ঠাকুমা পিঠাকুমার দল থেকে শুরু করে বান্দী ঝিটা পর্যন্ত বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্যের নাম করে কে কেমন আছে জিজ্ঞেস করল না সত্য, শুধু জিজ্ঞেস করল বাড়ির সব মঙ্গল?
আশ্চর্য! আশ্চর্য! শ্বশুরঘরে এলে কি এমনি করেই মেয়েরা তাদের আজন্মের আশ্রয়কে– তাদের ধুলোমাটির গড়া খেলাঘরের মতই ভেঙে ফেলে? মন থেকে মুছে ফেলে? তাই শকুন্তলাকে আর কোন দিন কণ্ব মুনির আশ্রমে দেখা যায় নি, জনক রাজার ঘরে সীতাকে? মহাকবিদের মহৎ লেখনীও এই অমোঘ নিয়মকে সহজ সত্য বলেই মেনে নিয়েছিল, তাই সে লেখনী নির্মম ঔদাসীন্যে শুধু সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, পিছু ফিরে তাকায় নি?
নারী আর নদী, এরা তবে এক ধাতুতে গড়া!
কিন্তু গিরিরাজ-দুহিতা উমা?
না, উমা তো ইতিহাসের নয়, পুরাণের নয়, মহাকবিদের অমর লেখনীর অনবদ্য সৃষ্টি নয়, সে যে শুধু ঘরোয়া মানুষের মনের মাধুরী দিয়ে গড়া অমিয় ছবি। মানুষের প্রত্যাশা আর কল্পনা, আশা আর আকাক্ষা দিয়ে গড়া ভালবাসার মূর্তি!
রামকালীর মনের মধ্যে অনেক ভাব-তরঙ্গের একটা আলোড়ন উঠেছিল, যেমনটা তাঁর সচরাচর হয় না। ভাবলেন তবে কি সত্য সম্পর্কে এতদিন যে মূল্যবোধ তার মনের মধ্যে ছিল, সত্য তার উপযুক্ত নয়? সত্য সেই সাধারণ মেয়ে, যারা সহজেই বদলে যায়? ভাবলেন তবে কি মার খাওয়ার কথাটাই সত্যি, আর সত্য একেবারে নেহাত একটা ভীরু মেয়ে মাত্র? যে মেয়েরা পড়ে মার খায়, আর মার খেয়ে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে, নিজেকে প্রকাশ করতে সাহস পায় না?
সত্যর সম্পর্কে এত হতাশ হয়েই বুঝি রামকালীর মধ্যে এত আলোড়ন।
তবু সে আলোড়নকে সংহত রেখে রামকালী বলেছিলেন, হা, সব সংবাদ মঙ্গল। পুণ্যির বিয়ে যোলই বোশেখ, তাই তোমাকে নিয়ে যাবার সংকল্প করে এসেছি।
হ্যাঁ, ঠিক এই কথাটা উচ্চারণের পরই বুকের মধ্যে যেন একটা হাতুড়ির ঘা খেলেন রামকালী।
বাবা গো, তুমি কি ভাল! বলে আহ্লাদে চেঁচিয়ে উঠল না সত্য, তার বদলে বলল, বোশেখের মাঝামাঝি বিয়ে, আর এখন তো সবে ফাগুনের শেষ, এত আগে থেকে নিয়ে যেতে চাইলে এরা কিছু মনে করতে পারে বাবা।
রামকালী সুগভীর একটা নিঃশ্বাস গোপন করে বলেছিলেন, ওঁরা অমত করেন নি।
করে নি সে ওদের ভদ্রতাই, কিন্তু বাবা আমাদেরও তো একটা বিবেচনা করা দরকার। এদের অসুবিধেয় ফেলে–
তোমার তাহলে এখন যাওয়ার মত নেই?
আর একটা নিঃশ্বাস গোপন করতে হয় রামকালীকে।
সত্য এবার মুখ তুলে তাকায়। সোজাসুজি একেবারে বাপের চোখের দিকেই। বাহারে শাড়ির ঘোমটাটা খসে পিঠের ওপর পড়ে যায়, তাই সত্যর সে বাগ-না-মানা কোঁকড়া চুলে ঘেরা মুখটার সবটাই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়, আর চোখের দৃষ্টিটা তার বেশ একটু সময় নিয়েই বাপের মুখের দিকে নিবদ্ধ থাকে!
