না, বার্তাটা বলতে রাজী নন সেজকর্তা।
তবে জরুরী দরকার।
বাড়ি যেতে হবে রামকালীকে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন আর করলেন না রামকালী, ধীরে ধীরে সরে এলেন বুড়ো বটতলা থেকে। অকর্মা একদল লোক তখন বিন্দেকে ঘিরে উন্মত্ত হট্টগোল করছে।
ভাবলেন মৃত্যুর কারণ না বললেই হত। মৃত্যু মৃত্যুই। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারলেই কি তুই নাতিকে ফিরে পাবে? নাকি আততায়ীকে শেষ করে ফেললেই পাবে?
তা পায় না।
তবু মৃত্যুর পর মৃত্যুর কারণ নিয়ে মাথা ঘামায় লোকে। আর খুন হলে নিহত ব্যক্তির হত্যাকারীর ফাঁসি ঘটাবার জন্যে মরণ-বাচন পণ করে লড়ে।
.
আকাশ আর পাতাল, পাহাড় আর সমুদ্র।
কোন পরিবেশ থেকে কোন পরিবেশ।
কিন্তু ঘটনা যাই হোক, রামকালীর অন্তঃপুরেও প্রায় শোকেরই দৃশ্য। দীনতারিণী চোখ মুছছেন, চোখ মুছছেন কাশীশ্বরী, ভুবনেশ্বরী মূৰ্ছাতুরার মত পড়ে আছে একপাশে, মোক্ষদা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং সেজখুড়ী, কুঞ্জর বৌ, আশ্রিতা অনুগতা প্রভৃতি অন্যান্য নারীকুল নিম্নস্বরে রামকালীর জেদ তেজ ও অদূরদর্শিতার নিন্দাবাদ করছেন।
শুধু সারদা সেখানে নেই, সে তদব্যস্তে কুটুমবাড়ির লোকের আহার-আয়োজনে ব্যাপৃত আছে।
তুষ্টু গয়লার নাতির ব্যাপার নিয়ে সারা গ্রাম আজ তোলপাড়, তবে বাইরের কোনো হুজুগে এ বাড়ির অন্তঃপুরিকাঁদের উঁকি দেবার অধিকার নেই, বাদে মোক্ষদা।
মোক্ষদা একবার দেখে এসে স্নান করেছেন, আর যাবেন না। গিয়ে করবেনই বা কি?
সত্যর শ্বশুরের প্রেরিত চিঠি কুঞ্জবিহারী পড়ে দিয়েছেন, আর তার পর থেকেই বাড়িতে এই শোকের ঝড় বইছে।
জামাইয়ের মা-বাপ যদি ছেলের আবার বিয়ে দেয়, মেয়ের মৃত্যুর চাইতে সেটা আর কম কি! পরের মেয়ে-বৌকে উদারতার উপদেশ দেওয়া যায়, তার মধ্যে সতীনের হিংসের পরিচয় পেলে নিন্দে করা যায়, কিন্তু ঘরের মেয়ের কথা আলাদা।
সারাদিনের ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ আর তুষ্ট্রর নাতির ওই শোচনীয় পরিণামে ক্লিষ্ট মন নিয়ে বাড়ি ঢুকেই ঘটনাটা শুনলেন রামকালী।
তীক্ষ্ণ তীব্র দুই চোখের মণিতে জ্বলে উঠল দু-ডেলা আগুন। মনে হল ফেটে পড়বেন এখুনি, ধৈর্যচ্যুত হয়ে চিৎকার করে উঠবেন, কিন্তু তা তিনি করলেন না, শুধু ভয়াবহ ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন, কে এসেছে চিঠি নিয়ে?
এ সময় মোক্ষদা ভিন্ন আর কার সাধ্য আছে সামনে এগিয়ে যাবার? তিনিই গেলেন। বললেন, এনেছে ওদের ওখানে এক আচায্যিদের ছেলে। গোপেন আচায্যি না কি বলল।
কোথায় সে? চণ্ডীমণ্ডপে?
.
না, খেতে বসেছে।
ঠিক আছে খাওয়া হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে পাঠিয়ে দিও। চণ্ডীমণ্ডপে আছি আমি।
মোক্ষদা প্রমাদ গুনে বলেন, তা তুমিও তো আজ সারাদিন নাওয়া-খাওয়া কর নি!
