তাই ভারীমুখে বলেন, হ্যাঁ, আমি ভুলে থাকছি আর রোজ তুমি আমায় ডেকে তুলে ঝিনুকে করে গিলিয়ে দিচ্ছ।
আহা তা না দিই, তোমার কি খেয়াল থাকে?
না থাকে না থাক। বৌয়ের চুল আজ থেকে আমি বাঁধব এই বলে রাখছি। ওর চুলের দড়ি কাটা সব আমার ঘরে রেখে যাবি। পাখী-কাঁটাগুলো দিতে ভুলবি না।
দেব, দিয়ে যাব। তা বৌয়ের বাবা যে সোনার চিরুনি, সাপকাটা, বাগান ফুল ইত্যাদি করে একরাশ মাথার গহনা দিয়েছেন, সেগুলোই বা বাক্সয় পুরে রাখছ কেন? সব বার করে বাহার করে দিও!
সে আমি কি করব না করব তোমার কাছে পরামর্শ নিতে আসব না! অনবরত খালি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা! ভগবান যে কেন কঠিন রোগ দিয়ে তোর বাকশক্তি হরণ করে নেন না তাই বি। তুই জনোর শোধ বোবা হয়ে বসে থাক, আমি নিসিংহতলা’য় ভোগ চড়াই।
দোহাই মামী, ওসব মানত-টানত করতে যেও না। দেব-দেবীরা এক শুনতে আর এক শুনে বসে থাকে, হয়ত বোবার বদলে ঠুটো করে দেবে, তখন মরবে তুমি লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে।
কী বললি! তুই ঠুটো হয়ে বসে থাকলে আমার সংসার অচল হয়ে যাবে? সাধে বলি অহঙ্কারে পাঁচ-পা তোর। আমার সংসার আমি চালাতে পারি নে ভেবেছিস? বা হাতের কড়ে আঙুলে পারি। কিন্তু সে আঙুলই বা আমি নাড়ব কেন? ভাতকাপড় দিয়ে তোকে পুষছি যখন!
আহা, আমিও তো তাই বলছি গো। ঠুটো হলেও তো ভাত-কাপড়টা দিতেই হবে।
হবে! দায় পড়েছে। ঠ্যাং ধরে টেনে পগারে ফেলে দেব।
সর্বনাশ মামী, ও বুদ্ধি করতে যেও না, পাড়াপড়শী তাই সেই পণে শাক তুলে এনে তোমাদের গালে মুখে মাখাবে। বলে হাসতে হাসতে চলে যায় সৌদামিনী সত্যবতীকে স্তম্ভিত করে রেখে।
বড় সংসারের মেয়ে সত্যবতী, তার এতটুকু জীবনে অনেক চরিত্র দেখেছে, এরকম আর দেখেনি।
.
যাক, সকালের সেই ঘটনার পরিণামে আজ দুপুরের এই মল্লযুদ্ধ।
সত্যিই বড় ভারী চুলের গোড়া সত্যর, অথচ এদিকে ঝুলে খাটো! এক গোছা কালো ঘুসি দিয়ে কষে বেঁধে আর গোছা গোছা ঘুনসির ভেজাল মিশিয়ে বেণী দুটো যদিবা লম্বা করলেন এলোকেশী, তাদের প্রজাপতি ছাদে পাক খাওয়াতে গিয়েই গোড়াসুদ্ধ ঢিলে হয়ে নেমে এল। সত্যবতীর কপালের ফের, ঠিক সেই মুহূর্তেই সত্যবতী বোধ করি পিঠের খিল আর পায়ের ঝিঝি ধরা কমাতে একটু নড়েচড়ে বসল।
ব্যাপারটা হল পাত্ৰাধার তৈল কি তৈলাধার পাত্রের মতই। বন্ধনটা ঢিলে হয়ে পড়ার জন্যেই মুক্তির সুখে নড়েচড়ে বসল সত্যবতী, না নড়েচড়ে বসার জন্যেই বেণী বন্ধনমুক্ত হয়ে গেল সেটা বোঝা গেল না। এলোকেশী দেখলেন বৌ নড়ল, চুল খুলল।
এলোকেশী পাথরের দেবী নন, রক্তমাংসের মানুষ, এরপরও যদি তাকে ঠাণ্ডা মাথায় সহজভাবে বসে থাকতে দেখবার আশা করা যায়, সে আশাটা পাগলের আশা। পাগলের আশা পূরণ হয় না, হবার নয়।
এতক্ষণের পরিশ্রম পণ্ড হওয়ার রাগে, আর সৌদামিনীকে নিজের শিল্পপ্রতিভা দেখিয়ে দেবার আশাভঙ্গে, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য এলোকেশী সহসা একটা অভাবিত কাজ করে বসলেন। বৌয়ের। সেই খিল-ছড়ানো সিদে পিঠটার ওপর গুম করে একটা গোলগাল কিল বসিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, হল তো! গেল তো গোল্লায়! এক দণ্ড যদি সুস্থির
কিন্তু কথা এলোকেশীকে শেষ করতে হল না, মুহূর্তের মধ্যে আর এক প্রলয় ঘটে গেল। শাশুড়ীর হাত থেকে চুলের ভার এক হ্যাঁচকায় টেনে নিয়ে সত্যবতী ছিটকে দাঁড়িয়ে উঠল, আর শাশুড়ীর সঙ্গে যে কথা কওয়া নিষেধ সে কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে দৃপ্তস্বরে বলে উঠল, তুমি আমায় মারলে যে!
