.
নিত্যানন্দপুর ঘাট থেকে ত্রিবেণী ঘাট সামান্য পথ।
মাঝি নৌকা বাধল।
আর ঘাটে নেমেই প্রথম যার সঙ্গে চোখাচোখি হল রামকালীর, সে হচ্ছে “রানার” গোকুল দাস। দূর থেকে রামকালীকে নামতে দেখে ছুটে ছুটে আসছে সে।
কাদার উপরই আভূমি এক প্রণাম করে কৃতার্থম্মন্য গোকুল সবিনয় হাস্যে বলে, আজ আমার কী ভাগ্যি কত্তাবাবু, কী ভাগ্যি!
রামকালী মৃদু হেসে বলেন, সক্কাল বেলা হঠাৎ ভাগ্যের এত জয়-জয়কার যে গোকুল!
গোকুল বলে, তা জোকার দেব না আজ্ঞে? এই আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, নইলে তো যেতে হত সেই নিত্যেনন্দপুরে। এই নিন, পত্তর আছে আপনার।
পত্র!
কলকাতা থেকে আসছে! অভাবনীয়!
বিস্মিত হলেন রামকালী, কিন্তু বিস্ময় প্রকাশ করলেন না। খামে আঁটা চিঠিটা নিজের পরিত্যক্ত গাত্রবস্ত্রের উপর রেখে দিয়ে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। ভাল তো সব?
আপনাদের আশীৰ্বাদে আজ্ঞে। বলে ঈষৎ উসখুস করে গোকুল বলে ফেলে, কলকাতার চিঠি আজ্ঞে?
তাই তো দেখছি, বলে রামকালী গামছা কাঁধে ফেলে জলে নামেন। প্রথম সূর্যের কাঁচা রোদ ঝলসে ওঠে কাঁচা সোনার রঙের দীর্ঘ দেহখানির উপর। গোকুল হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। থাকতে থাকতে মনে মনে ভাবে–ইস, যেন আকাশের দেবতা! কী দিব্য অঙ্গ!
পত্রের কথা মন থেকে সরিয়ে ফেলে, যথাকৃত্য সব সেরে উত্তরীয়ের কোণে পত্ৰখানা বেঁধে মন্দির-দর্শনে অগ্রসর হলেন রামকালী। অগত্যাই গোকুল আর একটা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সেরে বিদায় নিল। কলকেতা থেকে কার পত্র এল সে কৌতূহল আর মিটল না তার।
.
নৌকোয় বসে চিঠি খুললেন রামকালী। আর পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
এই সকলের আলো তার সমস্ত উজ্জ্বলতা হারিয়ে যেন আসন্ন সন্ধ্যার মত মলিন হয়ে গেল। সদ্য গঙ্গাস্নানে নির্মল রামকালী যেন একটা অপবিত্র দ্রব্যের সংস্পর্শে এসে নিজেকে অশুচি বোধ করলেন।
চিঠি কোন পরিচিতের নয়। অজ্ঞাত ব্যক্তির। তাছাড়া নিচে কোন নাম-দস্তখতও নেই।
বেনামী এই চিঠিতে শুধু সম্বোধনের বাগাড়ম্বর অনেক। কিন্তু সেটাই তো কথা নয়। চিঠির বক্তব্য এ কী ভয়ঙ্কর।
বার বার পড়ার পর আরও একবার চিঠিখানা সামনে মেলে ধরলেন রামকালী।
হস্তাক্ষর সুঁছাদের, লাইনগুলি পরিপাটি, বানান বিশুদ্ধ। কোন “লিখিত পড়িত” লোকের দ্বারা লেখা, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই; উপরে শ্রীশ্রীবাগদেবী শরণং দিয়ে শুরু
