মুখে আঁচল চাপা না দিয়ে উপায় নেই, কারণ চুল বাঁধবার সময় ঘোমটা দেওয়া চলে না। অথচ জলজ্যান্ত আস্ত মুখোনা খুলে বসে থাকলেও তো চলে না। না-ই বা ধারেকাছে কেউ থাকল আর হলই বা শাশুড়ী পিছনে বসে, তবু নতুন বৌ বলে কথা। তাই আঁচলটা তুলে মুখে চাপা দিয়েছে সত্যবতী। মানে দিতে বাধ্য হয়েছে। ঘোমটা খসবার আগেই এলোকেশী নির্দেশ দিয়েছেন, আঁচলটা মুখে ঢাকা দাও দিকি বাছা! তোমার তো আর বোধ-বুদ্ধির বালাই নেই, অগত্যে সবই স্পষ্ট করে বলে দিতে হবে আমায়।
.
দিনটা কি তবে সত্যবতীর শ্বশুরবাড়ি বাসের প্রথম দিন?
না তা নয়, এসেছে সত্যবতী প্রায় মাসখানেক হয়ে গেল, কিন্তু মাথাটা ওর এ পর্যন্ত শাশুড়ীর হাতে পড়ে নি। সৌদামিনীই চুল বেঁধে সরময়দা মাখিয়ে আলতা পরিয়ে নতুন বৌয়ের প্রসাধন আর যত্নসাধন করছিল কদিন! হঠাৎ আজ এলোকেশীর নজরে পড়ল বৌয়ের চুল বেড়াবিনুনি করে বাঁধা।
দেখে রাগে জ্বলে উঠলেন এলোকেশী। তবু নিশ্চিন্ত হবার জন্যে ভুরু কুচকে ডাক দিলেন, এদিকে এস দিকি বৌমা!
শাশুড়ীর সামনে কথা বলাও নিষেধ, মুখ খোলাও নিষেধ, সত্যবতী নীরবে কাছে এসে দাঁড়াল।
ঘোমটা অবশ্য বজায় থাকলই, এলোকেশী হ্যাঁচকা একটা টানে পুত্রবধূর পিঠের কাপড়টা তুলে খোঁপাটা দেখে নিলেন। ঠিক বটে, বেড়াবিনুনিই বটে।
তেলে-বেগুনে জ্বলে ডাক দিলেন, সদু! সদি!
যাকে বলে ত্রস্তেব্যস্তে সেইভাবে ছুটে এল সৌদামিনী। দেখল নতুন বৌ বুকে মাথায় এক হয়ে ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে, আর মামী তার পিঠের কাপড় উঁচু করে তুলে ধরে দণ্ডায়মান। মামীর নয়নে অগ্নিশিখা; কপালে কুটিলরেখা।
কি বলছ এ প্রশ্ন উচ্চারণ করল না সৌদামিনী, শুধু শঙ্কিত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল।
কি হল বৌয়ের পিঠে?
কোন জড়ল চিহ্ন, না কোন চর্মরোগের আভাস, নাকি বা কোন পুরনো ক্ষতের দাগ! অর্থাৎ নতুন বৌ কি ‘দাগী’! আর মামীর শ্যেনদৃষ্টির সামনে ধরা পড়ে গেছে সেটা!
অবশ্য ভুল ধারণা নিয়ে বেশীক্ষণ থাকতে হল না সৌদামিনীকে, এলোকেশী প্রবল স্বরে বলে উঠলেন, বলি সদি, এমন ব্যাপার ঠেলার কাজ কি না করলেই নয়?
বুক থেকে পাথর নামে সৌদামিনীর।
যাক বাচা গেল।
নতুন কিছু নয়। সেই আদি ও অকৃত্রিম লক্ষ্য।
অতএব সাহসে ভর করে বলল, কি হল?
কি হল! বলি শুধোতে লজ্জা করল না? ধম্মের ষাঁড়ের মতন আঁকাড়া গতর নিয়ে দুবেলা ভাতের পাথর মারছিস, আর গতরে হাওয়া দিয়ে বেড়াচ্ছিস, একটু হায়া আসে না প্রাণে? দশটা নয় বিশটা নয় একটা ভাই-বৌ, তার চুলটা বেঁধে দিয়েছিস এত অচ্ছেদ্দা করে! বলি কেন? কেন? এত
হলটা কি তা বলবে তো?
