এগিয়ে দেব? কেন রে?
রঘুর দিশ্যটা দেখে অবধি গা-টা কেমন ছমছম করছে বাবা। মেলাই অন্ধকার ওখানটায়।
হ্যাঁ হ্যাঁ চল, যাচ্ছি আমি। কেন যে তুমি গেলে সেখানে! ভাল করো নি। রামকালী কি একটু আশ্বস্ত হলেন? তাঁর নির্ভীক মেয়ের এই ভয়টুকু দেখে?
.
মেলাই অন্ধকারটা পার হয়ে এসে সত্য একবার থমকে দাঁড়াল, তার পর ঝপ করে বলে উঠল, ভাবতে ভুলে যেও না বাবা!
ভাবতে? কি ভাবতে? ও! অন্যমনস্কতা থেকে সচেতনতায় ফিরে আসেন রামকালী, ভেবেছি। পাঠিয়েই দেব তোমায়।
সহসা কান্নায় উথলে উঠল সত্য, আমার উপর রাগ করলে বাবা?
না, রাগ করি নি।
আবার আনবে তো? কান্না অদম্য হয়ে ওঠে।
ওরা যদি পাঠায়। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলেন রামকালী।
পাঠাবে না বৈকি, ইস্! মুহূর্তে কান্না থামিয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে সত্য, তুমি ওদের মান রাখছ, আর ওরা তোমার মান রাখবে না? পাছে কুটুম্বর সঙ্গে ‘অসরস’ হয়, আসা-যাওয়া বন্ধ হয়, এই ভয়ে বুক ফেটে যাচ্ছে তবু যেতে চাইছি আমি, বুঝবে না তারা সে কথা?
রামকালী আর একবার চমৎকৃত হলেন।
অতটুকু মগজে এত তলিয়ে ও ভাবে কি করে? তারপর হতাশ নিঃশ্বাস ফেললেন, বোঝবার কথা যদি সবাই বুঝত?
মেয়ের বিয়ে দেবার সময় জামাইয়ের রূপ দেখে নেওয়া যায়, কুল দেখে নেওয়া যায়, অবস্থা দেখে নেওয়া যায়, কিন্তু তার সংসারসুদ্ধ পরিজনের প্রকৃতি তো আর দেখে নেওয়া যায় না!
.
মেয়েকে রামকালী গৌরীদান করেছেন।
পাত্র খোঁজার সময় দীনতারিণী বলেছিলেন, তোমার মোটে একটা মেয়ে, পরের ঘরে কেন দেবে? একটি সোন্দর দেখে কুলীনের ছেলে নিয়ে এসে ঘরজামাই রাখো।
ভুবনেশ্বরীও স্পন্দিতচিত্তে শাশুড়ীর অন্তরালে বসে রায় শোনবার জন্যে হাঁ করে ছিল, কিন্তু রামকালী তাদের আশায় জল ঢাললেন। বললেন, ঘরজামাই? ছি ছি ছি!
কেন? দীনতারিণী বুকের ভয় চেপে জেদের সুরে বলেছিলেন, লোকে কি এমন করে না? লোকে তো কত কি করে মা!
তা বৌমার যে আর ছেলেপুলে হবে এ আশা দেখি না, কুষ্টিতেও নাকি আছে এক সন্তান। তালে তোমার বিষয়-আশয় তো জামাই-ই পাবে, ছোট থেকে গড়েপিটে তৈরি না করলে
রামকালী তীব্র প্রতিবাদে মাকে নির্বাক করে দিয়েছিলেন, রাসু থাকতে, তার ভাইয়েরা থাকতে জামাই বিষয় পাবে এ কথা তুমি মুখে আনলে কি করে মা? ছি ছি।
সত্য কেন বাপের ভাত খেতে যাবে? এমন পাত্রে দেব, যাতে জামাইকে শ্বশুরের বিষয়ে লোভ করতে না হয়।
তা সে কথা রামকালী রেখেছিলেন।
মেয়ের যা বিয়ে দিয়েছিলেন, শ্বশুরের সম্পত্তিতে লোভ করার দরকার তাদের নেই।
বিষয়–আশয় ঢের, সে-ও বাপের এক ছেলে।
শুনেছেন বাপ একটু কৃপণ, তা সে আর কি করা যাবে? সব নিখুঁত কি হয়?
