আচ্ছা বাড়ি যাও।
যাচ্ছি।…বাবা—
কি হল? কিছু বলবে?
বলছি—
কি? কি বলতে চাও বলো?
বলছি কোথা থেকে যেন একটা লোক এসেছে না পত্তর নিয়ে?
রামকালী মেয়ের মুখে এ প্রসঙ্গে শুনে অবাক হন। তার পর ভাবেন, মেয়েটা তো চিরকেলে বেপরোয়া। শ্বশুরবাড়ি যাবার ভয়ে বাপের কাছে আর্জি করতে এসেছে। তাই সস্নেহে বলেন, হ্যাঁ,এসেছে তো। তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে। তার কি?
বলছিলাম কি– সত্যবতীর কথা বলার আগে চিন্তা আশ্চর্য বটে!
রামকালী মনে মনে হাসেন, শ্বশুরবাড়ি শব্দটাই মেয়েদের এমন!
বলো কি বলছ?
আচ্ছা এখন থাক। তুমি ঘুরে এসো। গুছিয়ে বলবার কথা। রঘুটার মিতদেহ দেখে অবধি মনটা বড় ডুকরোচ্ছে। বাড়ি ফিরে একটু জিরোই।
আচ্ছা। বলে চলে যান রামকালী।
এই অবোধ মেয়ে–একে এক্ষুনি শ্বশুরবাড়ি পাঠানো চলে? অসম্ভব!
.
পাওয়া গেছে পাওয়া গেছে!
বহু কণ্ঠের একটা উন্মত্ত উল্লাসধ্বনি ভেসে আসে কবরেজবাড়ির দিকে, কবরেজ মশাই, পাওয়া গেছে!
কী পেল ওরা? কিসের এত উল্লাস? কোন পরম প্রাপ্তিতে মানুষ এমন উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে? চণ্ডীমণ্ডপের দাওয়া থেকে নেমে এলেন রামকালী। তবে কি হতভাগ্য রঘুর প্রাণটাই ফিনে পাওয়া গেল তুষ্টুর পূর্বজন্মের পুণ্যে? কলিযুগেও ভগবান কানে শুনতে পান?
রঘু কি শুধু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল?
মৃত্যুর কাছাকাছি অচৈতন্যতার যে গভীর স্তর, সেখানে ডুবেছিল? জটার বৌয়ের মত? রামকালীর নির্ণয় ভুল? তাই হোক, তাই হোক। হে ঈশ্বর, একেবারের জন্য অন্তত তুমি রামকালীর গর্ব খর্ব করো, একবারের মত প্রমাণ করো রামকালীর নির্ণয় ভুল!
.
নাঃ, কলিযুগে ভগবান হাবা কালা ঠুঁটো। রামকালীর গর্ব খর্ব করবারও গরজ নেই তার। রঘুর প্রাণটা ওরা ফিরে পায় নি, পেয়েছে তার প্রাণঘাতককে! ওঝার মন্ত্রচালনার গুণে সাপটা এসে লুটিয়ে পড়েছে মুখে ফেনা ভেঙে। আশ্চর্য! এ এক পরম আশ্চর্য!
সাপটাকে নাকি নিতে চেয়েছিল ওঝা, কাকুতি-মিনতি করে বলেছিল, এমন জাতপাত দৈবাৎ মেলে! কিন্তু জনতার আক্রোশ থেকে রক্ষা করতে পারে নি তার জাতসাপকে। লাঠি দিয়ে আর বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে তার গোল চকচকে দেহটাকে ছেচে কুটে চ্যাপটা করে দিয়েছে সবাই।
অপরাধ নিও না মা জগদগৌরী! বলেছে আর পিটিয়েছে।
এখন লম্বা একটা বাঁশের আগায় সেই মরা সাপটাকে ঝুলিয়ে নিয়ে ওরা এসেছে রামকালীর জয়গান করতে। ওঝা বুড়োও তার নিকষ-কালো গুলি পাকানো বেঁটে শরীরটাকে নিয়ে আসছে ছুটে ছুটে বকশিশের আশায়। মোটা বকশিশ কি আর না দেবেন রামকালী? ওঝার সাফল্য যে রামকালীরও সাফল্য!
উল্লাস-চীৎকার-রত এই লোকগুলো যেন একটা অখণ্ড বর্বরতার প্রতীক। ঘৃণায় ধিক্কারে মনটা বিষিয়ে গেল রামকালীর, হাত তুলে ওদের থামতে নির্দেশ দিয়ে ভ্রুকুটি করে বললেন, কী হয়েছে কী? এত স্ফূর্তি কিসের তোমাদের? রঘু বেঁচে উঠেছে?
