ভুবনেশ্বরী অবিরল কেঁদে মাটি ভিজিয়েছে, সত্যর বন্ধুরা গাল থেকে আর হাত নামাতে পারে নি, সত্য নিশ্চল থেকেছে। শুধু যখন সারদা বলেছে, নিজের পায়ে নিজে কুড়ল মারলে, ঠাকুরঝি? তখন বলেছে, কুড়ল তো বাবা সেই আট বছর বয়সে গলায় বসিয়ে রেখেছেন বৌ, নতুন আর কি হল?।
তবু আরও একটা বছর থাকতে পেতে।
এতখানি জীবনে একটা বছর কম-বেশীতে আর কি বা হবে বৌ! রাগের মাথায় তারা ওই বিয়ে না কি বলেছে, তাই করলে তো সারাজীবন সতীনের জ্বালায় জ্বলতে হবে!
সারদা একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করেছে।
আর যখন ভুবনেশ্বরী কেঁদে-কেটে মেয়ের হাত ধরে বলেছে, আমাদের জন্যে তোর মন কেমন করছে না সত্য? তখন সত্য অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে উদাস গলায় বলেছে, করছে কি করছে না সে কথা কি ঢাক পিটিয়ে বলতে হবে?
তবে স্বেচ্ছায় যেতে চাইলি কেন?
কেন কথার মানে নেই। নিজেরাই তো বল, মা বড় নির্বোধ, কেঁদে কেঁদে মর, আপনি ভাবিয়া দেখ কার ঘর কর! তবে?
ভুবনেশ্বরী এতেও চৈতন্যলাভ করে নি, বলেছিল, আমার তো তবু এপাড়া ওপাড়া–তোর মতন দশ-বিশ ক্রোশ দূরে নয়–
কথা শেষ হয় নি।
এই সময় আর বাঁধ রাখতে পারে নি সত্য, হাপুসনয়নে কেঁদে ফেলে বলেছে, তা সে কথাটা সময়কালে ভাবো নি কেন? একটা মাত্তর মেয়ে আমি তোমাদের, চোখছাড়া দেশছাড়া করে এক অ-গঙ্গার দেশে বিদেয় করে দিয়েছ, মায়া-মমতা থাকলে পারতে তা? এই তো পুণ্যি মোটে একটা বছরের ছোট আমার চেয়ে, দিব্যি ড্যাংডেঙিয়ে বেড়াচ্ছে, আর আমায় সেই কোন কালে পরগোওর করে দিয়ে– গলাটা ঝেড়ে নিয়ে কথাটা শেষ করেছে সে, তা না দিলে, পারতো কেউ আমার গলায় গামছা দিয়ে টেনে নে যেতে? বাবা মেয়ে বলে মায়া করেন নি, গৌরীদান করে পুণ্যি করেছেন, আমারও নেই মায়া-মমতা। নির্মায়িক বাপের নির্মায়িক মেয়ে বলেই হঠাৎ মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে দীর্ঘ সময় ধরে।
তবু শ্বশুরবাড়ি যাওয়া কি হয় নি?
রামকালী আর রামকালীর মেয়ে দুজনেই সমান। দুজনের মতই কথা যখন দেওয়া হয়ে গেছে, তখন আর নতুন বিবেচনা চলে না।
বাপের আড়ালে আর মেয়ের সামনে আলোচনার ঝড় বয়েছিল।
.
এবারের পালা এই।
এবারে মোটামুটি সত্যর আড়ালেই। শুধু সদু বলেছিল, ধন্যবাদ তোমাকে বৌ, নমস্কার! ছিছিক্কার দেব, না পায়ের ধুলো নেব ভেবে পাচ্ছি না!
সত্য এর উত্তরে নিজেই হেঁট হয়ে সদুর পায়ের ধুলো নিয়ে হেসে বলেছিল, দুগগা দুগগা গুরুজন তুমি, ছিছিক্কারই দাও বরং! জন্মাবধি যা পেয়ে আসছি!
