জীবনের বিনিময়েও বাপের শান্তি বজায় রাখবে সত্য।
আর রামকালী? রামকালী সত্যর সেই কৌশলে বিভ্রান্ত হলেন, অভিমানে অন্ধ হলেন, আপন অহঙ্কার নিয়ে ফিরে এলেন।
আর এখন ফিরে যাওয়া যাবে না।
.
অপেক্ষা করতে হবে ন্যায্য সময়ের জন্য। পুণ্যির বিয়ের তারিখ ঘেঁষে কুটুম্বের মত আসবে সত্য। আসবে যদি ততদিন বেঁচে থাকে।
চোখ দুটো হঠাৎ লঙ্কার ঝাল লাগার মত জ্বলে উঠল। স্বভাব-বহির্ভূত তীব্রতায় পালকি থেকে মুখ বাড়িয়ে বেহারাদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন রামকালী, কচ্ছপের মত সমস্ত মাটি মাড়িয়ে হাঁটছিস যে তোরা, পায়ে জোর নেই?
চিঠিখানা যে “শত্তুরের রটনা”, এ কথাটা নেহাৎ ভুল নয়। বৌকে এলোকেশী নিত্যপ্রহারে জর্জরিত করেন, এ বললে এলোকেশীর প্রতি অন্যায় অবিচার করা হয়। মেরেছিলেন সেই একদিনই। বৌয়ের চুল বাঁধতে বসে। অবিশ্যি একটু আশ মিটিয়েই মারবেন বলে উঠোনের রোদে মেলে দেওয়া জ্বালানি কাঠ থেকে একখানা তুলে এনেছিলেন, কিন্তু সে কাঠ আর বৌয়ের পিঠে ভাঙবার সুখ তাঁর হয় নি। সর্বনেশে সৃষ্টিছাড়া বৌ হঠাৎ ঝট করে কাঠখানা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বেশ মজবুত গলায় বলে উঠেছিল, দেখ গুরুজন আছো গুরুজনের মতন থাক, শিরোধার্যে রাখব। নচেৎ তোমার ললাটে দুঃখু আছে। আমাকে তুমি চেনো না, তাই ভেবেছো আমার ওপর যা খুশি করবে। সে বাসনা ছাড়ো।
কথা শেষ না হতেই এলোকেশী হঠাৎ মড়াকান্না কেঁদে উঠে পাড়ার লোক জড়ো করেছিলেন।
তারপর তো সে এক হৈ-চৈ কাণ্ড, রৈরৈ ব্যাপার!
কিন্তু সত্যকে আর সে রঙ্গমঞ্চে দেখা যায় নি।
পাড়ার পাঁচজনের বিস্ময়োক্তিকে সদু থামিয়েছিল, নতুন ফাগুনের গরমে মামীমার মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে বলে। বলেছিল অবশ্য নেপথ্যে ডেকে নিয়ে গিয়ে চুপিচুপি জনে জনে বলেছিল।
তারপর মামীকে চুপিচুপি বলেছিল, সাপের ন্যাজে পা দিতে যেও না মামী, বৌটি তোমার যেমন তেমন নয়!
এলোকেশী সদুকে ন-ভূতো ন-ভবিষ্যতি গালমন্দ করে চিৎকার করে জানিয়েছিলেন–আচ্ছা, ওই বৌকে তিনি মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে গাঁয়ের বার করে দিতে পারেন কিনা দেখবে গাঁসুদ্ধু সবাই।
কিন্তু আশ্চর্য, কার্যক্ষেত্রে আর তা করে উঠতে পারলেন না। এই কথার পিঠে বৌ সদুকে উদ্দেশ করে বেশ স্পষ্ট গলায় বলে দিয়েছিল, ঘরের বৌকে মাথায় ঘোল ঢেলে গাঁয়ের বার করে দিলে যদি গায়ের কাছে তোমাদের মুখোজ্জ্বল হয় তো তা করতে বল ঠাকুরঝি তোমার মামীকে। তবে বিবেচনা করে দেখতে বলল, তা করলে কার গায়ে ধুলো দেবে লোকে!
এলোকেশী তেড়ে এসে বলেছিলেন, তবে আয়, তোকে আজ কেটে রক্তগঙ্গা করে নিজে ফাঁসি যাই! উঃ, বৌমানুষের এত কথা!