বেঁচে উঠবে! একজন মহোৎসাহে বলে ওঠে, ভগবানের সাধ্যি কি ওকে বাঁচায়! একেবারে কালনাগিনীর বিষ! কিন্তু ধন্যি বলি কবরেজ মশাই আপনার শিক্ষা! কামড়ায় নি, শুধু
থামো! ধমকে ওঠেন রামকালী, তা ওই নিয়ে এত হৈ-চৈ করছ কি জন্যে? একটা বালক এখনো মরে পড়ে রয়েছে!
সহসা একটা প্রবল আবেগে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে রামকালী চাটুয্যের, যেমনটা তার বড় হয়। রঘুর এই শোচনীয় মৃত্যুটা বড় লেগেছে রামকালীর। বার বার মনে হচ্ছে, হয়তো সময় থাকতে রামকালীর হাতে পড়লে বেঁচে যেত ছেলেটা।
ভাবতে চেষ্টা করছেন, নিয়তি অমোঘ আয়ু নির্দিষ্ট, এ চিন্তা মূঢ়তা, তবু সে চিন্তাকে রোধ করতে পারছেন না। বিষ-নিবারক ওষুধগুলো তাদের নাম আর চেহারা নিয়ে অনবরত মনে ধাক্কা দিচ্ছে।
আজ্ঞে কর্তা, মা বিষহরি নিলে কে কি করতে পারে? তবে কীর্তি একটা দেখালেন বটে! বলে ওঠে ওঝা বুড়ো, তবে আমাকেও মুখে রক্ত তুলে খাটতে হয়েছে কত্তা! বেটী কি আসতে চায়? একেবারে মোক্ষম মন্তর ঝেড়ে তবে–।
বেশ, শুনে সুখী হলাম। যাও, তোমরা এখন ওটার একটা সঙ্গতি করো গে। সাপ মারলে তাকে শাস্ত্রীয় আচারে দাহ করা নিয়ম, সেই কথাই উল্লেখ করে কথাটা বলেন, তার পর ঈষৎ গাঢ়স্বরে বলেন, আর সেই হতভাগাটারও একটা গতির ব্যবস্থা করোগে। তুষ্টুর একার ঘাড়ে সব দায়টা চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থেকো না।
জনতার উল্লাসটা একটু ব্যাহত হয়। এটা কী হল! এমনটা তো তারা আশা করে আসে নি। ভেবেছিল, সাপটা আবিষ্কৃত হয়েছে দেখে নিঃসন্দেহে উফুল্ল হবেন রামকালী, কারণ এটা তার জয়পতাকা বলা চলে। অনেকের মধ্যেই তো একটা অবিশ্বাস উঁকি দিয়েছিল, কবরেজ মশাইয়ের প্রতি অপরিসীম বিশ্বাস সত্ত্বেও।
একেবারে একটা অসম্ভব কথাই যে বলেছিলেন রামকালী। অসম্ভবও যে সম্ভব হয়, এ কথা প্রমাণ করত কে এই সাপটা ছাড়া? অথচ রামকালী যেন নির্বিকার।
ক্ষুব্ধ হল, আহত হল ওরা।
সে ব্যবস্থা কি আর না হচ্ছে কবরেজ মশাই, ওরা বলে, এতক্ষণে বাঁশ কাটা হয়ে গেল বোধ হয়। তবে কথা হচ্ছে সাপের মড়া, ওকে তো ভাসাতে হবে!
না। ভারী গলায় বলেন রামকালী, সাপে কাটে নি। যথারীতি দাহর ব্যবস্থাই করো গে। কতগুলো হৈ-চৈ করো না।
বাঁশ ঘাড়ে করে চলে গেল ওরা, তার পিছনে গ্রাম-বেঁটানো ছেলেমেয়ে ইতরভদ্র। ওদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হল রামকালীর, এরা আমাদের আত্মীয়। এই আমাদের প্রতিবেশী! বুনো জঙ্গলে কোন সাঁওতালদের থেকে এমন কি উন্নত এরা? বর্বরতার সুযোগ পেলেই তো মেতে উঠতে চায় সেই বন্য বর্বরতায়! মৃত্যুকে যে একটু শ্রদ্ধা করতে হয়, শ্রদ্ধার লক্ষণ যে নীরবতা, এ বোধের কণামাত্র ও তো নেই এদের মধ্যে।