কিলটা বসিয়ে চকিতে হয়তো একটু অনুতপ্ত হয়েছিলেন এলোকেশী, কিন্তু সে অনুতাপের অনুভূতি দানা বাঁধবার আগেই এই আকস্মিক বিদ্যুতাঘাতে এলোকেশী প্রথমটা যেন পাথর হয়ে গেলেন। বৌয়ের কণ্ঠস্বর কেমন সেটা জানবার সুযোগ এ পর্যন্ত হয় নি এলোকেশীর, কেননা তার সঙ্গে তো বটেই, তাঁর সামনেও কোনদিন বৌ কথা কয় নি। কইবার রেওয়াজও নেই। কোনও প্রশ্ন করলে শুধু ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ-না জানিয়েছে। কথা যা সে সদুর সঙ্গে। কিন্তু সেও তো নিভৃতে। রাত্রে সৌদামিনীর কাছেই শোয় বৌ, কারণ ডাগরটি না হলে তার ঘর-বরের প্রশ্ন ওঠে না।
না, কোন ছলেই সত্যর কণ্ঠস্বর এলোকেশীর কানে আসে নি, সহসা আজ সেই স্বর বাজের মত এসে কানে বাজল।
এ কী জোরালো গলা বৌ-মানুষের!
এতটুকু একটা মানুষের।
অনুতাপের বাষ্প ধুলো হয়ে উড়ে গেল।
এলোকেশীও দাঁড়িয়ে উঠলেন। চেঁচিয়ে তেড়ে উঠলেন, মেরেছি বেশ করেছি। করবি কি শুনি? তুইও উল্টে মারবি নাকি?
সত্য তখন এলোকেশীর অনেক পরিশ্রমে গড়া সাতগুছির বেণী দুটোর মধ্যে আঙুল চালিয়ে চালিয়ে জোরে জোরে খুলে ফেলতে শুরু করেছে। মাথায় কাপড় নেই, মুখের আঁচল খসেছে, সেই মুখে আগুনের আভা।
এলোকেশীর কথায় একবার সেই আগুনভরা মুখটা ফিরিয়ে অবজ্ঞাভরে উচ্চারণ করল সত্য, আমি অমন ছোটলোক নই। তবে মনে রেখো আর কোনদিন যেন–
কী বললি? আর কোনদিন যেন? গলা টিপলে দুধ বেরোয় এক ফোঁটা মেয়ে, তার এত বড় কথা! মেরে তোকে তুলো ধুনতে পারি তা জানিস?… সদি লক্ষ্মীছাড়ি, আন দিকি একখানা চ্যালাকাঠ, কেমন করে বৌ ঢিট করতে হয় দেখাই ত্রিজগৎকে। চ্যালাকাঠ পিঠে পড়লেই তেজ বেরিয়ে যাবে।
মারো না দেখি, তোমার কত চ্যালাকাঠ আছে!
বলে দৃপ্তভঙ্গিতে সোজা শাশুড়ীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে সত্যবতী নির্ভীক দুই চোখ মেলে।
