আমি কাউকে কিছু দেখাতে চাই না, বীরপুরুষ রাসু বলে, গুরুজন যা নির্দেশ দেবে মানব, ব্যস।
তা তো মানবেই। সেখানে যে মধু আছে। নতুন বাগানের নতুন ফুল। পাটমহলের পাটরাণী।
বাজে কথা বলো না।
বাজে কথা বটে!
সারদা আর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, আমার গা ছুঁয়ে প্রিতিজ্ঞে করেছিলে, সে কথা মনে পড়ছে?
পড়বে না কেন? তা আমি তো আর জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছি না। যাচ্ছি একটা মান্যমান লোকের শ্রাদ্ধয়।
তার সঙ্গে আমারও শ্রাদ্ধ-পিণ্ডির ব্যবস্থা হচ্ছে, অন্তরেই জানছি। এবার নিঘঘাত তারা মেয়ে পাঠাবার কথা কইবে।
রাসু তেড়ে ওঠার ভান করে বলে, তোমার যেমন কথা! নিজে থেকে কেউ মেয়ে পাঠাবার কথা বলে?
বলে বৈকি। ক্ষেত্তর বিশেষে বলে। সতীনের ওপরে পড়া মেয়ের কথায় বলে।
বলি তার ঘরবসতের বয়েসটা হবে, তবে তো? তুমি যেন রাতদিন দড়ি দেখে ‘সাপ’ বলে আঁতকাচ্ছ।
বয়েস! সারদা তীব্র ঝঙ্কারে বলে ওঠে, মেয়েমানুষের বয়েস হতে আবার কদিন লাগে? দশ পেরোলেই বয়স। আর মেজকাকা মশাইয়ের কড়াকড়ির জারিজুরি তো ভেঙে গেল। নিজের মেয়েকেই যখন বয়েস না হতেই পাঠালেন!
গুরুজনের কাজের ব্যাখ্যান করো না। কারণ ছিল তাই এ কাজ করেছেন
সারদা দুর্বার, সারদা অদম্য।
সেও সমানে সমানে জবাব দেয়, তা তোমার দ্বিতীয় পক্ষকে শ্বশুরঘর করতে নিয়ে আসারও একটা কারণ আবিষ্কার হবে। তবে এই জেনে রাখো, নতুন বৌ যদি আসে, সেও এক দোর দিয়ে ঢুকবে, আমিও আর এক দোর দিয়ে দড়ি-কলসী নিয়ে বেরিয়ে যাব।
অস্ত্রটা মোক্ষম।
রাসু এবার কাবু হয়।
আপসের সুরে বলে, আচ্ছা অত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে দুঃখু ডেকে আনবার কি দরকার তোমার বলো তো? যাচ্ছি দাদাশ্বশুরের শ্রাদ্ধয়, খাব মাখব চলে আসব, ব্যস! আমি কি কাউকে আনতে যাচ্ছি?
তা সে। মনে রাখলেই হল।
সারদা সহসা রাসুর একটা হাত টেনে নিয়ে ঘুমন্ত ছেলের মাথায় ঠেকিয়ে দিয়ে বলে, তবে সত্যি করে যাও সেকথা!
আ ছি ছি! কি মতিবুদ্ধি তোমার! ছেলের মাথায় হাত দিয়ে
সারদা অকুতোভয়ে বলে, তাতে ভয়টা কি? আমায় বলো না খোকার মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করতে– জীবনে কক্ষনো পরপুরুষের দিকে চোখ তুলে চাইব না, একশ বার সে দিব্যি করব।
চমৎকার বুদ্ধি! সেটা আর এটা এক হল?
কেন হবে না? আমি ছাড়া জগতের আর সকল মেয়েমানুষকে পরস্ত্রী ভাবলে কোন কষ্ট নেই!
বাঃ, যাকে অগ্নিনারায়ণ সাক্ষী করে গ্রহণ করলাম-
ও! সারদা ঝট করে উঠে দাঁড়ায়। দরজার খিলটা খুলে ফেলে, কপাট ধরে দাঁড়িয়ে চাপা অথচ ভয়ঙ্কর একটা শব্দে বলে ওঠে, ও বটে! এতক্ষণে প্রকাশ পেল মনের কথা! তা এতক্ষণ না ভুগিয়ে সেটা বললেই হত! আচ্ছা–
রাসুও অবশ্য এবার ভয় পেয়েছে, সেও নেমে এসে বলে, আহা, তো কপাট খুলছ কেন? যাচ্ছ কোথায়?
