তা কিছু নয়। ভূবনেশ্বরী কষ্টে বলে, মেয়েটার জন্যে প্রাণটা উতলা হচ্ছে তাই–
হচ্ছে ঠিকই। হওয়া স্বাভাবিক। রামকালী স্নেহ-গম্ভীর স্বরে বলেন, তোমার একমাত্র সন্তান। কিন্তু কান্নাকাটি করলেই তো আর কিছু সুরাহা হয় না। মায়ের প্রাণ উতলা হয়, বাপের প্রাণেই কি একেবারে কিছু হয় না? আর একটু ক্ষুব্ধ হাসি হাসলেন রামকালী।
ভুবনেশ্বরীর পক্ষে এ কথার জবাব দেওয়া সম্ভব নয়।
অপ্রতিভ হয়ে বসে থাকে বেচারা।
একটু পরে রামকালী বলেন, যাও, ভগবানের নাম স্মরণ করে শুয়ে পড় গে। দেখি যদি নিয়ে আসতে পারি।
ভুবনেশ্বরী সহসা আবার কেঁদে ভেঙে পড়ে বলে, আমার মন বলছে ওরা পাঠাবে না।
রামকালী আর কিছু বলেন না, দুর্গা দুর্গা বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন। ভুবনেশ্বরী অনেকক্ষণ কেঁদে অবশেষে এসে শোয়।
পরদিন মেয়ের বাড়ি যাত্রার আয়োজন করেন রামকালী।
.
ইংরিজি পড়া আপাতত বন্ধ আছে, কারণ ভবতোষ মাস্টার গ্রামে নেই। ছাত্রদের জন্য সেকেণ্ড বুক সংগ্রহ করতে কলকাতায় গেছে। নবকুমারের তাই এখন অবসর। কিন্তু হায়, অবসরকে কুসুমমণ্ডিত করে তুলবে, এ ভাগ্য নবকুমারের কই? বাড়িতে যে দু-দণ্ড বিশ্রামসুখ উপভোগ করবে, খাবে মাখবে থাকবে, তারও জো নেই। সেখানে জাগন্ত অবস্থায় যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই হৎকম্প হতে থাকে তার।
কিন্তু ঘুমন্তই বা থাকে কতক্ষণ?
রাত্রে এখন আর সেই মহিষ-বিনিন্দিত ঘুম নেই নবকুমারের। বিছানায় শুয়ে ঘুম আসে না, ওঠে, বসে, পায়চারি করে, জল খায়, আবার শোয়, এইভাবে অনেকটা সময় কাটে। দিনের বেলা কর্মহীনের কর্ম, নিষ্কর্মার গতি পুকুরে ছিপ ফেলা।
বন্ধু নিতাই আর সে দুজনে সারা দুপুর সেই কাজটা করে। আজও করছিল। ফাত্মা থেকে চোখ তুলতে হঠাৎ চোখে পড়ল নিতাইয়েরই।
বলল, অমন বাহারে পালকি চড়ে কে আসছে বল্ দিকি?
নবকুমার তাকিয়ে বলল, তাই তো! দিব্যি পালকিখানা! তবে আসছে না বোধ হয়, গাঁ পার হচ্ছে।
বলল কিন্তু দুজনের একজনও চোখ ফেরাতে পারল না।
আর কম্পিত চিত্তে ভীত পুলকে দেখল পালকি তাদের দিকেই আসছে।
নবকুমার বলল, ছিপ ফেলে রেখে চো চো দৌড় দিই আয়।
নিতাই সবিস্ময়ে বলে, কেন, পালাব কেন?
আমার মন বলছে এ পালকি নিত্যেনন্দপুরের।
আঁ! চিনিস বুঝি?
চিনব কেন, অনুমান। মেয়ে নিতে পাঠিয়েছে নিয্যস। নিতাই, আমি পালাই।
নিতাই ওর কোঁচার খুঁট চেপে ধরে বলে, পালাবি মানে? হেস্তনেস্ত দেখবি না?
