গায়ে চিমটি কেটে দেখ। বলে পুকুরের জলে হাত ডুবিয়ে ডুবিয়ে ছাই মাটি ধুতে ধুতে বলে সদু, মামী বুঝি রণচণ্ডী হয়ে তেড়ে এসেছিল?
জানি না।
জানিস না? ন্যাকামি রাখ দিকি নবু, হয় কি হয়েছে তাই বল, নয় যে দিকে যাচ্ছিলি সেই দিকে যা। বেটাছেলে না মেয়েমানুষ তুই?
সদুদি, যে দৃশ্য দেখে এসেছি, তা দেখলে অতি বড় বীর বেটাছেলেরও পেটের ভেতরে হাত পা সেঁধিয়ে যায়।
নাঃ, তোর দেখছি আর গৌরচন্দ্রিকে শেষ হয় না। বলবি তো বল, না বলবি তো যা। ভূত দেখেছিস, না ডাকাত পড়া দেখেছিস তাও তো জানি না।
নবকুমার বুকে বল করে কণ্ঠে শব্দ আনে, ঝপ করে বলে ওঠে, মাতে আর তোমাদের বৌতে মারামারি করছে!
কি করছে মাতে আর বৌতে? চমকে উঠে বলে সৌদামিনী।
বললাম তো, মারামারি করছে!
সৌদামিনী এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে তারপর বলে, মারামারি কথাটা বলছিস কেন, মামী বৌকে ধরে ঠেঙাচ্ছে, তাই বল! আর সেই দৃশ্য দেখে তুই মদ্দ পুরুষ কাছা-কোঁচা খুলে ছুট মারছিস! কেন তুই মেয়েমানুষ হয়ে জন্মাস নি নবু তাই ভাবি। যাই দেখি ইতিমধ্যে কি এমন ঘটল। এই তো খানিক আগে বাসনের পাঁজা নিয়ে বেরিয়ে এলাম দেখলাম মামী বেটার বৌয়ের চুল বাঁধছে, ইতিমধ্যে হলটা কি?
আমি তো এই ঢুকলাম বাড়িতে। তুমি শীগগির যাও সদুদি।
যাই। বাবা পলকে প্রলয়, তিল থেকে তিলভাণ্ডেশ্বর! কি হল এক্ষুনি?
সৌদামিনী তাড়াতাড়ি বাসনগুলো ধুয়ে নিতে থাকে।
আমি আজ নিতাইদের বাড়িতেই থাকব সদুদি। এই চললাম।
সৌদামিনী ভুরু কুঁচকে বলে, কদিন পরের বাড়িতে থাকবি?
যতদিন চলে।
তার মানে নিজে গা বাঁচিয়ে কেটে পড়বি, আর পরের মেয়েটা, দুধের মেয়েটা তোর মার হাতে পড়ে মার খাবে!
পরের মেয়ে এবং দুধের মেয়ে শব্দটায় নবকুমারের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে, চোখে জল এসে যায়। কষ্ট গোপন করে বলে, তা আমি আর কি করব!
সৌদামিনী আড়চোখে একবার ওর মুখচ্ছবি দেখে নিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলেন, দৃশ্য দেখে চলে এলে পারতিস, তুই দেখছিস জানলে যতই হোক নিজেকে একটু সামলে নিত মামী, একেবারে শেষ করে ফেলত না। যাই দেখি ছুঁড়ি বাঁচল কি মরল!
নবকুমার লজ্জা ত্যাগ করে সহসা বলে ওঠে, যাই বল সদুদি, যা দেখলাম ও তোমাদের বৌটি পড়ে মার খাবার মেয়ে নয়।
আমারও তাই মনে হয়, বলে সদু সকৌতুকে একটু হেসে বলে, মারামারি না করুক, পড়ে মার খাবে না। তাই তুই তো বলতেই পারলি না হয়েছেটা কি?
