গায়ে পড়ে কাউকে অপমান করবার মেয়ে সে নয় নবু, সেদিকে তুই নিশ্চিন্দি থাক। তবে কেউ যদি গা পেতে অপমান নিতে যায় সে আলাদা কথা। আসল কথা কি জানিস, বৌ হল উঁচু ঘরের মেয়ে, শিক্ষাদীক্ষা উঁচু, লেখাপড়া জানে, বড় বড় বই পড়ে ফেলে, নিজে পয়ার বাঁধে।
অ্যাঁ!
স্থানকাল ভুলে নবকুমার প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, মস্করা করছ আমার সঙ্গে?
কি দরকার আমার? আকাশ থেকে কথা পেড়ে বলতেই বা যাব কি করে? আর ওসব আমি বুঝিই বা কি? বৌ আমার কাছে মনটা খোলে তাই টের পেয়েছি।
সদুর কাছে মনটা খোলে!
হায়, কবে সেই আকাক্সিক্ষত স্বর্গসুখ আসছে নবকুমারের ভাগ্যে, যেদিন নবকুমারের সামনে বৌ মন খুলবে!
সদু আবার মুখ চালায়, তোদের এ বাড়িতে বিয়ে হওয়া ওর উচিত হয় নি, এই বলে দিলাম স্পষ্ট কথা! তুই রাগ করিস আর যাই করিস, এ বাড়ি ওর যুগ্যি নয়! মামীর পয়সাই আছে, নজর বলতে আছে কিছু? আর বৌয়ের ছোট নজর দেখার অভ্যেসই নেই। এই তো সেদিন মামী পাড়ার লোকের গয়না বাধা রেখে টাকা ধার দিয়ে সূদ নেয় শুনে যেন হিমাঙ্গ হয়ে গেল বৌ!
নবকুমার বিরক্ত স্বরে বলে, তা ওসব কথা বলতে যাবারই বা দরকার কি?
বলতে আমি যাই নি রে বাপু তোর বৌয়ের কান ধরে। ওর সামনেই ঘোষগিন্নী একজোড়া বাজু বন্দুক নিয়ে দৈ-দস্তুর করতে লাগল। সে বলে টাকায় এক পয়সা, মামী বলে টাকায় দেড় পয়সা, এই আধপয়সা নিয়ে ধস্তাধস্তি। শেষ অবধি
শেষ অবধি কি হল তা আর শোনা হল না নবকুমারের, সহসা বাড়ির মধ্যে থেকে ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার-রোল ভেসে এল।
সর্বনাশ করেছে
সদুর নিষেধবাণী ভুলে নবকুমার সর্বনাশ শব্দটাই আবারও ব্যবহার করল, নিশ্চয় হয়ে গেল একটা কিছু!
সদু ততক্ষণে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
আর নবকুমার?
সে চলৎশক্তি হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিজেদেরই বাড়িখানার দিকে তাকিয়ে।
তীক্ষ্ণ তীব্র সানুনাসিক এই স্বরটা কার?
এ তো এলোকেশীর!
তবে হলটা কি?
কিন্তু যাই ঘটুক, সব কিছু ছাপিয়ে নবকুমারের প্রাণটা হাহাকারে ভরে উঠল এই ভেবে– এই অ-সাধারণ বৌ নিয়ে ঘর করা হল না নবকুমারের অদৃষ্টে!
মা হয় বৌকে মড়িপোড়ার ঘাটে পাঠাবে, নয় জন্মের শোধ বাপের বাড়ি বিদেয় করে দেবে।
মার চিৎকার উত্তরোত্তর আকাশে উঠছে।
আর দলে দলে পড়শীরা নবকুমারের বাড়ির দিকে দৌড়চ্ছে।
নবকুমার যাত্রাগানের দর্শকের মত পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে সেই দৃশ্য!
