না না, এ মিথ্যা চিঠি।
শত্রুপক্ষের কাজ।
নইলে কেনই বা? ভাবলেন রামকালী, সত্যর ওপর নির্যাতন চালাবে কেনই বা? অকারণ এত হিংস্র কখনো হতে পারে মানুষ? তাছাড়া শুধু তো শাশুড়ী নয়, তার শ্বশুর রয়েছেন। হাজার হোক একটা ভদ্ৰব্যক্তি, তাঁর জ্ঞাতসারে এ রকমটা হওয়া কখনই সম্ভব নয়। আর বাড়ির লোকেরও অজ্ঞাতসারে যদি কোন পীড়ন চলে, পাড়ার লোকে টের পাবে কি করে?
আবার ভাবলেন রামকালী, সত্যবতী তাদের একমাত্র পুত্রবধূ। বিনা প্রতিবাদে রামকালী তাকে শ্বশুরঘর করতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, তার সঙ্গে ঘরবসত হিসাবে প্রচুর সামগ্রী পাঠিয়েছেন, যাতে অন্তত শাশুড়ীর মন ভোলে। তবু তারা সত্যকে নির্যাতন করবে?
তাই কখনও সম্ভব?
বললে দোষ, ভাবতে বাধা নেই, মেয়ের বিয়ের সময় ঘটক আনীত নানা পাত্রের মধ্যে এই পাত্রটিকেই পছন্দ করেছিলেন রামকালী, কেবলমাত্র তাদের পরিবারের লোকসংখ্যা কম বলে। সেই শৈশব থেকেই লক্ষ্য করেছেন, তাঁর মেয়ে জেদী তেজী অনমনীয়। বৃহৎ গোষ্ঠীর অনেকের মন যুগিয়ে চলা হয়তো তার পক্ষে সহজ হবে না, সে বোধ রামকালীর ছিল, তাই ভেবেছিলেন এখানেই ভালো। বাপের একমাত্র ছেলে? দোষ কী? সত্যও তো তার বাপের একমাত্র মেয়ে!
ঘরজামাইয়ের সাধ একেবারেই ছিল না রামকালীর। শুধু এইটুকু মনে মনে ভেবেছিলেন, ছেলেটা যেন নেহাত রাঙামূলো না হয়। লেখাপড়ার একটু ধার যেন ধারে। তা সে সাধটুকু মিটেছিল রামকালীর, মিটছিলও। জামাই তখনই ছাত্রবৃত্তি পাস, টোলে সংস্কৃত শিখছে।
তারপর লোক-পরম্পরায় শুনেছিলেন, জামাই নাকি ইংরেজি ভাষা শিখতে উদ্যোগী হয়েছে। শুনে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন রামকালী। নিজে সামনে উপস্থিত না হলেও জামাইয়ের খবর তিনি লোক মারফৎ নিতেন, এবং এটুকু জেনে নিশ্চিন্ত ছিলেন, ছেলেটা কুসঙ্গে মেশে না, বদ খেয়ালের দিকে যায় না।
সবই তো একরকম ছিল, হঠাৎ এ কী বিনামেঘে বজ্রপাত। অ
বশেষে আবার ভাবলেন, এ শত্রুপক্ষের কাজ।
কিন্তু মনের মধ্যে যে আলোড়ন উঠেছিল, সেটাকে একেবারে চেপে ফেলে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারলেন না রামকালী, স্থির করলেন তিনি একবার নিজেই যাবেন বেহাইবাড়ি।
মান খাটো হবে?
তা যেদিন জামাইয়ের হাঁটু ধরে কন্যা-সম্প্রদান করেছেন, সেইদিনই তো মান গেছে। সেকালের মত তো রামকালী মেয়েকে স্বয়ম্বরা করতে পারেন নি।
তাছাড়া একেবারে অকারণ জামাইবাড়ি যাওয়ার অগৌরবটা পোহাতে হবে না। পুণ্যির বিয়েকে উপলক্ষ করে মেয়ে নিয়ে আসতে চাইবেন। সেই সঙ্গে জামাই-বেহাইকেও নিমন্ত্রণ করে আসা হবে। রামকালী নিজে গিয়ে নিমন্ত্রণ করছেন, এর চেয়ে সৌজন্য আর কি হতে পারে?
