কলকাতায়! ওঃ! হুঁ। যাক বাবাজী, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে। জানতে চাইছি, গ্রামে তোমাদের কোন শত্রু আছে?
শত্রু!
নবকুমার বিহ্বলভবে তাকিয়ে থাকে।
কোনও শত্রু! এলোকেশীর মতে তো গ্রামসুদ্ধ সকলেই তাদের শত্রু।
হ্যাঁ, শত্রু। মানে যে তোমাদের অনিষ্টকামী। মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে তোমাদের ক্ষতি করতে চায়। এমন কোনও লোক আছে মনে হয়?
নবকুমার আস্তে আস্তে নেতিবাচক মাথা নাড়ে, কিন্তু ততক্ষণে নিতাই অন্য উত্তর দিয়ে বসেছে, আজ্ঞে গায়ে তো সবাই সবাইয়ের শত্রু। ওই ওপরেই দেখন-হাসি। আর নবুর মার মেজাজের জন্যে তো
থাক ও কথা–, মৃদু ধমক দিয়ে ওঠেন রামকালী, মেঘমন্দ্র স্বরে বলেন, গ্রামের সকলের হাতের লেখা চেন? বলতে পার এ লেখা কার?
মেরজাইয়ের পকেট থেকে চিঠিখানা বার করে সামান্য একটু মেলে ধরেন রামকালী।
কিন্তু মেলে ধরবার দরকারই বা কি, ওরা তো জানে এ লেখা কার! ভবতোষ মাস্টারের। আর লেখার প্রেরণা নিতাই নিজে। মাস্টারের কাছে হতভাগ্য নবকুমারের ধর্মপত্নীর যন্ত্রণাময় জীবনের কাহিনী দিব্য বিশদ করেই বলেছিল সে, এবং সহসা ভবতোষ মাস্টার ঘোষণা করেছিল, আচ্ছা, আমি এর প্রতিকার সাধনে যত্নবান হব। সাহেবদের দেশে কদাপি কেউ স্ত্রীজাতির প্রতি নির্যাতন সহ্য করে না।
কি, চিনতে পারলে বলে মনে হয়?
দুজনেই প্রবল বেগে মাথা নাড়ে। বলা বাহুল্য নেতিবাচক। হ্যাঁ বলে কে সিংহের মুখবিবরে মাথা গলাতে যাবে?
ঠিক আছে। আমি তোমাদের ওখানেই যাচ্ছি। তোমার বাবা বাড়ি আছেন অবশ্যই!
আছে। অস্ফুট এই শব্দটি এতক্ষণে রামকালীকে নিশ্চিন্ত করে, তাঁর জামাতা বাবাজী বোবা নয়।
পালকি-বেহারাদের ডেকে জনান্তিকে কি যেন নির্দেশ দিয়ে রামকালী বলেন, চল, এটুকু তোমাদের সঙ্গে হেঁটেই যাই।
আমি আজ্ঞে একটু দৌড়ে গিয়ে খবরটা দিয়ে আসি, বলেই বন্ধু নিতাই বিশ্বাসঘাতকের মত নবকুমারকে অথই জলে ফেলে রেখে দৌড় মারে।
রামকালী কয়েক পা অগ্রসর হয়ে সহসা স্বভাব-বহির্ভূত স্বরে একটা প্রশ্ন করে বসেন, আমার মেয়ে কি তোমাদের গৃহে কোন উৎপাত ঘটাচ্ছে?
আঁ–আজ্ঞে, সে–এ কী!
তোতলা হয়ে ওঠে নবকুমার।
না, তাই প্রশ্ন করছি। সে বালিকা মাত্র, অবুঝ হওয়া অসম্ভব নয়।
আঁ–অজ্ঞে! না-না।
কালঘাম ছুটে যায় নবকুমারের। সে গায়ের একমাত্র আচ্ছাদন কোঁচার খুঁটটুকু টেনে কপালের ঘাম মুছতে থাকে।
রামকালী মৃদু হাস্যে বলেন, অধীর হবার কিছু নেই, আমি কৌতূহলপরবশ হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম মাত্র। যাক, আমি যার জন্য এসেছি তোমাকে জানাই, কারণ তুমি আমার জামাতা। বাড়িতে একটি শুভ কাজ আসন্ন, সে কারণ আমার নাকে আমি নিয়ে যেতে মনস্থ করেছি। বিবাহের সময় অবশ্য যথারীতি নিমন্ত্রণ আসবে, তুমি এবং তোমার পিতা যাবে। তোমাকে কয়েকদিন থাকবার জন্য মেয়েরা অনুরোধ করতে পারেন, সে সম্পর্কে আমি তোমার পিতা-মাতাকে জানিয়ে যাব। থাকবার জন্যে প্রস্তুত থেকো।
এ সবের আর কি উত্তর দেবে নবকুমার?