তার পর চোখ নামিয়ে নিয়ে বসে পড়া আঁচলটা মাথায় তুলতে তুলতে উত্তর দেয় সত্য, তা কার্যক্ষেত্রে মত নেই-ই বলতে হয় বৈকি। ঠাকরুণের শরীর-স্বাস্থ্য ভাল নয়, একা ননদের ঘাড়ে সমগ্র সংসার
রামকালী ঈষৎ বিস্মিত প্রশ্নে বলেন, ননদ! নবকুমারের ভগিনী আছেন নাকি?
সহোদর বোন নন, তবে সহোদরের বাড়া বাবা। পিসতুতো ননদ-ওই যে যিনি তোমাকে এ ঘরে এনে পৌঁছে দিলেন।
ও! ননদ-প্রসঙ্গে ইতি টেনে রামকালী বলেন, যাবার যখন উপায় নেই, তখন আর কি করবার আছে! অতএব রাত্রে আমার আর এ গ্রামে অবস্থান করারও প্রয়োজন দেখি না। এখনি রওনা দেব। তার আগে একটা প্রশ্ন তোমায় করছি, তুমি তো লেখাপড়া কিছু শিখেছিলে, পত্রাদিও পড়তে পার মনে হয়, এই চিঠিটা পড়ে মানে বুঝতে পারবে? জামার পকেট থেকে চিঠিটা বার করেন রামকালী।
চিঠিখানা কিন্তু সত্য তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে নেয় না। মৃদুস্বরে বলে, কার পত্তর?
সেটাই তো আমার জানা নেই। তুমি হয়তো জানতে পারবে।
অতঃপর চিঠিটা হাতে নিয়ে কয়েক ছত্র পড়ে সত্য, ঈশ্বর জানেন ঘোমটার মধ্যে তার মুখের চেহারা কেমন হয়ে ওঠে, কিন্তু গলাটা তো ঠিকই থাকে। ঠিকঠাক শান্ত গলায় বলে ওঠে সে, এত বড় একটা জ্ঞানবান বিচক্ষণ ব্যক্তি হয়ে বুঝতে পারলে না বাবা, এ কোনো শত্ত্বরের কাজ!
এমন কে শত্রু আছে তোমাদের?
তা কে জানে বাবা! অনেক শত্রুর তো ওপরে ভালমানুষ সেজেও থাকে। চিঠিটা সব না পড়েই বাবার হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল সত্য।
রামকালী সেটা ফের পকেটে পুরে, দীর্ঘনিঃশ্বাস গোপন না করেই বলেছিলেন, তাহলে এখানে তোমার কষ্টের কোন কারণ নেই। তোমার সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা করবারও কিছু নেই আমার। ঈশ্বর মঙ্গল করলেন। তাহলে এই কথাই বলে সান্ত্বনা দিতে পারব তোমার মাকে।
মা! সত্য একটু চমকে বলে, এ পত্তরের বিষয় মা জানেন?
না। তিনি অবশ্য জানেন না কিছু, রামকালী ঈষৎ হাসির মত করে বলেন, তবে মেয়ে মেয়ে করে একটু উতলা হয়েছেন তো। যাক, তোমার প্রতি যে কোন দুর্ব্যবহার হয় না এটাই শান্তির বিষয়। আর বিশ্বাস করব তুমি ঠিক কথাই বলছ।
সত্য আর একবার তেমনি মুখ তুলে তাকায়। এবার যেন ভয়ঙ্কর একটা অভিমানের ছায়া ভর্ৎসনার মত ফুটে ওঠে সে-চোখে। তারপর চোখ নামে। মৃদু আর দৃঢ়কণ্ঠে বলে সত্য, পেতল কাঁসার ঘটিটা-বাটিটাও একত্রে থাকলে মধ্যে মধ্যে ঠোকাঠুকি লাগে বাবা, আর এ তো জলজ্যান্ত মানুষ! একেবারে ঠোকাঠুকি লাগে না, লাগবে না, এ কথা কি জোর করে বলা যায়? তবে এটুকু বিশ্বেস মেয়ের প্রতি রেখো বাবা, কোনও অন্যায় সে করবেও না, সইবেও না।