তেমনি যে চাঁদের মত জামাই!
তা ছাড়া পরম কুলীন।
এর বেশী আর কি দেখা যায়?
কিন্তু লোভ কি মানুষ দরকার বুঝে করে? রামকালী কি স্বপ্নেও ভেবেছেন তাঁর পরম কুলীন বেহাই শ্যেনদৃষ্টি মেলে বসে আছেন তার বিষয়ের দিকে? এমন তীব্র লোভ যে রামকালীর অবর্তমান অবস্থাটাই তার একান্ত চিন্তনীয় বিষয়?
রামকালীর চাইতে বছর দশেকের বড় হয়েও, নিজে তিনি চিরবর্তমান থাকবেন এমনই আশা।
এসব জানেন না রামকালী।
শুধু জামাই পাঠচর্চা করছে এটা জেনেছেন, জেনে সন্তুষ্ট হয়েছেন।
ম্লেচ্ছ বিদ্যা বলে হেয় করবেন, এমন সংস্কারাচ্ছন্ন রামকালী নন। শিখুক, ভালই। ম্লেচ্ছদেরই তো রাজত্ব চলছে এখন।
১৯. লক্ষ্মীকান্ত বাড়ুয্যে মারা গেলেন
লক্ষ্মীকান্ত বাড়ুয্যে মারা গেলেন।
পুণ্যবান মানুষ, নিয়মের শরীর, ভুগলেন না ভোগালেন না, চলে গেলেন সজ্ঞানে। সকালেও যথারীতি স্নান করেছেন, ফুল তুলেছেন, পূজো করেছেন। পূজো করে উঠে বড় ছেলেকে ডেকে বললেন, তোমরা আজ একটু সকাল সকাল আহারাদি সেরে নাও, আমার শরীরটা ভাল বুঝছি না, মনে হচ্ছে ডাক এসেছে।
বড় ছেলে হতচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকে, বোধ করি ধারণাও করতে পারে না, লক্ষ্মীকান্তর শরীর খারাপের সঙ্গে তাদের আহারাদি সেরে নেওয়ার সম্পর্ক কোথায়? আর ‘ডাক’ কথাটারই বা অর্থ কি?
লক্ষ্মীকান্ত ছেলের ওই বিহ্বলতায় হাসলেন। হেসে বললেন, আহারাদি সেরে দুই ভাই আমার কাছে এসে বসবে, কিছু উপদেশ দিয়ে যাব। অবশ্য উপদেশ দেবার অধিকার আর কিছুই নয়, কতটুকুই বা জানি, জগৎকে কতটুকুই বা দেখেছি, তবু বয়সের অভিজ্ঞতা। বধূমাতাদের জানিয়ে দাও গে, রান্না কতকগুলি পদ বাড়িয়ে যেন বিলম্ব না করেন।
বাপ কেবল তাদের খাওয়ার কথাই বলছেন। কিন্তু তাঁর নিজের?
বড় ছেলে রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, আপনার অন্নপাক কখন হবে?
এই দেখ বোকা ছেলে, বিচলিত হচ্ছ কেন? আমার আজ পূর্ণিমা, অন্ন নেই। ফলাহার একটু করে নেব, নারায়ণের প্রসাদ। প্রসাদে চিত্তশুদ্ধি, দেহশুদ্ধি।
ছেলে গিয়ে ছোট ভাইয়ের কাছে ভেঙে পড়ল। তার পর অন্তঃপুরিকারা টের পেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত সংসারে শোকের ছায়া নেমে এল। কেউ অবিশ্বাস করল না, কেউ হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিল না, অমোঘ নিশ্চিত বলে ধ্বসে পড়ল।
বাড়ূয্যের সংসার থেকে এ সংবাদ সঙ্গে সঙ্গেই বাইরেও ছড়িয়ে পড়ল, কারণ আগুন কখনো এক জায়গায় আবদ্ধ থাকে না।
মুহূর্তে চারিদিকে প্রচার হয়ে গেল, বাড়ুয্যে যে চললেন!
যেন বাঁড়ুয্যে কোন বিদেশভ্রমণে যাচ্ছেন, নৌকো ভাড়া হয়ে গেছে, সঙ্গীরা প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোথাও।
