বৌয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ ছিল, সে পণ আর রাখতে পারলেন না এলোকেশী। সত্য যেখানে বসে পান সাজছিল, সেখানে তেড়ে গিয়ে বললেন, বাপ নিতে এসেছিল, গেলি না যে বড়?
সত্য একবার চোখ তুলে চোখ নামিয়ে পান মোড়ায় মন দিল।
কী, কথার উতুর দিলি না যে বড়? গেলি না কেন বাপের সঙ্গে পিসির বিয়েতে?
সত্য মৃদু গম্ভীর ভাবে বলে, বিয়ের তো এখনও দেরি।
তা বাপ তো আদিখ্যেতা করে নিতে এসেছিল!
বাবার কথায় ও-রকম অচ্ছেদ্দা করে কথা কইবে না। বলে মোড়া পানগুলো ডাবরে ভরে ভিজে ন্যাকড়া ঢাকা দিয়ে ধীর মন্থর গতিতে উঠে কুলুঙ্গীতে তুলে রাখে সত্য।
এলোকেশী রাগে দিশেহারা হয়ে বোধ করি আর কোন কথা খুঁজে না পেয়েই বলেন, সর্বনাশী লক্ষ্মীছাড়ি, কি ভেবেছিস তুই? বাপের ঘরে যাবি না, চিরকাল আমার বুকে বসে দাড়ি ওপড়াবি?
সত্য একবার ফিরে তাকিয়ে শাশুড়ীর দিকে একটি অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, সর্বনাশীকে যখন কুলো-ডালা দিয়ে বরণ করে ঘরে এনেছ, তখন চিরকাল তার বোঝা বইতে হবে বৈকি।
.
নবকুমার খবরটা পেল ভগ্নদূতের কাছে।
নিতাই বলে গেছে, তোর শ্বশুর আমাকে শুধু ভস্ম করতে বাকী রেখেছে!
কিন্তু নিতাইয়ের কথাগুলো নবকুমার গায়ে মাখল না।
নির্যাতিতা ধর্মপত্নীকে নির্যাতন থেকে উদ্ধার করবার সাধু সংকল্প নিয়ে নবকুমার অসমসাহসিক কাজ করেছিল, কিন্তু রামকালী ফিরে যাবার পর হঠাৎ নিজের মনের দিকে তাকিয়ে আবার বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল নবকুমার। আশ্চর্য, সত্যবতীর যাওয়া হল না দেখে তার মনের মধ্যে যেন একটা পুলকের ঢেউ উথলে উঠছে।
নবকুমার এ রহস্যের কিনারা করতে পারল না।
কিন্তু নবকুমারের জন্যে যে আরও কী অদ্ভুত রহস্য তোলা ছিল, তা কি সে দণ্ডখানেক আগেও ভেবেছিল?
রাত খুব বেশী নয়, সন্ধ্যেরাত্তির।
এলোকেশী যথারীতি বিছানায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আর নীলাম্বর যথারীতি রাতসফরে বেরিয়েছেন, সদু রান্নাঘরে কাঠের ‘দেলকো’র উপর মাটির প্রদীপ বসিয়ে রান্না করছে। নবকুমার বাড়ি ফিরে সন্তর্পণে অন্ধকার দালানটা পার হচ্ছিল, হঠাৎ পাশের ঘরের দরজার কাছ থেকে একটা চাপা মৃদু অথচ দৃঢ় গলায় কে বলে ওঠে, একটু দাঁড়াতে হবে!
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না নবকুমার এবং দাঁড়িয়ে যে পড়ে সেটা আদেশ পালনার্থে নয়, চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলে বলেই পড়ে।
এ কণ্ঠস্বর তার বাপের নয়, মা’র নয়, সদুর নয়।
অতএব?
বাড়িতে আর কে আছে? নবকুমারের স্বপ্নলোকবাসিনী ছাড়া?
অন্ধকারে কেউ কাউকে স্পষ্ট দেখতে পায় না– শুধু গলাটাই শোনা যায়, নিত্যেনন্দপুরে চিঠি পাঠিয়েছিল কে? আমার দুঃখ-কাহিনীর ব্যাখ্যা না করে?
বলাবাহুল্য নবকুমার দারুমূর্তিতে পরিণত। আর দারুমূর্তির কথা কইবার ক্ষমতা থাকা সম্ভব নয়।
উত্তর নেই যে?
নবকুমার একবার অস্ফুটে বলে, কি বলব?
স্পষ্ট উত্তর দেবে। আমার বাবাকে চিঠি দিয়েছিল কে?
এ কণ্ঠের প্রশ্নে নিরুত্তর থাকা নবকুমারের সাধ্যাতীত। কষ্টে বলে, আমার সঙ্গে কথা কইছ, কে কমনে দেখে ফেলবে!
আচ্ছা সে চিন্তে আমার। কথাটার উত্তুর ফাঁকি না দিয়ে হক জবাবটা দাও।
নবকুমার ঢোক গিলে, ঘাড় চুলকে, ঘেমে-টেমে বলে, আমি চিঠির কথা কি করে জানব? কিসের চিঠি?
দ্যাখো, মিথ্যে কথা কয়ো না, নরকে ঠাই হবে না। সত্যবতী রুদ্ধকণ্ঠে বলে, আমার নিয্যস জ্ঞান, এ তোমার কাজ!
সহসা নবকুমারের স্বামীত্ব এবং পৌরষ ধিক্কার দিয়ে ওঠে তাকে। তাই সেও সহসা ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, যদি দিয়েই থাকি, দোষটা কি হয়েছে? নিজেই তো মরছিলে!
অন্ধকার থেকে মৃদু তীক্ষ্ণ স্বর দ্রুত কথা কয়, মরছিলাম সেটা ঢাক পিটিয়ে বলে বেড়াবার, কুটুমের কানে তোলার মতন কথা নয়। যারা নিজের মায়ের গালে চুনকালি দেয়, তাদের আবার বিদ্যে-বুদ্ধির বড়াই! ঘরশত্রুর বিভীষণকে ত্রিজগতের লোকে ছিছিক্কার করছে বৈ ধন্যি-ধন্যি করে নি। এই বুঝে কাজ করো।
ঘরের অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যায় দরজায় দাঁড়ানো মূর্তিটার আভাস।
কণ্ঠস্বরের অনুরণনটুকুও বাতাসে মিলিয়ে যায়, অথচ নবকুমার না যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রথম পত্নী-সম্ভাষণের যে বহুবিধ রোমাঞ্চময় এবং আবেগময় মধুর কল্পনা নবকুমারের লাজুক হৃদয় এতদিন ধরে লালন করে আসছিল, তার উপর কে যেন একটা কালির দোয়াত উপুড় করে দিয়ে গেছে। স্ত্রীর সঙ্গে জীবনের প্রথম বাক্যবিনিময় এইভাবেই শেষ হয় নবকুমারের।
