কর্তা আমার বকশিশটা?
নিকটে সরে এসে হাত কচলায় বিলে বুড়ো।
বকশিশ? রামকালী ভুরুর তীক্ষ্ণতায় কপালে রেখা এঁকে বলেন, বকশিশ কিসের?
আজ্ঞে কত্তা-!
বলছি বকশিশ কিসের? ছেলেটাকে বাঁচিয়েছ?
সে আজ্ঞে মৃত্যুর পর আর বাঁচাবে কে?
হ্যাঁ, আমি তা জানি। শুধু এটাই বুঝতে পারছি না, বকশিশ পাবার দাবিটা কখন হল তোমার?
বেশ, বকশিশ না দ্যান, মজুরিটা তো দেবেন আজ্ঞে! ওঝা এবার রুখে ওঠে।
সেটা দেবে যারা ডেকে এনেছে– শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলেন রামকালী, আমি তোমায় ডেকে আনি নি।
দশজনের মধ্যে কাকে ধরতে যাব কত্তা, বিন্দে বেজার মুখে বলে, না দ্যান তো চলে যাব। গরীব মানুষ
দাঁড়াও। রামকালী বেনিয়ানের পকেট থেকে নগদ দুটি টাকা বার করে ওর হাতে দিয়ে আরও গম্ভীর গলায় বলেন, শুধু তোমার মজুরি নয়, একটা সাপেরও দাম। দামী সাপটা গেল তোমার!
বুড়ো বিহ্বল দৃষ্টি মেলে অভিভূত কণ্ঠে বলে, আজ্ঞে কী বলছ কত্তা?
যা বলছি ঠিকই বুঝেছ। যাও
কত্তা!
কটা সাপ তোমার ঝাপিতে ছিল বুড়ো? নির্নিমেষ দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রামকালী আস্তে উচ্চারণ করেন কথাটা।
সে দৃষ্টির সামনে কেঁপে ওঠে লোকটা, কাঁদো কাদো গলায় বলে, কত্তা, তুমি অন্তরযামী
বিশ্বাস করছ সে-কথা? আচ্ছা যাও, ভয় নেই।
টাকা অভয় দুটো জিনিস পেয়ে গেছে লোকটা, অতএব আর দাঁড়ায় না। কি জানি ‘অগ্নিমুখ দেবতা’ এক্ষুনি যদি মত পাল্টায়!
রামকালী অদ্ভুত একটা ক্ষোভের দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকেন। এদের তো নিজেদের অজ্ঞতার শেষ নেই, বুদ্ধিহীনতার চরম প্রতীক, তবু অপরের অজ্ঞতা আর মূঢ়তাকে উপজীবিকা করে চালিয়েও চলেছে দিব্যি!
সাপটা সম্বন্ধে সন্দেহ হয়েছিল, কিন্তু ধারণা করেন নি লোকটা এত সহজে স্বীকার পাবে, এক কথায় এমন গুটিয়ে কেঁচো হয়ে যাবে!
মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে একটা বিষণ্ণ বেদনায়। দেহের রোগ সারাবার ভার চিকিৎসকের হাতে, কিন্তু মনের রোগ কে সারাবে? কুসংস্কার, অজ্ঞতা, বোকামি–অথচ তার সঙ্গে সোল আনা কুটিল বুদ্ধি। আশ্চর্য!
.
অন্ধকার হয়ে গেছে। আহ্নিকের সময় উত্তীর্ণ প্রায়, তবু সেই দাওয়ার ধারেই জলচৌকিটার ওপর বসে আছেন রামকালী। খড়মটা পায়ে পরা নেই, পা দুটো আলগা তার ওপর চাপানো। অন্ধকারে খড়মের রূপোর ‘বৌল’ দুটো ঈষৎ চকচক করছে।
বাবা!
চমকে উঠলেন এই অপ্রত্যাশিত ডাকে।
সত্য! তুমি এখানে? ও, আহ্নিকের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে তাই বলতে এসেছ? যাও মা, তুমি ভেতরে যাও।
আমি সে কথা বলতে আসি নি বাবা!
সে কথা বলতে আস নি! তা হলে?
বলছিলাম প্রায় মরীয়ার মতন বলে ফেলে সত্য, বারুইপুরের লোককে, হ্যাঁ করেই দাও না বাবা।
বারুইপুরের!
