কিন্তু সত্য তো দমবে না!
হাত ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সত্যর কোষ্ঠীতে লেখে নি। তাই ম্লান হলেও জোরালো স্বরে বলে, সে তো বুঝছিই বাবা, বাচালতা নির্লজ্জতা, কিন্তু উপায় কি? সমিস্যে যে প্রবল। এর পর যখন তোমাকে আমায় নিয়ে ভুগতে হবে, তখন যে মরেও শান্তি পাবে না। ওরা ছেলের আবার বিয়ে নাকি দেবে বলেছে! সেটা তো অপমান্যি! তুশ্চু একটা মেয়েসন্তানের জন্যে কেন তোমার উঁচু মাথাটা হেট হবে বাবা!
রামকালীর মনে হল প্রচণ্ড একটা ধমকে মেয়েটার বাচালতা ঠাণ্ডা করে দেন, কিন্তু পরক্ষণেই একটা বিপরীত ভাবের ধাক্কা এল! মেয়েটার মনের মধ্যে আছে কি? এতটুকু মেয়ে এত কথা ভাবেই বা কেন? আর এতখানি দুর্জয় সাহসই বা সংগ্রহ করল কোথা থেকে?
বাপের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আলোচনা ভূ-ভারতে আর কোনো মেয়ে করেছে কখনো? তাও রামকালীর মত রাশভারী বাপ! মা দীনতারিণী পর্যন্ত যার সঙ্গে সমীহ করে কথা বলেন! তা ছাড়া শ্বশুরবাড়ি শব্দটাই তো মেয়েদের কাছে সাপখোপ বাঘ ভাল্লুক ভূত চোর সব কিছুর চাইতেও ভয়ের। সে ভয়কে জয় করেছে সত্য কোন নির্ভয় মন্ত্রের জোরে?
ঠিক করলেন ধমকে ঠাণ্ডা করবেন না, শেষ অবধি ধৈর্য ধরে শুনবেন ওর কথা। দেখবেন ওর মনের গতির বৈচিত্র্য। রাগের বদলে একটা বিস্মিত কৌতূহল জাগছে।
শান্তগলায় বললেন, মেয়েসন্তান যে তুশ্চ এটা তো তুমি কখনো বলো না?
বলি না, অবস্থাই বলাচ্ছে বাবা। তুশ্চ না হলে আর তাকে সাত-তাড়াতাড়ি পরগোত্তর করে দিতে হয়? একটা সন্তান বলে কথা, তাও তো ঘরে রাখতে পার নি, তবে আর মিথ্যে মায়ায় জড়িয়ে কি হবে বাবা? সেই পরগোত্তরই যখন করে দিয়েছ, তখন আর কি? আজ না হয় কাল পাঠাতে তো হবেই, বলতে তো পারবে না দেবনা আমার মেয়ে, তবে?
পাঠাবার একটা সময় আছে, নিয়ম আছে, সে তুমি এখন বুঝবে না। ও নিয়ে মিছে মাথা খারাপ করো না। যাও ভেতরে যাও।
ভেতরে নয় যাচ্ছি, কিন্তু মনের ভেতরে তোলপাড় হচ্ছে বাবা। রঘুর মৃত্যু আজ আমার দৃষ্টি খুলে দিয়েছে। ভগবানের রাজ্যেই যখন সময় বাঁধা নেই, নিয়ম নেই, তখন মানুষের থাকবে কি? এই আজ আমাকে পরের ঘরে পাঠাতে বুক ফাটছে তোমার, এক্ষুনি যদি মৃত্যু এসে দাঁড়ায় দিতেই তো হবে তার হাতে তুলে? সহসা আঁচলের কোণ তুলে চোখটা মুছে নেয় সত্য, তার পর ভারী গলায় বলে, তখন তো বলতে পারবে না এখনও সময় আসে নি, নিয়ম নেই? ও শ্বশুরবাড়ি আর যমের বাড়ি দুই যখন সমতুল্যি, তখন আর মনে খেদ রেখো না। পাঠিয়ে দিয়ে মনে করো সত্য মরে গেছে।
আর বোধ করি শক্ত থাকতে পারে না সত্য, নিজের সেই কাল্পনিক মৃত্যুর শোকেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
স্তব্ধ রামকালী সেই ক্রন্দনবতীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। মেয়েটা কি শুধুই শেখা বুলি কপচে যায় না সত্যিই এমনি করে ভাবে?
