একটা সমস্বরে চিৎকার উঠল, কোথায় কোথায় কেটেছে?
কাটে নি কোথাও, সে তো ওর সঙ্গীরাই বলছে। রামকালী নিঃশ্বাস ফেলেন, খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহে বিষ প্রবেশ করেছে। একটু আগে যদি হাতে পেতাম, চেষ্টা দেখতাম, এখন আর কিছু করবার নেই।
কবরেজ মশাই! হাহাকার করে পায়ে আছড়ে পড়ল তুষ্টু, জগতের সবাইকে জীবন দিচ্ছেন কবরেজ-ঠাকুর, আর আমার নাতিটাকে কিছু করবার নেই বলে ত্যাগ দিচ্ছেন!
রামকালী ডান হাতটা তুলে একবার আপন কপাল স্পর্শ করে বলেন, আমার ভাগ্য।
আপনার পায়ে ধরি ঠাকুরমশাই, ওষুধ একটু দ্যান।
এবার আছড়ে এসে পড়েছে বুড়ী। তুষ্টুর বৌ।
রামকালী কোন উত্তর দেন না, লক্ষ্যহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন জনতার দিকে।
.
কিন্তু সাপের বিষ মানে কি?
আহারের সঙ্গে সাপের বিষ আসবে কোথা থেকে?
সহসা এ কি আকাশ থেকে পড়া বিপর্যয়ের কথা বলছেন কবরেজ মশাই!
তুষ্টুর মত নির্বিরোধী নিরীহ মানুষটার এত বড় মহাশত্রু কে আছে যে, তার বংশে বাতি দেবার সলতেটুকু উৎপাটিত করবে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করবে!
গুঞ্জন উঠছে জনতা থেকে।
কবরেজ মশাই, সাপের বিষের কথা বলছেন? এত বড় শত্রু কে আছে তুষ্টুর?
কেন, ভগবান! তীক্ষ্ণ একটা ব্যঙ্গ-তিক্ত হাসির সঙ্গে কথাটা শেষ করেন রামকালী, ভগবানের বাড়া পরম শত্রু আর মানুষের কে আছে তুষ্ট?
কিন্তু এত সংক্ষিপ্ত ভাষণ বোঝে কে?
বিশদ না শুনতে পেলে ছাড়বেই বা কেন তোক? শুধু সাপের বিষ ফতোয়া জারি করে নিষ্ঠুরের মত নীরব হয়ে থাকলে প্রশ্ন-বিষের দাহে যে ছটফট করবে লোক!
বলতেই হবে রামকালীকে, সাপে কাটল না, তবু তার বিষ এল কোথা থেকে?
কিন্তু উত্তর দিয়ে যে রামকালী বাকশক্তিরহিত করে দিলেন সবাইকে! এ কী তাজ্জব কথা!
আখের ক্ষেতে সাপের গর্ত ছিল, থাকেই এমন।
ঠিক যে আখ গাছটার গোড়ায় সে বিষের থলি, সেই আখটাই তুলে খেয়েছে হতভাগ্য ছেলেটা।
এ কি বলছেন কবিরাজ মশাই!
যা সত্য তাই বলছি। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন রামকালী, গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, নিয়তির উপর হাত নেই, আয়ু কেউ দিতে পারে না। তবু তক্ষুনি টের পেলে বিষ তোলার চেষ্টাটা অন্তত করতাম। কিন্তু তা হবার নয়, অদৃশ্য নিয়তি অমোঘ নিষ্ঠুর।
অমোঘ নিয়তি!
তবু উৎসাহী কোন এক ব্যক্তি সাপের বিষ শোনা মাত্রই হাড়িপাড়ায় ছুটে গিয়ে ডেকে এনেছে বিন্দে ওঝাকে।
বিন্দে এসেও ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।
অর্থাৎ সেই এক কথা–আর কিছু করবার নেই!