যাচ্ছি সেইখানে, যেখানে খলকাপট্য নেই, আগুনের জ্বালা নেই। বলে ঝট করে বেরিয়ে পড়ে অন্ধকারে মিশিয়ে যায় সারদা।
নাঃ, আর কিছু করবার নেই!
নিরূপায় ক্ষোভে কিছুক্ষণ উঠেনের সেই গভীর রাত্রির নিকষ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে নিঃশব্দে কপাটটা ভেজিয়ে দিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ে রাসু।
ঘাম গড়াচ্ছে সর্বাঙ্গ দিয়ে।
গরমে নয়, আতঙ্কে।
কিন্তু করবার কি আছে এখন? ঘর থেকে বেরিয়ে তো আর বৌ খুঁজে বেড়াতে পারবে না রাসু, মা-খুড়ীর ঘুম ভাঙিয়ে দুসংবাদটা জানাতেও পারবে না!
নিজের হাতে যদি করণীয় কিছু থাকে তো সে হচ্ছে নিজের হাতটা মুঠো পাকিয়ে নিজের মাথায় কিল মারা।
২০. এলোকেশী দাওয়ায় পাটি পেতে
এলোকেশী দাওয়ায় পাটি পেতে বসে বৌয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছেন। দিচ্ছেন অনেকক্ষণ থেকেই। সেই দুপুরবেলা বসেছিলেন– এখন বেলা প্রায় গড়িয়ে এল।
এলোকেশী যেন পণ করেছেন আজ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকীর্তি দেখিয়ে ছাড়বেন। বৌকে সামনে রেখে তার পিছনে হাঁটু গেড়ে উঁচু হয়ে বসেছেন তিনি, মুখের ভাব কঠিন কঠোর।
ওদিকে টানের চোটে সত্যবতীর রগের শির ফুলে উঠেছে, চুলের গোড়াগুলো মাথার চামড়া থেকে উঠে আসতে চাইছে, ঘাড় অনেকক্ষণ আগে থেকেই টনটন করতে শুরু করেছে, এখন মেরুদণ্ডের মধ্যেও একটা অস্বস্তি শুরু হচ্ছে।
অথচ তার কেশকলাপ নিয়ে যে অপূর্ব শিল্প-রচনার চেষ্টা চলেছে, আশা হচ্ছে না সহজে তার সমাপ্তি ঘটবে।
কিন্তু কেবলমাত্র এলোকেশীর অক্ষমতাকেই দায়ী করলে অবিবেচনার কাজ হবে, দায়ী অপরপক্ষ। সত্যবতীর চুলগুলো যেন বেয়াড়া ঘোড়া, কোনমতেই তাকে বাগ মানিয়ে বশে আনা যাচ্ছে না।
ঝুলে খাটো আর আড়ে ভারী চাপ চাপ কোঁকড়া কোঁকড়া চুলগুলো খোলা থাকলে যতই সুন্দর দেখাক, তাকে বেণীর বন্ধনে বেঁধে কবরীর আকৃতি দিতে গেলেই মুশকিলের একশেষ। গোড়া বাধতে গেলে ফসফস করে এলিয়ে খুলে পড়ে, কোনরকমে যদিবা তিনগুছির ফেরে ফেলা যায়, পাঁচগুছি নগুছির দিকেও যাওয়া চলে না।
কিন্তু এলোকেশী আজ বদ্ধপরিকর, সাতগুছির বাঁধনে বেঁধে ‘কল্কা খোঁপা’ করে দেবেন, তাই বারতিনেক অসাফল্যের পর একগোছা মোটা মোটা কালো ঘুনসি দিয়ে চুলের গোরা নিয়ে টেনে ব্রহ্মতালুতে জড় করে এনে প্রাণপণ বিটকেলে বেঁধে ফেলেছেন, এবং সাতগুছির সাত ভাগকে করতে চেষ্টা করছেন।
দীর্ঘস্থায়ী এই চেষ্টায় সত্যবতীর অবস্থা উপরোক্ত। অনেকক্ষণ বাবু হয়ে বসে থাকার পর এবার হাঁটু দুটো মুড়ে বুকের কাছে জড়ো করে বসেছে সত্যবতী, কারণ পায়ে ঝিঝি ধরেছিল। মুখটা সত্যবতীর আকাশমুখো আর সেই মুখের ওপর পরনের নীলাম্বর শাড়িখানার আঁচলটুকু চাপা দেওয়া।
