তারপর রামকালী চলে এসেছিলেন।
সত্য আর এক দফা প্রণাম করেছিল।
.
কিন্তু এখানেই তো ইতি নয়।
মেয়েকে না নিয়েই যে চললেন বেহাইমশাই? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল রামকালীকে। আর মিথ্যা কথা বানিয়ে বলতে না পারার জন্যে বিদ্রূপ-হাস্যরঞ্জিত বিস্ময়-প্রশ্নও শুনতে হয়েছিল।
সত্যর শ্বশুর সেই তার মেয়েলী ভঙ্গীতে গালে হাত দিয়ে বলেছিলেন বলেন কি বেহাই মশাই, মেয়ে বাপের ঘর যেতে চায় না! এ যে বড় তাজ্জব কথা শোনালেন দেখছি!
নিজের জন্যও ততটা নয়, রামকালীর মনে হয়েছিল, কুকুরের কামড় হাঁটুর নিচে কিন্তু সত্যর শ্বশুর সম্পর্কে যে তাঁর ওই প্রবাদটা সহজেই মনে আসতে পারল, এটাও তো কম গ্লানির কথা নয়।
আশ্চর্য, ওদের ব্যবহারে বিনয় আর সৌজন্য প্রকাশের ঘটা তো কম ছিল না, তবু কেন রামকালীর ওদের স্থূল অমার্জিত মনে হয়েছিল? জামাইটা অবশ্য নেহাৎ বোকা-বোকা, প্রকৃতি কেমন কে জানে। তা সেই তো মাত্র একবার দেখা দিয়েই উধাও হয়ে গেল।
বন্ধুটাকে তবু আবার দেখলেন, কিন্তু জামাইকে নয়।
বন্ধুটা যে সত্যর শ্বশুর-শাশুড়ীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
শ্রদ্ধার যোগ্যই নয় ওরা।
তবু আর একবার বুকটা কেমন মুচড়ে উঠল রামকালীর, তবু সেই শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে দিব্যি মিশে গেছে সত্য। এমন মিশে গেছে যে শাশুড়ীর শরীর-স্বাস্থ্যের অজুহাতে বাপের বাড়ি যাওয়ার প্রলোভন ত্যাগ করল।
সুযোগ পেয়েও বাপের বাড়ি যেতে চাইল না, এ রকম মেয়ে রামকালী কি তাঁর এতখানি জীবনে এর আগে কখনো দেখেছেন? অথচ ঠিক বোঝাও যাচ্ছে না তাকে।
হয়তো তাকে আর কোন দিনই বোঝা যাবে না। রামকালীর মেয়ে রামকালীর কাছ থেকেই অনেক দূরে চলে গেছে, হয়তো আরও অনেক অনেক দূরে চলে যাবে। সেই সত্যকে আর কোনদিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
চির নিঃসঙ্গ রামকালীর অন্তরের একটিমাত্র ছোট্ট সঙ্গী, রামকালীর আকাশের আলো-ঝিকঝিকে ছোট্ট একটি তারকা চিরদিনের মত হারিয়ে গেল।
হঠাৎ চিন্তায় ছেদ পড়ল।
.
চোখে পড়ল পালকির পাশ দিয়ে বেহারাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর একটা মানুষও দৌড়চ্ছে।
কখন থেকে দৌড়চ্ছে?
হঠাৎ কোথা থেকেই বা এল? কিছু বলতে চায় নাকি?
রামকালী বেহারাদের আদেশ দিলেন থামতে।
আর তারপরই নজরে পড়ল, এ সেই নিতাই, তার জামাইয়ের বন্ধু।
কি খবর?
কিসের একটা প্রত্যাশায় রামকালীর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কি ভাবলেন তিনি? তার সত্যবতীই কী আবার বাপকে ফিরিয়ে আনতে ডাক দিয়েছে? এখন কেঁদে ফেলে বলবে, মেয়ের মুখের কথাটা তুমি দেখলে বাবা, তার অভিমানটাকে দেখলে না? একবার না করেছি তো রাগ দেখিয়ে চলে গেলে?
অনেকগুলো কথা মনের মধ্যে হুড়োহুড়ি করে উঠল, তবু সংযত কণ্ঠেই প্রশ্ন করলেন রামকালী, কী খবর?