সহজ গলায় বলে সৌদামিনী। আর সত্যবতী ঘোমটার মধ্যে থেকে অবাক হয়ে প্রায় থরথর করে কাঁপতে থাকে। না, এলোকেশীর কটু-ভাষণে নয়, গিন্নীদের মুখে এরকম বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা শোনার অভ্যাস পাড়াবেড়ানি সত্যর আছে। রামকালী চাটুয্যের বাড়ির কথাবার্তাগুলো কথঞ্চিত সত্য, নইলে তারই সেজপিসি সাবিপিসির বাড়ি সর্বদা এই ধরনের কথার চাষ। সেজন্যে না। এলোকেশীর কটুভাষণে না অবাক হয় সৌদামিনীর সহ্যশক্তি দেখে। এত অপমানের পর ওই রকম সহজভাবে কথা বলল ঠাকুরঝি!
এটা সত্যবতীর অদেখা।
কটু কথার পরিবর্তে হয় কটু কথা, নয় ক্রন্দন, এই দেখতেই অভ্যস্ত সে! আর ঠাকুরঝি কিনা! বলছে হলটা কি তা বলবে তো?
এলোকেশী অবশ্য অবাক হন না, কারণ সৌদামিনীর এই সহ্যশক্তি তার পরিচিত। তবে তিনি তো আর প্রশংসায় উদ্বেল হন না, বরং এটা তার মামীর প্রতি অগ্রাহ্য ভাব বলেই রেগে জ্বলে যান।
এখনো তাই বললেন, হলটা কি তা বলে তবে বোঝাতে হবে? মনে মনে জানছ না? চোখে দেখতে পাচ্ছ না? এ কী ছিরির চুল বাধা হয়েছে? বৌয়ের মাথায় বেড়া-বিনুনি! ছি ছি, এতখানি বয়েস হল, কখনো শ্বশুরবাড়ির বৌয়ের মাথায় বেড়া-বিনুনি দেখি নি! গলায় দড়ি তোর সদু, গলায় দড়ি যে একটা মাত্তর মাথা, তাও একখানা বাহারি খোঁপা বেঁধে দিতে পারিস না!
সদু হেসে ওঠে, বৌয়ের চুল যা বাহারি, ওতে আর বাহারি খোঁপা হয় না। বাগ মানানোই যায়।
বাগ মানানো যায় না! এলোকেশী ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, আচ্ছা, দেখব কেমন না যায়। এই বড়য্যে-গিন্নীর কাছে জব্দ হয় না এমন কোন বস্তু জগতে আছে দেখি! ত্রিজগতের মধ্যে বাগ মানাতে পারলাম না শুধু এই তোমাকে।
বেশ তো মামী, তুমি নিজে হাতেই বৌকে সাজিও না, তোমার একটা মাত্তর বেটার বৌ! বলে সৌদামিনী।
আর এলোকেশী আরও ধেই ধেই করে ওঠেন, কি বললি সদি? এ্যা! এত আসপদ্দা! মুখে মুখে জবাব! এত অহঙ্কার তোর কবে চূর্ণ হবে, কবে তোর দুঃখে শ্যালকুকুর কাঁদবে, সেই আশায় আছি আমি। এই তোকে দিব্যি দিলাম সদি, যদি আর কোনদিন তুই আমার বো’র চুলে হাত দিবি!
গুরুজনের দিব্যি গায়ে লাগে না– এ মানলে কি চলে গা? সদু অম্লানবদনে বলে, তোমার হল গে মন-মর্জি, কোনদিন দেবে, কোনদিন বা ভুলে যাবে–
কী বললি! কী বললি লক্ষ্মীছাড়ি! আমার একটা বেটার বৌয়ের কথা আমি ভুলে যাব?
তা তাতে আর আশ্চয্যি কি মামী! সদু নিতান্ত অমায়িক মুখে বলে, তোমার সে গুণে কি ঘাট আছে? আপনার খিদের খাওয়া, তাই তো অর্ধেক দিন ভুলে যাও, ডেকে খাওয়াতে হয়।
এলোকেশী সহসা থতমত খান এটা ঠিক কোন ধরনের কথা ধরতে পারেন না অভিযোগ না প্রশস্তি?
