জীবনে অনেকবার রেগে জ্ঞানহারা হয়েছেন এলোকেশী, অনেকবার বুক চাপড়েছেন শাপমন্যি দিয়েছেন দাপাদাপি করেছেন, কিন্তু আজকের মত অবস্থা বোধ হয় তার জীবনে আসে নি।
এ অবস্থা যে তার কল্পনার বাইরে, স্বপ্নের বাইরে। তাই সহসা যেন নিথর হয়ে গেলেন তিনি, সাপের মত ঠাণ্ডা চোখে শুধু তাকিয়ে রইলেন সেই দুঃসাহসের প্রতিমূর্তির দিকে।
ঠিক এই অবস্থায় থাকলে কতক্ষণে কি হত বলা শক্ত, কিন্তু ভাগ্যের কৌতুকে আর এক অঘটন ঘটে গেল।
এই নাটকীয় মুহূর্তে উঠোনের বেড়ার দরজা ঠেলে বাড়িতে এসে ঢুকল নবকুমার। ঢুকেই যেন বজ্রাহত হয়ে গেল।
এ কী পরিস্থিতি।
সহস্র সাপের ফণার মত একরাশ চুলের ফণায় ঘেরা সম্পূর্ণ খোলামুখে এলোকেশীর মুখোমুখি অগ্নিবর্ষী দুই চোখে সোজা তাকিয়ে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, কে ও?
নবকুমারের বৌ নাকি?
কিন্তু তাই কি সম্ভব?
আকাশ থেকে বাজ পড়ছে না, পৃথিবীর মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে না, এমন কি প্রলয়ঙ্কর একটা ঝড়ও উঠছে না, অথচ নবকুমারের বৌ নবকুমারের মার সামনে অমনি করে দাঁড়িয়ে আছে?
আর নবকুমার ঢুকে হাঁ করে দাঁড়িয়ে পড়া সত্ত্বেও দৃকপাতমাত্র করছে না?
অসম্ভব! অসম্ভব!
এ অন্য আর কেউ!
নবকুমারের অজানিত পড়শীবাড়ির মেয়ে। হয়তো ভয়ঙ্কর কোন একটা কিছু ঘটেছে ওদের সঙ্গে।
নবকুমার গলাখাকারি দিতে ভুলে যায়, সরে যেতে ভুলে যায়, স্তম্ভিত বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। বিপদ যে ঘোরতর! অসম্ভব বলে একেবারে নিশ্চিন্ত হতেই বা পারছে কই?
বৌয়ের মুখটা দেখবার সৌভাগ্য কোনদিন না হলেও এই মাসখানেকের মধ্যে কোন না বিশ পঁচিশবার আভাসে ছায়ায় বৌকে দেখতে পেয়েছে সে। যদিও পাছে কেউ দেখে ফেলে বৌয়ের দিকে তাকিয়ে আছে নবকুমার, তাই সেই তাকানোটা পলকস্থায়ী হয়েছে মাত্র।
তবুও ক্যামেরার লেনস্ পলকের মধ্যেই চিরকালের মত ছবি ধরে রাখে।
মুখ না দেখুক, সর্ব অবয়বের একটা ভঙ্গি তো দেখেছে।
আর দেখেছে ওই নীলাম্বরীর আঁচলখানা।
অতএব মনকে চোখ ঠেরে লাভ নেই। চোখ বুজে সূর্যকে অস্বীকার করতে যাওয়া হাস্যকর।
পড়শীবাড়ির কেউ নয়, ওই দৃপ্ত মূর্তি নবকুমারের বৌয়েরই।
যে বৌয়ের উদ্দেশে নবকুমার স্বপ্নে জাগরণে নিঃশব্দ উচ্চারণে ক্রমাগত গেয়েছে, গাইছে, কও কথা মুখে তুলে বৌ, দেখ না চেয়ে চোখ খুলে।
কিন্তু সে কী এই চোখ!
