতাস দুখানি মুখে দিয়ে জল খেয়ে হাঁক দিলেন, সদু, আজ আর আমার জলখাবার গোছাস নে, শরীরটা তেমন ভাল নেই।
সদু দুটি চালভাজায় তেল-নুন মাখছিল মামার জন্যে। ঘরে ক্ষীরের তক্তি আছে, আছে নারকেলকোরা, ওতেই হবে। আজকাল আর রাত্রে বেশী কিছু খান না নীলাম্বর।
মামার কথায় বেরিয়ে এসে বলে সদু, কেন, শরীরে আবার তোমার কি হল মামা।
কি জানি কেমন খিদে নেই।
বলে যথারীতি বেনিয়ানটি গায়ে এটে আলোয়ান কাঁধে ফেলে নিত্যনিয়মিত রাত চরতে বেরিয়ে যান নীলাম্বর।
সত্যবতী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে, শরীর খারাপ যদি, ঠাকুর আবার এই শীতের রাত্তিরে বেরোলেন কেন ঠাকুরঝি?
সদু হাসি চেপে বলে, কেন বেরোলেন, তুই নিজে জিজ্ঞেস করলেই পারতিস বৌ!
শোন কথা, আমি কথা কই?
ও, তা বটে! বলে সদু মুখ টিপে হাসে।
সত্য হঠাৎ সদুর হাত চেপে ধরে সন্দিগ্ধ স্বরে বলে, আচ্ছা ঠাকুরঝি, ঠাকুর বেড়াতে বেরোলেই তুমি অমন হাসো কেন বল তো? কোথায় যান?
সদু অমায়িক মুখে বলে, ওমা, হাসি আবার কখন! যান বোধ হয় দাবা-পাশার আড্ডায়!
তা শরীর খারাপ হলেও যেতে হবে? ঝড়বৃষ্টি বজ্রাঘাত কোনমতেই কামাই চলবে না? বারণ করতে পার না তোমরা?
বারণ? ও বাবা! ও আকর্ষণ যমের আকর্ষণের বাড়া! বলে আর একবার হাসি চাপে সদু।
আমি ঠাকুরের সঙ্গে কথা কইলে ঠাকুরের ওই মারাত্মক নেশা ছাড়িয়ে দিতাম।
তা সেই চেষ্টাই নয় করিস। নিজে বলতে না পারিস বরকে দিয়ে বলাস। সে উপযুক্ত ছেলে বাপের এই বদ নেশা যদি ছাড়াতে পারে!
সদু এবার হাসি চাপে না, হাসে।
কথাটা যে সত্যর মনে লাগল তা নয়, বরং সদুর কথার মধ্যে সে একটা প্রচ্ছন্ন কৌতুকের আভাস পেল। তার শ্বশুরের এই আড্ডায় আকর্ষণটা যে ঠিক দাবাপাশার আড্ডা নয়, এই সন্দেহই বদ্ধমূল হল।