ভয়ে আর আনন্দে, আশায় আর উৎকণ্ঠায় তার তো মুহুর্মুহু স্বেদ-কম্পপুলক দেখা দিচ্ছে।
বাড়ির দরজার কাছাকাছি আসতেই নবকুমার সহসা কাতরকণ্ঠে বলে ওঠে, আমি যাই।
কি আশ্চর্য, যাবে কেন?
হ্যাঁ, আমি যাই। নিতাই আছে– বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে শ্বশুরের পায়ের কাছে মাটিতে একটা খাবল দিয়ে ছুট মারে নবকুমার।
রামকালী সেদিকে চেয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলেন।
লেখাপড়া শিখছে?
কিন্তু মানুষ হচ্ছে কি?
ঠিক এই সময় নিতাই নবকুমারদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে, আর নীলাম্বর বাঁড়ুয্যে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি সুনিপুণ হাস্য সহযোগে বলেন, বেহাই মশাই যে? কী মনে করে?
২২. রামকালীর পালকি
বেলা না পড়তেই আবার রামকালীর পালকি ফিরতি মুখ ধরেছে, একা রামকালীকে নিয়েই। এখন পালকির খোলা দরজা দিয়ে পড়ন্ত সূর্যের স্বর্ণাভা উঁকি মারছে, শেষ ফাল্গুনের উড়ু উড়ু বাতাস যেন দুষ্ট শিশুর মত মাঝে মাঝে ঝুপ করে ঢুকে পড়ে একটা টু দিয়ে যাচ্ছে।
আকাশে বাতাসে পাতায় সর্বত্রই একটা আলো-ঝলসানো আনন্দের আবেশ। কিন্তু প্রকৃতির এই মধুর রূপে মন দেবার মত মন এখন নেই রামকালীর। কি এক দুরন্ত ক্ষোভে মনটা যেন হাহাকার করছে। মনে হচ্ছে কোথায় যেন মস্ত একটা হার হয়ে গেছে তার।
ভদ্রতাবোধহীন নীলাম্বর বাঁড়ুয্যের কাছে কি পরাজয় ঘটেছে রামকালীর? মেয়েকে নিয়ে আসতে পারেন নি এই ক্ষোভেই মন এমন অস্থির।
কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তো তা নয়। নীলাম্বর তো ভদ্রতার চূড়ান্ত দেখিয়েছেন।
মেয়ে নিতে এসেছেন এ প্রস্তাব তোলামাত্রই নীলাম্বর অমায়িক হাস্যে বলেছেন, বিলক্ষণ, এ তো অতি উত্তম কথা! আপনার কন্যা আপনি নিয়ে যাবেন, যত দিন ইচ্ছে রাখবেন, এতে আমার কি বলবার আছে। ওরে কে আছিস, পঞ্জিকাটা একবার নিয়ে আয় তো।
রামকালী বলেছিলেন, পঞ্জিকা আমি দেখেই এসেছি। আগামী কাল সর্বশুদ্ধা ত্রয়োদশী। বারও ভাল। কালই নিয়ে যাব। রাত্রিবাস না করে উপায় থাকছে না। কাজেই গ্রামে কোনও ব্রাহ্মণবাড়িতে শয়নের একটু ব্যবস্থা করে দিন। কিন্তু অনুগ্রহ করে কোনও আহারাদির আয়োজন করতে যাবেন না। বেহারাদের জলপানির ব্যবস্থা ওদের সঙ্গে আছে।
নীলাম্বর মেয়েদের ভঙ্গীতে গালে হাত দিয়ে বলে উঠেছিলেন, বলেন কি বেহাই মশাই! আমার এত বড় বাড়ি, এত বড় ঘরদালান থাকতে আপনি অন্যত্র–