২১. ত্রিবেণীর ঘাটে এসেছিলেন রামকালী
ত্রিবেণীর ঘাটে এসেছিলেন রামকালী। রোগী দেখতে নয়, যোগে গঙ্গাস্নান করতে। একাই আস্ত একটা পারানী নৌকা ভাড়া করেছিলেন স্নানের জন্যে। পাঁচজনের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে নৌকা বোঝাই হয়ে। যেতে রামকালী ভালবাসেন না। দরকার হলে একাই ভাড়া করেন।
আগে অবশ্য এমন নৌকাভ্রমণ সহজ হত না। কারণ রামকালী যোগের স্নান করতে ত্রিবেণী যাচ্ছেন, কি কাটোয়া যাচ্ছেন, কি নবদ্বীপ যাচ্ছেন টের পেলে সত্যবতী একেবারে নাছোড়বান্দা হয়ে পেয়ে বসত। পায়ে পায়ে ঘুরে কাকুতি-মিনতি-করা মেয়েকে রামকালী এড়াতে পারতেন না, সঙ্গে নিতেন। অগত্যাই নেড়ু আর পুণ্যি। ওদের ফেলে রেখে শুধু নিজের মেয়েকে নিয়ে কোথাও যাবেন, এমন দৃষ্টিকটু কাজ রামকালীর পক্ষে সম্ভব নয়।
ওরা যেত।
রামকালী জলে সাবধান করতেন। আর স্নানের শেষে ঠাকুর-দেবতা দেখিয়ে নিয়ে ফিরতেন। ঘাট আর পথ, নৌকা আর মন্দির-প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে উঠত ছোট্ট একটা বাক্যবাগীশ মেয়ের বাক্যস্রোতে।
আজকে শুধু জলের উপর দাঁড়টানার ছপাৎ ছপাৎ শব্দ। উন্মুক্ত গঙ্গাবক্ষের দিকে তাকিয়ে ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন রামকালী।
আকাশের পাখিটা খাঁচায় বন্দী হয়ে কেমন আছে কে জানে!
পুণ্যিটার বিয়ের ঠিক হয়ে আছে।
গত ক-মাস অকাল ছিল বলে বিয়ে হয়নি। কিন্তু পুণ্যি অন্য ধরনের মেয়ে। নেহাৎ সত্যর “প্রজা” হিসেবে দস্যিচাল্লি করে বেড়িয়েছে, নচেৎ একান্তই ঘরসংসারী মেয়ে সে। খাঁচার পাখি হয়েই জন্মেছে পুণ্যি আর পুণ্যির মত মেয়েরা।
কিন্তু সত্যর মত দ্বিতীয় আর একটা মেয়ে আর দেখলেন কই রামকালী? যে মেয়ে প্রতি পদে প্রশ্ন তুলে জানতে চায় “কী” আর “কেন”!
খোলা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আর একবার মনে হল রামকালীর, কতদিন যোগে স্নান করি নি। মনে হচ্ছে যেন দীর্ঘকাল। আর একটা নিঃশ্বাস পড়ল।
মাঝিটা একবার কথা কয়ে উঠল, খুকী শ্বশুরঘরে কত্তাবাবু?
রামকালী বললেন, হুঁ।
আর বার দুই ছপাৎ ছপাৎ করে ফের মাঝিটা বলে উঠল, থাকবে এখন?
সংক্ষেপে “দেখি” বলে আলোচনায় ইতির সুর টানলেন রামকালী। পুণ্যির বিয়ে আসছে, এই যা একটু আশার আলো দেখা যাচ্ছে, নইলে থাকবে ছাড়া আর কি। চিরকালই থাকবে সেখানে। আর সেইটাই তো কাম্য। মোক্ষদার মত অনবদ্য রূপ আর অশেষ তীক্ষ্ণতা নিয়ে আজীবন বাপের ঘরে বসে জ্বলতে থাকবে, এমন ভাগ্য কেউ মেয়ের প্রার্থনা করে না। ঘরে থাকা মেয়ে মানেই দুর্ভাগা মেয়ে। অথচ মাঝে মাঝে পালেপার্বণে কি ভাত-পৈতে-বিয়েয় কুটুম্বের মত যে আসা, সে আসায় মায়ের প্রাণ ভরতে পারে, বাপের ভরে না। অতএব তাতে ইতি হয়ে গেছে।
কিন্তু শুধু মেয়ে-সন্তান কেন, পুত্র-সন্তান হলেই বা কতটুকু তফাৎ? ছেলে ঘরে থাকে, ছেলের ওপর জোর খাটে, এই পর্যন্ত। ছেলে বড় হয়ে গেলে আর কি তাকে নিয়ে মন ভরে? তাই হয়তো মানুষ জীবনের মধ্যে বারে বারে নতুন শিশুকে ডেকে আনে জীবনকে সরস রাখতে, ভরাট রাখতে। আবার তার পরেও আশ্রয় খোঁজে টাকার সুদের মধ্যে।
