রামকালী গম্ভীর হাস্যে থামিয়ে দিয়েছিলেন, বেহাইমশাই কি হিন্দু বাঙালীর লোকাচার বিস্মৃত হচ্ছেন? জামাতৃ-গৃহে রাত্রিবাস কি লোকাচারসম্মত?
নীলাম্বর হাসির সঙ্গে একটি হ্যা হ্যা শব্দ করে বলেছিলেন, তা অবশ্য, তা অবশ্য। কিন্তু আপনার কন্যার সন্তান-জন্মের পর তো আর এ জেদ রাখতে পারবেন না?
রামকালী আরও গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, সন্তান নয়, পুত্রসন্তান। কিন্তু সুদূর ভবিষ্যতের আলোচনায় বৃথা সময় অপচয়ে দরকার কি? এখন কন্যার সঙ্গে একবার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করুন।
বিলক্ষণ, এর আবার ব্যবস্থা কি? ওরে সদু, তোদের বৌকে একবার মাঝের ঘরে নিয়ে আয়, বেহাইমশাই একবার দেখবেন।
তবে? নীলাম্বরের ব্যবহারে খুঁত কোথায়?
এর চাইতে ভদ্র ব্যবহার আর কি আশা করা যায়? কত বাড়িতে তো বৌয়ের বাপ-ভাই এলে বাইরে থেকেই জল-পান খাইয়ে বিদায় দেওয়া হয়, মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না। তা ছাড়া অনেক বাড়িতে বহু সাধ্য-সাধনায় যদি বা মেয়ের দর্শন মেলে, সঙ্গে একজন পাহারা থাকে। সে জায়গায় কিনা চাওয়া মাত্রই পাওয়া? রামকালীর তো কৃতার্থ হয়ে যাওয়া উচিত।
কিন্তু আশ্চর্য মানুষের মন! রামকালীর মনে হল নীলাম্বরের ওই “সদু” না কাকে ডেকে হুকুম দেওয়া, ওটা যেন তাচ্ছিল্য প্রকাশের একটা চরম অভিব্যক্তি। ও সুরটার মধ্যে এই কথাগুলোই ঠিক খাপ খেত– ওরে কে আছিস, একমুঠো ভিক্ষে দিয়ে যা তো, ভিখিরিটা চেঁচাচ্ছে!
নিজেকে গ্লানিযুক্ত আর সমস্ত পরিবেশটা অশুচি মনে হল রামকালীর। কিন্তু উপায় কী? জামাইয়ের বন্ধু সেই ছেলেটা উঠোনে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখা যাচ্ছে, নিজে সে গেল কোন দিকে?
এদিক ওদিক তাকালেন, হদিস পেলেন না।
সদু কে? ছেলে না মেয়ে? কর্তার তো শুনেছি মেয়ে নেই!
একঝাক ভাবনার মাঝখানে হঠাৎ বোধ করি সেই মাঝের ঘরেরই দরজার শিকলটা নড়ে উঠল।
নীলাম্বর কোমরের কসি খুঁজতে খুঁজতে উঠলেন। ভিতরে ঢুকে কি বললেন কি করলেন ঈশ্বর জানেন, তার পর বেরিয়ে এসে ডাক দিলেন, আসুন বেহাই মশাই!
রামকালী ভিতরে ঢুকলেন।
দেখলেন একটা অন্ধকার–অন্ধকার ঘরের মধ্যে একটা চৌকির ধারে একগলা ঘোমটা টাকা একটি বালিকা-মূর্তি। পরনের শাড়িখানা জমকালো; বোধ করি পিতৃ-সন্নিধানে আসার উপলক্ষে তাকে খানিকটা সাজিয়ে ফেলা হয়েছে।
ঘরের বাইরে একটি কমবয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে, মাথায় ঘোমটা কম। রামকালী এসে ঢুকতেই মেয়েটি তাড়াতাড়ি তার পায়ের ধুলো নিয়ে খাটো গলায় বলল, ওই যে, কথাবার্তা কন। তারপরে আরও খাটো গলায় হঠাৎ ‘মেয়ে নিয়ে যাবেন’ বলেই টুক করে পাশের একটা দরজা দিয়ে কোথায় ঢুকে গেল। কিন্তু ওর ওই অস্ফুট কথাটা পরিপাক করবার আগেই আর একটা চাপা অথচ তীব্র কথা কানে এল তাঁর, বৌকে একলা রেখে চলে এলি যে বড়!