যাক বেলা পড়ে এসেছে, একেবারে সন্ধ্যাহ্নিক সেরে যা হয় হবে।
লোকটা একটু রগচটা আছে, একটু বুঝেসুঝে কথা কয়য়া তার সঙ্গে।
রামকালী ভুরু কুঁচকে বললেন, লোকটা একটু কি আছে?
বলছিলাম রগচটা আছে।
মোক্ষদাকে অবাক করে দিয়ে সহসা হেসে ওঠেন রামকালী, তাতে কি? আমি তো আর রগচটা নই!
.
তা বলেছিলেন রামকালী ঠিকই।
রগ মাথা সবই তিনি খুব ঠাণ্ডা রেখেছিলেন; বুঝিবা অতি মাত্রাতেই রেখেছিলেন; গোপেন আচায্যিকে ডেকে বেয়াইবাড়ির কুশলবার্তা নিয়ে হাস্যবদনে বলেছিলেন, শুনলাম নাকি বেয়াই মশাইয়ের ছেলের বিয়ে! বলো শুনে খুব আনন্দিত হয়েছি। নেমন্তন্ন পেলে উচিতমত লৌকিকতা পাঠিয়ে দেব।
গেজেল গোপেন আচায্যি কটুকাটব্য দূরের কথা, কথা কইতেই ভুলে গেল, হাঁ করে চেয়ে রইল।
খাওয়া-দাওয়া হয়েছে তোমার?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আজ রাতে তো আর ফিরছ না?
আজ্ঞে না।
বেশ। সকালে জলটল খেয়ে যাত্রা করো।
আজ্ঞে মেয়ে তা হলে পাঠাবেন না?
মেয়ে? কার মেয়ে? কোথায় পাঠাবার কথা বলছ হে?
গোপেন এবার সাহসে ভর করে বলে ওঠে, আজ্ঞে, আজ্ঞে আপনার মেয়ের কথা ছাড়া আপনাকে আর কার কথা বলতে আসব? মেয়ে তাহলে পাঠাবেন না?
আরে বাপু, কোথায় পাঠাব তাই বলো? ভদ্রলোকের মেয়ে ভদ্রলোকের ঘরেই যেতে পারে, যেখানে সেখানে তো যেতে পারে না?
গোপেনের শীর্ণ মুখটা বিকৃত হয়ে ওঠে, বেশ, তবে পত্রে তাই লিখে দিন।
আবার পত্র লিখতে হবে? এই তুচ্ছ কথাটুকু তুমি বলতে পারবে না?
আজ্ঞে না। আমি গেঁজেল-নেশেল মানুষ, আমার কথায় বিশ্বাস করে না করে! এসেছি যখন পাকা দলিলই নিয়ে যাবো/
হুঁ। বলে মিনিটখানেক ভুরু কুঁচকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন রামকালী, তার পর বলেন, আচ্ছা তাই হবে। পত্র লিখে রাখব, কাল সকালে রওনা দেবার আগে নিও।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তবু ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়লেন রামকালী।
না, সন্ধ্যাহ্নিকের পূর্বে হাতমুখ ধুতে ঘাটে গেলেন না, গেলেন বুড়ো বটগাছতলার দিকে। কি করল ওরা দেখা যাক। এতক্ষণ পরে আবার রঘুর চেহারাটা চোখে ভেসে উঠল।
উঃ, নিয়তি কী অকরুণ।
.
বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে থমকে দাঁড়ালেন রামকালী।
চলচলিয়ে চোটপায়ে আসছে কে অন্ধকারে? সত্যবতী না?
তুই এখানে একলা যে?
একলা নয় বাবা, নেড়ু এসেছিল, তা ও এখন ফিরল না।
এসেছিলি কেন?
কেন, সেকথা আর শুধোচ্ছ কেন বাবা? সত্য বিষণ্ণ হতাশ কণ্ঠে বলে, রঘুটাকে একবার শেষ দেখা দেখতে।
এভাবে এসে ভাল কর নি। সেজঠাকুমার সঙ্গে এলে পারতে।
সেজঠাকুমার তো আটবার ডুব দেওয়া হয়ে গেছে, আর আসত?