নিতাই হাঁপাচ্ছিল।
একটু জিরিয়ে নিয়ে বলে, বাচালতা মার্জনা করবেন তালুই মশাই, বলতে এসেছি– এ কী করলেন? মেয়ে নিতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন? বাঁড়ুয্যে মশাইয়ের কাছে হেরে গেলেন?
রামকালীর মুখ লাল হয়ে ওঠে।
কষ্টে আত্মসংবরণ করে বলেন, বাচালতা মার্জনা করা শক্ত হচ্ছে!
বুঝেছি। কিন্তু বড় আশায় হতাশ্বাস হয়েই ছুটে এসেছি। আপনার কন্যাকে নিয়ে গেলেন না বটে, কিন্তু এর পর আর হয়তো মেয়েকে জীবিত দেখতে পাবেন না। হয়তো আত্মঘাতী হয়ে– মেয়ে তো আপনার ভাঙে তো মচকায় না!
সহসা রামকালী চাপা ভারী গলায় প্রবল একটা ধমক দিয়ে ওঠেন, দেখতে তো বেশ ভদ্ৰসন্তান বলে মনে হচ্ছে, প্রকৃতি এমন ইতরের মত কেন?
ইতরের মত!
নিতাই বিহ্বল ভাবে তাকিয়ে থাকে।
রামকালী স্বভাবগম্ভীর স্বরে বলেন, অপর গৃহের কুলবধূ সম্পর্কে কোন আলোচনা ইতরতারই নামান্তর।
বেশ। নিতাই অভিমান-ক্ষুব্ধ মুখ নিচু করে বিদায়-প্রণাম করে বলে, আর কি বলব বলুন! তবে একা আমিই আসপর্দা করি নি। আপনার জামাই নবকুমারই, ঢোক গিলে বলে নিতাই, সে বলছিল চোখের সামনে স্ত্রীহত্যে দেখব, প্রতিকার করব না? তাই আমি–
নিতাই আস্তে আস্তে চলে যায়।
রামকালী স্তব্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন।
আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে রামকালী কি ওকে ফিরে ডাকবেন?
কিন্তু ডেকে তারপর?
আদ্যোপান্ত ঘটনা জেনে নিয়ে ফের আবার ছুটবেন জামাইবাড়ি?
তারপর?
আবার তাদের বলবেন, না, আমার ভুল হয়েছে, মেয়ে বালিকা, খামখেয়ালের বশে কি বলেছে। সে-কথা কথাই নয়, ওকে নিয়ে যাব?
আচ্ছা তার পর?
যদি সত্য আবার বলে, সে কি বাবা, আবার ফিরে এলে কি বলে? আমি তো বলেছি এখন যাওয়া হবে না?
তখন?
তখন কি করবেন রামকালী? সত্যর ওই কথার পর? বলবেন, পাগলী মেয়ে, পাগলামি রাখ, তোর মা তোকে না দেখে কেঁদে দিন কাটাচ্ছে! বলবেন, তোকে না নিয়ে একা ফিরতে আমার প্রাণটা হাহাকার করছে! বলবেন–
না, তা হয় না, আত্মমর্যাদাকে আর কত বিসর্জন দেবেন রামকালী?
তোল পালকি!
বেহারাদের হুকুম দেন রামকালী।
তারা যথারীতি গৃহাভিমুখেই চলতে থাকে।
আর রামকালী বিস্ময়ে মূক হয়ে বসে থাকেন সেই একক পালকিতে।
ধীরে ধীরে বিস্ময়ের ধূসরতা ফিকে হয়ে আসে।
কার্যকারণের চেহারাটা চোখে ভেসে ওঠে।
নীলাম্বর বড়য্যের কাছে হেরে যান নি রামকালী, হেরে গেছেন আপন আত্মজার কাছে। বুদ্ধির খেলায় রামকালীকে পরাজিত করেছে সত্য। বাপের কাছে প্রতিপন্ন করেছে, শ্বশুরবাড়িতে সুখে আছে সে, সন্তোষে আছে। তাই শ্বশুরবাড়ির কর্তব্যের কাছে বাপেরবাড়ির তীব্রমধুর আকর্ষণও তুচ্ছ করতে পারা অসম্ভব হল না তার।