নবকুমার যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, যদি পরিস্থিতি দেখে তেমনি নিঃশব্দে সরে পড়ত, তাহলে হয়তো নাটকের এই নাট্য-মুহূর্তটা এমন চূড়ান্তে উঠত না, হয়তো সত্যবতী নির্ভীকভাবে সেখান থেকে সরে যেত, আর এলোকেশী জীবনে যত গালি-গালাজ শিখেছেন, সবগুলো উচ্চারণ করতেন বসে বসে। আর স্বামী-পুত্র বাড়ি ফিরলে বৌয়ের এই মারাত্মক দুঃসাহস আর ভয়ঙ্কর দুর্বিনয়ের কাহিনী বিস্তারিত বর্ণনায় পেশ করতেন। তারপর গড়িয়ে যেত ব্যাপারটা।
কিন্তু নির্বোধ নবকুমার সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইল হাঁ করে।
আর এক সময়ে এলোকেশীর চোখ গিয়ে পড়ল তার ওপর। দাওয়ার উপর তিনি, নিচে উঠোনে ছেলে।
নবকুমারকে এভাবে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এলোকেশীও একবার হাঁ হয়ে গেলেন, তারপর সহসা সেই এতক্ষণের স্তব্ধ হয়ে থাকা হাঁ থেকে ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার উঠল, ওরে লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা মেনিমুখো ছোঁড়া, পায়ে কি তোর জুতো নেই? জুতিয়ে জুতিয়ে ওর মুখটা যদি জন্মের শোধ ছেঁচে শেষ করে দিতে পারিস, তবে বলি বাপের বেটা বাহাদুর!
কিন্তু নবকুমার নিশ্চল।
পরক্ষণেই সুরফেৰ্তা ধরলেন এলোকেশী, ওগো মাগো, কোথায় আছি দেখ গো, বেতা বেটা-বৌ দুজনে মিলে কী অপমান্যিটা করছে আমায়! ওরে নবা, বামুনের গরু, ছোটলোকের মেয়ে বিয়ে করে তুইও কি ছোটলোক হয়ে গেলি? দু পায়ে খাড়া দাঁড়িয়ে মায়ের অপমানটা দেখছিস? তবে মার মার, ঝাটা আমাকেই মার। ঝাটা খাওয়াই উপযুক্ত শাস্তি আমার। নইলে এখনো ওই বৌকে ভিটের বুকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দিই? মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিই না? ওগো মাগো, বৌ আমায় ধরে মারে আর তাই আমার ছেলে দাঁড়িয়ে দেখে!
এতক্ষণে নবকুমার বোধ করি চেতনা ফিরে পায়, আর ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোঁ চোঁ দেড় মারে সেই খোলা দরজাটা দিয়ে।
.
খিড়কির ঘাটে বাসন মাজছিল সদু, ঘাটের পাশ দিয়ে নবকুমারকে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে দেখে দাঁড়িয়ে উঠে ছাইমাখা হাতটাই নেড়ে ডাক দেয়, নবু, কি হল রে? অ নবু, অমন করে ছুটছিস কেন?
নবকুমার প্রথমটা ভাবল পিছুডাকে সাড়া দেবে না, ছুটে একেবারেই নিতাইয়ের বাড়ি গিয়ে পড়বে, তারপর বলবে, জল দে এক ঘটি।
কারণ নিতাই হচ্ছে তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু। বিচলিত অবস্থায় তার কাছেই যাওয়া চলে।
কিন্তু সৌদামিনীর উত্তরোত্তর ডাকে কি ভেবে থমকে দাঁড়াল, ফিরল, তারপর গুটি গুটি এসে ঘাটের পাশে একটা ঝড়ে-পড়া তালগাছের গুঁড়ির ওপর বসে পড়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, আমি আর বাড়ি ফিরব না সদুদি।
কথার ছিরি শোন ছেলের! হল কি তাই বল?
সর্বনাশ হয়েছে সদুদি!
আরে গেল যা! সর্বনাশের কথা বলতে আছে নাকি?
হলে বলতে আছে বৈকি।
সদু নবকুমারের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত, তাই বেশি ভয় না পেয়ে বলে, কেন, তোর মা হঠাৎ চড়ি ওল্টালো নাকি?
মা নয় সদুদি, মা নয় আমিই। জানি না, ঠিক বলতে পারছি না, আমি সত্যি বেঁচে আছি কিনা!