খানিকক্ষণ পরে স্তব্ধতা ভেঙে বলেন, মন-কেমনের কথা আমি ভাবি না সত্য, তুমি বড়দের মত কথা বলতে শিখেছ তাই বলছি, তোমায় পাঠালে আমার মান থাকবে না।
সত্য গভীর দুঃখে হতাশ স্বরে বলে, বুঝি বাবা, বুঝি না কি? কিন্তু এ তো তবু শুধু ওদের কাছে মান থাকা মান যাওয়া! গলবস্তর হয়ে যেদিন ওদের ঘরে মেয়ে দিয়েছ, মান তো সেদিনই গেছে। কিন্তু ওরা যদি তোমার মেয়েকে ত্যাগ দেয়, তা হলে যে দেশসুদ্ধ লোকের কাছে হতমানি। দু’ দিক বিবেচনা করো বাবা।
রামকালীর গলা দিয়ে বুঝি আর শব্দ বেরোয় না, ভাষা স্তব্ধ হয়ে গেছে তার। মেয়েটা কি সত্যি বালিকা মাত্র নয়, ওর মধ্যে কি কোন শক্তির “ভর” হয়? বুদ্ধির শক্তি, বাক্যের শক্তি?
আচ্ছা তুমি যাও, আমি ভেবে দেখছি।
ভাবো। যা পারো আজ রাত্তিরের মধ্যে ভেবে নাও। ওই হতচ্ছাড়াটা তো রাত পোহাতেই বিদেয় হবে।
ছি মা, শ্বশুরবাড়ির লোকের সম্পর্কে কি এভাবে বলতে আছে?
নেই তো জানি বাবা, কিন্তু দেখে যে অপিরবিত্তি আসছে। কুটুমবাড়িতে পাঠাবার যুগ্যি একটা লোকও জোটে নি!
রামকালী ঈষৎ তরল কণ্ঠে বলে উঠেন, তুই তো আমার মুখ হেঁট হবার ভয়ে সারা, কিন্তু শ্বশুররা ত্যাগ না দিয়ে কি ছাড়বে তোকে? দুদিন ঘর করেই তো ফেরত দেবে। তোকে নিয়ে কে ঘর করবে সত্য? এত বাক্যি কে সইতে পারবে?
সত্য সগৌরবে মাথা তুলে বলে, সে তুমি নিশ্চিন্দি থেকো বাবা, সত্যকে দিয়ে তোমার মুখ কখনো হেট হবে না।
রামকালী গভীর স্নেহে মেয়ের পিঠে একটু হাত রাখেন।
মেয়েটা যে কি, তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। থেকে থেকে সে যে তীক্ষ্ণ একটা প্রশ্নের মত তার সামনে এসে দাঁড়ায়। যে কথাগুলো বলে, সব সময় সেগুলো মেয়ের শেখা কথা বলে উড়িয়ে দেওয়াও শক্ত। সে সব কথা চিন্তিত করে, বুঝিবা ভীতও করে। তবু রামকালী ওকে বুঝছেন, কিন্তু পৃথিবী কি ওকে বুঝবে?
ও কেন সাধারণ হল না?
পুণ্যির মত, বাড়ির আর পাঁচটা মেয়ের মত? রামকালী তাহলে ওর সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতেন। সুখী হতেন।
কিন্তু?
সত্যিই কি সুখী হতেন? সত্য সাধারণ হলে, বোকা হলে, ভোতা হলে? সত্যকে যে তার একটা দামী জিনিস বলে মনে হয়, সেটা কি হত তাহলে? (কবলমাত্র স্নেহের ওজন চাপিয়ে পাল্লাট। এত ভারী করে তুলতে পারতেন?
যাও মা ভেতরে যাও, আহ্নিক করব এবার।
যাচ্ছি– উঠে দাঁড়িয়েই রামকালীর অসাধারণ মেয়ে সহসাই একটা হাস্যকর সাধারণ কথা বলে বসে, ভেতর-দালান পর্যন্ত একটু এগিয়ে দেবে বাবা?