কিন্তু মরাকে বাচাতে না পারুক, জ্যান্তটাকে তো মারতে পারে বিন্দে। সেই মূল যমটাকে মন্ত্রের জোরে শেষ করে দিক সে। জনমত প্রবল হয়ে ওঠে।
হয়তো এই তীব্র বাসনার মধ্যে অন্য একটা প্রচ্ছন্ন বাসনাও সুপ্ত হয়ে রয়েছে। সন্দে নেই রামকালী কবিরাজ দেবতা, তার বিচার নির্ভুল, কিন্তু এ হেন কৌতূহলোদ্দীপক কথাটার একটা ফয়সালা হওয়া তো দরকার।
বিন্দেকে ঝুলোঝুলি করতে থাকে সবাই।
রামকালী সামান্য বিষণ্ণ হাসি হেসে বলেন, যাচাই করতে চাও?
হায় হায়, আজ্ঞে এ কী কথা! কী বলছেন ঠাকুরমশাই!
যা বলছি তাতে ভুল নেই বাবা সকল। যা হোক, একটা কথা কেউ বললেই সেটা বিশ্বাস করে নিতে হবে, তার কোন হেতু নেই। কিন্তু হতভাগার দেহটার যথাযথ একটা ব্যবস্থা আগে না করে—
বিন্দে মাথা নেড়ে বলে, আজ্ঞে বিষহরির পো যখন কাটেন নি, তখন ওতে আমার কিছু করার নেই। ও আপনার সহজ মিত্যুর হিসেবেই যা করবার করতে হবে।
কিন্তু দেখছ তো বিষে একেবারে নীল হয়ে গেছে!
তা অবিশ্যি দেখছি আজ্ঞে। একেবারে কালকেউটে দংশনের চেহারা। তবু যা কানুন!
বাবা সকল, তোমরা তবে আর বৃথা ভিড় না করে কাজে লাগো। শিথিল স্বরে বলেন রামকালী। রঘুর দিকে আর যেন তাকাতে পারছেন না তিনি। কিন্তু কে এখন কাজে লাগতে যাবে?
এত বড় একটা উত্তেজনা তাদের অধীর করে তুলেছে। সকলে বিন্দেকে ঘিরে ধরে চেঁচাচ্ছে, কড়ি চাল তুই, কড়ি চা! হারামজাদা বেটা সুড়সুড় করে এসে তোর ঝাপিতে ঢুকুক। তারপর তুই আছিস আর তোর বিষপাথর আছে। আছড়ে মেরে ফেল।
তোমরা এত ছেলেমানুষি করছ কেন? সাপটাকে ঠিক পাওয়াই যাবে তার নিশ্চয়তা কি?
পাওয়া যাবে না মানে? আপনি যখন বলছেন–
বিষ তো ঠিক, কিন্তু আখের ক্ষেতটা আমার অনুমান মাত্র, তার আগে জলটল কিছুই যখন খায় নি বলছে–তাই। কিন্তু এখন বিন্দের কীর্তি নিয়ে পড়লে তোমরা তো।
কিন্তু যে যতই ভয়-ভঙ্কিত করুক রামকালীকে, আজকের উত্তেজনা তাকে ছাপিয়ে উঠেছে। যদি আখের গাছের গোড়ায় সাপের বাসা থাকে, সেই খেয়ে জলজ্যান্ত একটা ‘সাদস্যি’ গোয়ালার ছেলে এক দণ্ডে মরে যাবে? তা যদি হয়, সেটা চোখের সামনে যাচাই হোক!
সাপের গর্ত আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত কেউ নড়বে না।
অতএব সমস্ত দৃশ্য যথাযথ রয়ে গেল, রঘুর ব্যবস্থায় কেউ গাও দিল না, বিন্দে ওঝা মহাকলরবে সাপ চেলে আনার মন্ত্র আওড়াতে শুরু করে দিল।
রামকালী চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন, হয়তো বা শেষ অবধি দাঁড়িয়েই থাকতেন, হয়তো বা একসময় চলেই যেতেন, কিন্তু সহসা সেজখুড়ো এসে হাজির হয়ে চাপা গলায় ডাক দিলেন, রামকালী!
খানিক আগে গ্রামের আরও অনেক কাজের লোকের মত সেজকর্তাও একবার এখানে এসে ঘুরেফিরে নানা মন্তব্য করে চলে গেছেন। আবার ফিরে এলেন কোন বার্তা নিয়ে?