গোড়া থেকে কি কিছু জানি ছাই। বাড়ি ঢুকেই দেখি দাওয়ায় দু প্রাণী সুমুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একজন সাপিনীর মত ফুঁসছে, আর একজন বাঘিনীর মতন গজরাচ্ছে।
সৌদামিনী হেসে উঠে বলে, বা রে, তুই তো অনেক নাটুকে কথা শিখেছিস দেখছি! যাক কালে-ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। তোর বৌও খুব পণ্ডিত।
বৌয়ের গল্প কান ভরে শুনতে ইচ্ছে করে নবকুমারের, ভুলে যায় এইমাত্র তাকে বাঘিনীর সঙ্গে তুলনা করেছে সে নিজেই। কিন্তু গল্প বাড়বে কি উপায়ে? নবকুমার তো আর কথা ফেলে বাড়াতে পারে না?
শুধু ভাবে, কালে-ভবিষ্যতে!
সে কত কাল?
কোন ভবিষ্যৎ?
বাঘিনীর মুখটা বার বার মনে ধাক্কা দিচ্ছে। ভয়ঙ্কর, কিন্তু সুন্দর! কী বড় বড় চোখ, কী চমৎকার জোড়া ভুরু!
কিন্তু বৌও মায়ের মত রাগী হবে হয়তো। লজ্জায় কুণ্ঠায় বিগলিত বৌটি মাত্র থাকবে না। নবকুমারের কল্পনার সঙ্গে ঠিক খাপ খাচ্ছে কি?
ঠিক যেন কি একটা লোকসানের দুঃখে বুকটা টনটন করে ওঠে নবকুমারের।
কাদার পুতুলের মত একটি নিরীহ ভালমানুষ বৌ নবকুমারের ভাগ্যে জুটলে কি এসে যেত ভগবানের! কত লোকেরই তো তেমন বৌ হয়!
কিন্তু সাপের ফণার মত চুলের ফণায় ঘেরা ওই মুখখানি।
ওতে যেন আগুনের আকর্ষণ।
নবকুমার পতঙ্গ মাত্র।
সৌদামিনী বলে, বিবাগী হয়ে যাচ্ছিলি তো যা, মেলা রাত করিস নে হাঁড়ি আগলে বসে থাকতে পারব না।
হাঁড়ি!
রান্না!
ভাত!
এসব শব্দগুলো কাজে লাগবে আজ! নবকুমারের যেন বিশ্বাস হয় না। ভয়ে ভয়ে বলে, আছি এখানটায় আমি– তুমি, তুমি একবার দেখে এসে খবরটা আমায় দিতে পার না সদুদি? নিশ্চিন্দি হয়ে তা হলে আমাদের তাসের আড্ডায় যেতে পারি।
ওরে আমার কে রে, উনি বাবু বসে থাকবেন, আর আমি ওঁর জন্যে খবরের থালা বয়ে আনব!
বলে থালা-বাসনের গোছাটা বাগিয়ে কাঁধের ওপর তুলে নেয় সদু। হাতে গামছার পুঁটুলিতে ঘটিবাটি। চলে যেতে যেতে ছোট ভাইকে আর একবার অভয় দেয় সে, বৌয়ের চিন্তে করে মনখারাপ করিস নে, নেহাৎ যদি মামী খুন করে ফাঁসির দায়ে না পড়ে তো ওই বৌয়ের দ্বারাই শায়েস্তা হবে। বৌ তোর যেমন তেমন মেয়ে নয়।
যদি খুন না করে!
যদিটা নবকুমারের বুকের মধ্যে কাঁটার মত খচখচিয়ে ওঠে, কিন্তু প্রশ্ন তুলতে পারে না, শুধু ম্রিয়মাণ হয়ে বসে থাকে।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে, এখেনে আর বসে থাকতে হবে না, যা কোথায় যাচ্ছিলি ঘুরে আয়।
সদু লম্বা লম্বা পা পেলে বাঁশবাগানের খানিকটা অতিক্রম করে। কিন্তু নবকুমার আবার পিছু নিয়েছে। উদ্ভ্রান্ত মুখ, ছলছল চোখ।
সদুদি, তোমার সঙ্গে আমি যাব?
সদু মৃদু হেসে পা চালাতে চালাতেই বলে, কেন, এই যে বললি আর কখনো বাড়ি ফিরবি না?
মনটা কি রকম যেন করছে সদুদি! বলে সঙ্গে সঙ্গে এগোতে এগোতে নবকুমার হঠাৎ সুর বদলায়, বৌ যদি মাকে অপমান করে থাকে, তারও শাস্তি করা দরকার।