ত্রিবেণী থেকে ফিরে রামকালী দীনতারিণীর কাছে সংকল্প ঘোষণা করলেন, মনে করছি একবার বারুইপুর যাব।
বারুইপুর! সত্যর শ্বশুরবাড়ি? দীনতারিণী চমকে উঠে বললেন, কেন, হঠাৎ? সত্যর কোন রোগ-ব্যামো হয় নি তো?
কী আশ্চর্য! রোগ-ব্যামো হবে কেন? রামকালী শান্তভাবে বললেন, ভাবছি পুণ্যিটার বিয়ে হয়ে যাবে, তারপর দুজনে কবে দেখাসাক্ষাৎ হয় না হয়, গলাগলি বন্ধু দুটোতে। বিয়ের আগে কিছুদিন একসঙ্গে থাক।
দীনতারিণী ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এত সহজ ভাষা, এত সহজ কথা! রামকালীর মুখে!
ছেলেকে তো তিনি “পাথরের ঠাকুর” আখ্যা দেন।
.
সহজ কথা। তবু রামকালীর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় বলে কেউ সহজভাবে নিতে পারে না।
মোক্ষদা খরখরিয়ে বলেন, এ আর অমনি নয়, লিখিপড়ি-উলি বিদ্যেবতী মেয়ে, নিঘঘাত লুকিয়ে বাপকে চিঠি লিখেছে, বাবা আমায় নিয়ে যাও, আর ঘোমটা দিয়ে থাকতে পারছি নে!
শিবজায়া আনতমুখী ভুবনেশ্বরীর দিকে কটাক্ষপাত করে কাতর-কাতর মুখে বলেন, আমার কিন্তু তা মন নিচ্ছে না ছোটঠাকুরঝি। মনে হচ্ছে কোন কু-খবর আছে, রামকালী চাপছেন।
বলা বাহুল্য এর পর আর ভুবনেশ্বরীর ডুকরে কেঁদে ওঠা ছাড়া গতি থাকে না।
ভুবনেশ্বরীর একমাত্র অন্তরের সুহৃদ অসমবয়সী এবং অসমসম্পর্ক হলেও ভাসুরপো- বৌ সারদা। কিন্তু এমনি কপালের দুর্দৈব ভুবনেশ্বরীর যে, সারদা আজ চার মাস কাল বাপের বাড়ি।
দ্বিতীয় সন্তানের আবির্ভাব ঘোষণাতেই তার এই পিতৃগৃহে স্থিতি।
না, সেই এক অন্ধকার রাত্রে রাসুর সঙ্গে কলহ করে ডোবার জলে ডুবে মরেনি সারদা। শুধু অন্য ঘরে ননদের কাছে গিয়ে শুয়েছিল। সে শুধু একটাই রাত। রাতের পর রাত পারবে কেন?
শ্বশুরবাড়ি বৌয়ের রাতটুকুই তো মরুভূমিতে সরোবর। মৃত্যুপুরীর মধ্যে জীবন। যত বড় দুর্জয় মানই হোক, সে মান খাটো না করে উপায় থাকে না তাদের।
সকলেরই তাই। রাত্রে ভুবনেশ্বরীরও কান্নার বেগ অসম্বরণীয় হয়ে ওঠে। রামকালী অপর চৌকি থেকেও সেটা টের পান। কিছুক্ষণ ঘুমের ভান করে চুপচাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর চুপ করে থাকা সম্ভব হয় না। মৃদুস্বরে বলেন, অকারণ কাঁদছ কেন?
বলা বাহুল্য, এ প্রশ্নে যা হয় তাই হল।
কান্নার আবেগ আরও প্রবল হল।
রামকালী বলেন, ছেলেমানুষি করো না। এস কাছে এস, কান্নার কারণটা শুনি।
ভুবনেশ্বরী চোখ মুছতে মুছতে উঠেই এল। এসে স্বামীর বিছানার এক প্রান্তে বসে চোখে আঁচল ঘষতে লাগল।
রামকালী ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, তুমিও যদি এই সব গিন্নীদের মত হও, তাহলে তো নাচার। অপরাধের মধ্যে বলেছি পুণ্যির বিয়ে উপলক্ষে সত্যকে কিছুদিন আগেই আনব। নিজে গেলে আর ওরা অমত করতে পারবে না। কিন্তু এই সহজ কথাটা না বুঝে সবাই মিলে এমন কাণ্ড করছ যে, মনে হচ্ছে বুঝি কি একটা অমঙ্গলই ঘটে গেছে। আশ্চর্য!