রামকালী অবাক হয়ে বলেন, হ্যাঁ করে দেব? কি হ্যাঁ করে দেব?
তুমি তো বুঝতেই পারছ বাবা–সত্য কাতর সুরে বলে, আমি আর নিলুজ্জর মত মুখ ফুটে কি বলব!
রামকালী মেয়ের মুখটা দেখতে পান না অন্ধকারে, কিন্তু স্বরটা ধরতে পারেন, তবু বুঝতে সত্যিই পারেন না, সত্য কি বলতে চায়? বারুইপুরের লোকটার চলে যাওয়ার ব্যাপারে হ্যাঁ করতে বলতে চাইছে নাকি? রামকালী তো সে রায় দিয়েছেন। তবে? বাড়ির মেয়েরা বোধ হয় এখনো জেব টানছেন!
সান্ত্বনার গলায় বলেন, ভয় পেও না, শ্বশুরবাড়ি তোমায় যেতে হবে না এখন।
সত্য বোঝে বাবা তার আবেদন ধরতে পারেননি, আর পারার কথাও নয়। সত্যর মতন কোন মেয়েটা আর নিজের গলা নিজে কাটতে চায়? কিন্তু সত্য যে সাতপাঁচ ভেবে তাই চাইছে। হাড়িকাঠের নিচে গলাটা বাড়িয়েই দিচ্ছে। পিসঠাকুমার দল সশব্দে ঘোষণা করেছেন, অহঙ্কারে ধরাকে সরা দেখে রামকালী মেয়ের আখের ঘোচালেন! কুটুমরা রক্তমাংসের মানুষ বৈ তো কাঠ পাথরের নয় যে এত অপমান সহ্য করে বসে থাকবে! ছেলের আবার বিয়ে দেবেই নির্ঘাত, আর রামকালী চিরকাল মেয়ে গলায় করে বসে থাকবেন! গলায় পড়া মেয়ে মানেই হাতেপায়ে বেড়ি!
সত্য ভেবে ঠিক করেছে, বাপ-মায়ের হাতে-পায়ে বেড়ি হয়ে থাকাটা কোন কাজের কথা নয়। তার চাইতে বাপের সুমতি করানোই ভাল।
কিন্তু বাবা তার বক্তব্যই ধরতে পারছেন না।
অতএব আর লজ্জার আবরণ রাখা চলল না। সত্য সকালবেলার চিরেতার জল খাওয়ার মতই চোখ-কান বুজে বলে ফেলল, সে ভয়কে আমি মনে ধরাচ্ছি না বাবা, বরং উল্টো কথাই বলছি। ও তুমি পাঠাবার মন করেই দাও, আমার কপালে মরণ-বাচন যা আছে হবে।
রামকালী স্তম্ভিত হলেন।
এযাবৎ মেয়ের বহু দুঃসাহসের পরিচয় তিনি পেয়েছেন, সে দুঃসাহস পরিপাকও করেছেন। কারণ তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করেছেন, কিন্তু এটা কি? নিজে সেধে শ্বশুরবাড়ি যেতে চাইছে সে?
বয়স্থা মেয়ে নয় যে এ চাওয়ার অন্য অর্থ করবেন, তবে?
কণ্ঠস্বর গম্ভীর হল, হয়তো বা একটু রূঢ়ও, তুমি ইচ্ছে করে শ্বশুরবাড়ি যেতে চাইছ?
যেতে চাইছি কি আর সাধে! বাবার কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তার আভাস সত্যর চোখে প্রায় জল এনে ফেলেছে, চাইছি অনেক ভেবেচিন্তে। কুটুমকে চটিয়ে শুধু গেরো ডেকে আনা বৈ তো নয়!
রামকালী বুঝলেন, বাড়িতে এই ধরনের কথার চাষ চলেছে। অবোধ শিশু শিখবেই তো। কিন্তু তাই বলে এতই কি অবোধ যে, বাপের সামনে কোন্ কথা বলতে হয় তা বোঝে না?
কঠিন স্বরে বললেন, আমার গেরোর কথা আমিই বুঝব সত্য, তুমি ছেলেমানুষ, এ নিয়ে ভাববার বা এসব কথায় থাকবার দরকার নেই। এটা বাচালতা।