সত্য নিঃশব্দে রান্নাঘরের দাওয়া থেকে মাছ কাটবার বড় বঁটিটা তুলে এনে এলোকেশীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, তাই তবে কর, তখন তো আর আমি দেখতে আসব না, কার মুখটা পুড়ল!
আশ্চর্য, এই ঘটনার পরই এলোকেশী কেমন নিথর হয়ে গিয়েছিলেন। আর একটিও বাক সরে নি তার মুখ থেকে। কিছুক্ষণ সেই বঁটিখানার চকচকে ফলাটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে সরে গিয়েছিলেন।
আর তদবধি
তর্জন-গর্জনের পথ থেকে সরে এসে বাক্যালাপ বন্ধর পথ ধরে চলেছিলেন এলোকেশী। এবং তলে তলে ক্রমাগত নীলাম্বরকে মন্ত্রণা দিচ্ছিলেন, বৌয়ের গহনাগাটি সব কেড়ে নিয়ে কোন ছলে ছুতোয় বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। একবার পাঠিয়ে দিতে পারলে জীবনেও আর ওই সর্বনেশে জাহাবাজ মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে আসছেন না।
কিন্তু ছলছুতো খুঁজতে খুঁজতে দিন গড়িয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ এমনি সময় রামকালীর আবির্ভাব।
হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন এলোকেশী। এবং নিশ্চিত ঠিক করে ফেলেছিলেন, এই সূত্রে বৌকে জন্মের শোধ বিদায় দেবেন। কারণ ইত্যবসরে আর একটি মেয়ে এলোকেশীর দেখা হয়ে গেছে, বয়স সাত-আট, ধরন-ধারণ খুব নিরীহ, সর্বোপরি তার বাপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীনে-সোনার গহনায় মেয়ের সর্বাঙ্গ মুড়ে দেবে।
ঐ মহামন্ত্রটি স্বামীকে অনবরত জপিয়েছেন এলোকেশী।
অতএব এক কথায় রাজী হয়েছিলেন নীলাম্বর বৌ পাঠাতে। স্বপ্নেও ধারণা করতে পারেন নি, বৌ নিজে বেঁকে বসবে।
রামকালী চলে যেতে এলোকেশী পতির প্রতি জ্বলন্ত কটাক্ষ করে বলেন, বুঝলে কত বড় জাহাবাজ ধড়িবাজ মেয়ে? বলে নি তোমায় আমি, ও মেয়ের হাড়ে ভেলকি খেলে!
নীলাম্বর বলেন, দেখছি বটে।
তা হলে বল, ওই বৌ নিয়ে ঘর করতে হবে আমায়? একে তো ওই লক্ষ্মীছড়ি সদিকে নিয়ে হাড়ে হাড়ে জ্বলছি, তার সঙ্গে আবার ওই বৌ! আর দুটিতে মিল কত! আরও ওই জন্যেই বৌকে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করতে চাই। আর–আরও একটা কথা, চুপি চুপি বলেছিলেন এলোকেশী, এখনো ঘরে দিই নি তাই, ওই ছক্কা-পাঞ্জা বৌ যেই সোয়ামীকে হাতে পাবে, সেই তো একেবারে জয় করে নেবে! আর কি আমার নবু আমার থাকবে? তার থেকে আমার বকুলফুলের ওই দ্যাওর-ঝিটা হাবাগোবা মতন আছে–
কিন্তু বেয়াই যখন চলে গেলেন তখন কিন্তু আর নীলাম্বর এ কথা বলতে পারলেন না, ভাল চান তো মেয়ে নিয়ে যান মশাই, নইলে কুলোর বাতাস দিয়ে বার করে দেবো!
নীলাম্বরের একটা ত্রুটি আছে। বুকের পাটাটা তার যতই থাক, মুখের জোরটা কম।
এলোকেশী গালে-মুখে চড়িয়ে বললেন, কী বলব, ব্যাই বেটাছেলে, তার সঙ্গে তো আমার কথা কওয়া সাজে না, নইলে একবার দেখে নিতাম সে বা কত বড় ঘুঘু আর ওই বাপ-সোহাগী বেটিই বা কত বড় হারামজাদী!