সত্যর মধ্যে যে বিরাট সমুদ্রের আলোড়ন চলছে তা কি সত্য লোকের সামনে মেলে ধরবে? হ্যাঁ, সমুদ্রের আলোড়নই। তবু বাপ চলে যাবার পর ভেঙে পড়ে নি সে। যথারীতি তারপরই তেল সলতে নিয়ে বসেছে পিদিম সাজাতে, তার পর ঘাটে গেছে, গা ধুয়ে কাপড় কেচে মস্ত ঘড়াটা ভরে এনে দাওয়ায় বসিয়ে ভিজে কাপড়েই ঠাকুরঘরে সন্ধ্যে দেখিয়ে শাঁখ বাজিয়ে তুলসীমঞ্চে জল দিয়ে, শুকনো কাপড় পরে রাত্তিরের রান্নার ব্যবস্থা করতে বসেছে।
রাত্তিরের রান্নাটা সত্যই করে আজকাল। সদুকে বলে বলে এ অধিকার অর্জন করেছে সে।
শুধু রান্না করতে করতে যে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল তার, ফাগুনের শেষ থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি আসতে কদিন লাগে, কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারে নি তার কোন সাক্ষী নেই।
.
কিন্তু সত্যর জীবন কি সেই বৈশাখের মাঝামাঝিটা দেখা দিয়েছিল আনন্দের মূর্তি নিয়ে? আলো-ঝলমলে উজ্জ্বল মূর্তি নিয়ে?
নাঃ। সে দেখা পায় নি সত্য।
পুণ্যির বিয়েতে যাওয়া হয়নি তার। ঠিক সেই সময় এলোকেশী রক্ত-আমাশয় পড়ে মরতে বসেছিলেন। আর কাঁথা মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকা মানুষটাই খিঁচিয়ে উঠে বলেছিল, কি বললি সদু, বাপের বাড়ির লোকের সঙ্গে যাবো বলে নাচছে হারামজাদী? বাপ যখন সোহাগ করে নিতে এসেছিল তখন যাওয়া হল না, এখন আমি মরতে বসেছি। বলে দিগে যা, যাওয়া হবে না, যে নিতে এসেছে। ধুলোপায়ে বিদেয় হোক।
মামী মরতে বসেছে বলে যে সদু ছেড়ে কথা কইবে তা কিন্তু করে নি। ঝঙ্কার দিয়ে বলেছিল সে, তারা তোমার লোককে টাটের শালগেরামের মতন পাদ্যঅর্ঘ্য দিয়ে বসিয়ে খাইয়ে মাখিয়ে আর এক পোঁটলা জিনিস দিয়ে বুক ভরিয়ে বিদেয় দিলে, আর তাদের লোককে ধুলোপায়ে বিদেয় দেবে? তা ভালো, মুখটা খুব উজ্জ্বল হবে। কিন্তু আমি বলি কি, দু-দশ দিনের জন্যে পাঠিয়েই দাও! ছেলেমানুষ–তাছাড়া শুনেছি ওই পিসিই চিরকালের খেলুড়ি।
এলোকেশী চিচি করে বলেছিলেন, তবে বল যেতে। তুমিই বা থাকবে কেন? তুমিও বিদেয় হও। শুধু যাবার আগে একখানা ছুরি এনে আমার গলায় বসিয়ে দিয়ে যাও।
সদু ছুরি দেয় নি, নিজেও বিদেয় হয় নি, শুধু সত্যর যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু মস্ত বাদ সাধল নবকুমার।
হঠাৎ পুরুষকর্তার ভূমিকা নিয়ে বেশ সোচ্চার ঘোষণা করে বসল, যাওয়া-টাওয়া হবে না কারুর। আমার মা মরছে, আর লোকে এখন খুড়তুতো পিসির বিয়ের ভোজ খেতে ছুটবে! বলে দাও সদুদি, সে গুড়ে বালি। যাওয়া বন্ধ থাক।
নবকুমারের ঘোষণায় কর্তা-গিন্নী পরম পুলকে নির্লিপ্ত সেজে বললেন, আমরা আর কি বলব? নবা যখন–
তবু সদু চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, সব সময় বুঝি নবার কথাতেই ওঠো বসো তোমরা?