মহামহিমার্ণব শ্রীল শ্রীযুক্ত রামকালী চট্টোপাধ্যায় বরাবরেষু– যথাযোগ্য-সম্মান-পুরঃসর নিবেদনমেতৎ, অত্রপত্রে এই জ্ঞাত করাই যে, মহাশয়ের কন্যার অতীব বিপদ! তিনি তাহার শ্বশ্রূগৃহে যারপরনাই লাঞ্ছিতা উৎপীড়িতা ও অপমানিতা রূপে কালযাপন করিতেছেন। বলিতে মন শিহরিত ও কলেবর কম্পান্বিত হইলেও জ্ঞাতার্থে লিখিতেছি, আপনার কন্যা তাঁর পূজনীয়া শ্বশ্রূমাতা কর্তৃক প্রহারিতাও হইতেছেন। সেই অবলা বালিকাকে রক্ষা করে নিষ্ঠুর পাষাণপুরীতে এমন কেহই নাই। আপনার জামাতা ধর্মপত্নীর এবম্বিধ নির্যাতনে অবিরত অশ্রু বিসর্জন সার করিয়াছে। গুরুজনদিগের উপর তাহার আর কি বলিবার সাধ্য আছে? এবম্প্রকার অবস্থায় মহাশয় যদি সত্বর কন্যাকে নিজগৃহে লইয়া যান তবেই মঙ্গল নচেৎ কি যে হইতে পারে চিন্তা করিতে মস্তক ঘূর্ণিত হইতেছে। মনুষ্যজনোচিত কর্তব্য বোধে ইহা আপনার গোচরে আনিলাম। নিজ গুণে ধৃষ্টতা মার্জনা করিয়া কৃতার্থ করিবেন। অলমতিবিস্তরেণ। ইতি–
না, নাম-স্বাক্ষর নেই।
পত্র-লেখকের বাচালতা বা বাগাড়ম্বরে কৌতুক বোধ করবেন, এমন মানসিক অবস্থা থাকে না রামকালীর। চিঠিটা আস্তে আস্তে মুড়ে মেরজাইয়ের পকেটে রেখে দিয়ে এই রৌদ্রকরোজ্জ্বল পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি।
এত আলো পৃথিবীতে, তবু পৃথিবীর মানুষগুলো এত অন্ধকারে কেন?
কিন্তু কে এই পত্র-লেখক?
সত্য শ্বশুরবাড়ির কোন শত্রু? এভাবে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পত্র লিখে তাঁদের অনিষ্টসাধন করতে চায়? কিন্তু তাহলে চিঠিতে কলকাতার ছাপ কেন? কলকাতা থেকে এ চিঠি আসে কি করে?
ভেবে ভেবে অবশ্য একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন রামকালী। পত্র-লেখকের অবশ্যই কলকাতায় যাতায়াত আছে, এবং নিজেকে গোপন রাখতে কলকাতায় অবস্থানকালে পত্র প্রেরণ করেছে।
তবু একটা সমস্যা থেকেই যায়। পত্রের মধ্যস্থিত ওই বীভৎস সংবাদটা সত্যি, না শত্রুপক্ষের মিথ্যা রটনা?
রামকালী কি একেবারে নিজে গিয়েই তদন্ত করবেন, না লোক পাঠাবেন? বাইরের লোক গিয়ে কি ভিতরকার প্রকৃত তথ্য আবিষ্কার করতে পারবে? এক যদি কোন স্ত্রীলোককে পাঠানো যায়!
যারা বারো মাস রামকালীর সংসারে খেটে খায়, চিড়ে-কোটানি মুড়ি-ভাজুনি ইত্যাদি, তাদেরই কারো একজনকে একটা সঙ্গী ও রাহাখরচ দিলে খবর এনে দিতে পারে। পল্লীগ্রামে সচরাচর এরাই কাজ করে। কিন্তু রামকালীর ওদের কথা ভেবে চিত্ত বিমুখ হল। কোন খবর ওরা জানা মানেই সাতখানা গ্রামের লোকের জানা। ঈশ্বর জানেন কী খবর আনবে, আর সেই নিয়ে সারা গ্রামে আলোচনা চলবে।
মনে হল সত্য যদি নিজে চিঠি লিখত!
চিঠি লেখবার মত বিদ্যে সত্য অর্জন করেছে। কিন্তু করে আর লাভ কি? পিত্রালয়ে নিজের খবর জানিয়ে চিঠি দেবে এমন সাধ্য বা সাহস তো হবে না। তবে আর মেয়েদের লেখাপড়া শিখে লাভ কি?
বুকের মধ্যেটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল স্থিতপ্রজ্ঞ রামকালী কবরেজের। চোখের সামনে ভেসে উঠল সত্যর সেই দৃপ্ত মুখচ্ছবি। সেই সত্য পড়ে মার খাচ্ছে! এ যে বিশ্বাস করা একেবারে অসম্ভব!