বাঃ, আমি আবার সঙের পুতুলের মত কি দাঁড়িয়ে থাকব, লজ্জা করে না? উত্তরের এই কথাটুকুও কানে এল। তারপর আবার সেই তীব্র স্বর, ওরে আমার লজ্জাউলি লজ্জাবতী! একলা হয়ে এখন বাপের কাছে সাতখানা করে লাগাক!
এর উত্তর আর কানে এল না রামকালীর, কিন্তু ইতিপূর্বের তিক্ত মন কী এক রকম বিকল হয়ে বিস্বাদ হয়ে গেল, কন্যা-সন্দর্শনের প্রথম আনন্দটাই শিথিল হয়ে গেল।
সেই অবকাশে গুণ্ঠনবতী সত্য নিতান্ত নীরবে বাপকে একটি প্রণাম করল। প্রণাম করে যথারীতি পায়ের ধুলো মাথায় বুলোতে ভুলে গেল না।
কিন্তু রামকালী সহসা স্তম্ভিত হলেন কেন?
সত্যর এই আচরণে বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠল তার কেন? যে হাহাকার এখনো থামাতে পারছেন না এই স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষটাও রামকালী কি আশা করেছিলেন তার সেই সত্য অবিকল তেমনি আছে? বাপকে দেখেই ছুটে এসে ঢিপ করে একটা প্রণাম ঠুকে গিন্নীদের মত বলে উঠবে, কি বাবা, এতদিনে মেয়েটাকে মনে পড়ল? ধন্যি বলি বাপের প্রাণ, এতদিনে একবার দেখতে আসতে ইচ্ছে হল না মেয়েটা মরল কি বাচল? যাই ভাগ্যিস পুণ্যিপিসির বিয়েটা লেগেছিল, তাই না—
অথবা এইটাই কি মনে করেছিলেন, সত্য আর আগের সত্য নেই, একেবারে বদলে গেছে। তাই প্রত্যাশিত হৃদয়ে অপেক্ষা করছিলেন, দেখামাত্রই ঝাঁপিয়ে এসে পিতৃবক্ষে আশ্রয় নিয়ে নিঃশব্দে কেঁদে ভাসাবে সে! আর তার সেই অবিরল অশ্রুধারায় রামকালীর জ্বালা করা বুকটা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে!
কিন্তু এই ইচ্ছে তো রামকালীর হবার কথা নয়। আবেগপ্রবণতা তো রামকালীর সম্পূর্ণ রুচিবিরুদ্ধ। মন-কেমন করা বা অনেক দিন পরে দেখা হওয়া ইত্যাদি উপলক্ষ করে বউ কাঁদছে কাটছে দেখলে ভুরু কুঁচকে ওঠে তার। স্বয়ং রামকালী-দুহিতাই যদি সেই খেলা আর সস্তা পদ্ধতিতে আবেগ প্রকাশ করে বসে, রামকালী অসন্তুষ্ট হতেন না কি?
বহু বিচিত্র উপাদানে গড়া মানব-মন কখন কি চায় বলা বড় শক্ত। কি চায় নিজেই বুঝতে পারে না, শুধু এক-এক সময় একান্ত বেদনায় বলে, এ কী হল! এ তো আমি চাই নি!
তাই চির-অবিচলিত রামকালী হঠাৎ আজ নিজের মেয়ের এই শান্ত সভ্য বধূমূর্তি দেখে বিচলিত হয়ে ভাবলেন, এ কী হল!
কথা যোগায় না রামকালীর। মৃদু গম্ভীর কণ্ঠ থেকে শুধু একটু কুশল প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছিল, ভালো আছো তো?
সত্য তেমনি মাথা নিচু করে বলেছিল, হ্যাঁ বাবা। বাড়ির সব খবর মঙ্গল?