আর একটু তর্কাতর্কি হয় দুই বন্ধুতে এবং সত্যি বলতে, নবকুমার যতই পালাবার চিন্তা করুক, নড়তেও পারে না। টিকটিকির শিকারী দৃষ্টির সম্মোহনী শক্তিকে আকর্ষিত কীটের মত নির্জীব হয়ে বসে থাকে।
পালকি এই দিকেই আসে, আরোহীর নির্দেশে বেহারারা এখানেই নামায়, এবং আরোহী না নেমেই হাতছানি দিয়ে ডাকেন ওদের। ঘাটের ধার থেকে দুজনেই উঠে আসে কেঁচার খুঁটটা টেনে গায়ে দিতে দিতে।
তোমরা এ গ্রামের?
ভরাট গম্ভীর এই কণ্ঠস্বরে বুক কেঁপে ওঠে দুজনেরই। এবং যদিও নবকুমার শ্বশুরকে চেনে না, বিয়ের সময় তাকিয়ে দেখেও নি, দু-দুবার ষষ্টিবাটায় নেমন্তন্ন করেছিল, অসুখের ছুতো করে যায় নি। ভয়েই যায় নি। তবু তার মন বলতে থাকে, এ সেই! এ সেই!
হ্যাঁ, রামকালীই। তিনি ওদের ঘাড়নাড়া উত্তরের পর আবার বলেন, এ গ্রামের ছেলে, না ভাগিনেয়?
নিতাই এগিয়ে এসে বলে, আজ্ঞে আমি ভাগিনেয়, শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণধন দত্ত আমার মাতুল। আমার নাম নিতাইচন্দ্র ঘোষ। আর এই বাঁড়ুয্যে বাড়ির ছেলে নবকুমার বাঁড়ুয্যে। আমার বন্ধু।
নবকুমার বাঁড়ুয্যে!
রামকালীর দুই চোখে একটা বিদ্যুতের আভা খেলে যায়, নিশ্চিন্ত হন অনুমান ঠিক। আর একবার ভাল করে আপাদমস্তক দেখে নেন ছেলেটার। দেখে নেন ওর মেয়েলী মেয়েলী দুধেআলতা গোলা রং, আলতা-গোলা ঠোঁট, আর রোদে ঝলসানো টুকটুকে লালরঙা মুখ। তার পর নেমে আসেন পালকি থেকে।
গম্ভীরতর স্বরে বলেন, আমি রামকালী চাটুয্যে!
বসে পড়বার একটা সুযোগ পেয়েই বোধ হয় বেঁচে যায় ছেলে দুটো, তাড়াতাড়ি বসে পড়েই রামকালীর চরণ-বন্দনা করে।
থাক থাক বলে উভয়ের মাথাতেই একটু হাতের স্পর্শ দিয়ে রামকালী একবার নিতাইয়ের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করে নবকুমারকে উদ্দেশ করে বলেন, এ যখন তোমার বন্ধু, তখন এর সামনে কথা বলতে বাধা নেই, জিজ্ঞেস করছি, এইভাবে মাছ ধরেই দিন কাটাও নাকি?
নবকুমারের থুতনি বুকে ঠেকে। কিন্তু কায়স্থ বংশধর নিতাই, ওর থেকে অনেক চটপটে চৌকস। আর নিভীকও বটে।
সে তাড়াতাড়ি বলে, না আজ্ঞে, অন্যদিন দুপুরবেলা আমরা মাস্টারের বাড়ি পড়তে যাই। আজ তিনি–
কি পড়তে যাও?
নবকুমার পিছন থেকে প্রবল চিমটি কেটে বন্ধুকে নিষেধ করে যাতে ইংরিজি পড়াটার কথা না বলে ফেলে। বলা যায় না, ম্লেচ্ছ ভাষা অধ্যয়নের সংবাদে ক্ষেপে ওঠেন কিনা এই ভয়ঙ্কর লোকটা!
ভয়ঙ্কর?
অন্তত নবকুমারের তাই লাগছে।
কিন্তু নিতাই নিষেধের মান্য রাখে না। বরং একটু বিনয়-আচ্ছাদিত গর্বিত ভঙ্গীতেই বলে, আজ্ঞে ইংরিজি।
ইংরিজি! তা বেশ। কতদূর পড়েছ?
ফার্স্ট বুক সেকেণ্ড বুক সারা হয়ে গেছে আজ্ঞে। এখন
ভাল, শুনে সুখী হলাম। তা আজ পড়তে যাও নি যে?
প্রশ্নটা নবকুমারকে, তবু উত্তরটা দেয় নিতাই-ই, মাস্টার মশাই বই আনতে কলকাতায় গেছেন।
