একরাশ লোক চারিদিকে ভিড় করে হা-হুতাশ করছে, আর কে কবে কোথায় ঠিক এই রকম অথবা এই ধরনের ব্যাপার দেখেছে তারই আলোচনায় বাতাস মুখর করে তুলেছে।
আশ্বিনের রোদে সর্দি-গর্মি হবার কথা নয়, কিন্তু সময়টা বড্ড কড়া। একেবারে ভরদুপুর বেলা। আর ভিজে পান্ত কটা পেটে ঢেলেই মাঠে-জঙ্গলে ঘোরা। মায়েরা তো এটে উঠতে পারে না ছেলেগুলোকে।
ছেলেটা তুষ্টু গয়লার নাতি রঘু। সমবয়সের দাবিতে নেড়ু কোম্পানির দলের একজন। আশ্বিনে আখের ক্ষেত রসে ভরভর, ছেলেগুলোর তাই দ্বিপ্রহরিক খেলা আখ চুরি। উপকরণের মধ্যে একটুকরো ধারালো লোহার পাত। তার পর ক্ষেত থেকে আনার পর তো দাঁতই আছে।
দাঁত দিয়ে ভোলা ছাড়িয়ে মাথাপ্রমাণ লম্বা লাঠিগুলো চিবিয়ে চিবিয়ে রসগ্রহণ করেছে সকলেই, হঠাৎ রঘুর যে কি হল! বুড়ো বটগাছটার তলায় যেখানে বসেছিল সবাই, সেখানেই ধুলো-জঞ্জালের ওপর শুয়ে পড়ল রঘু, যেন নেশাচ্ছন্নের মত।
ছেলেরা প্রথমটা খেয়াল করে নি, আগামী কাল আবার কখন অভিযান চালানো হবে সেই আলোচনাতেই তৎপর হয়ে উঠেছিল, চোখ পড়ল উঠে পড়বার সময়।
কী রে রঘু, তুই যে দিব্যি ঘুম মারছিস? বলল একজন হি-হি হাসির সঙ্গে ঠেলা মেরে। কিন্তু পরক্ষণেই হাসিমুখটা কেমন শুকিয়ে উঠল তার। রঘুর দেহটা যেন শক্ত কাঠমত, রঘুর ঠোঁটের কোণে ফেনা।
এই, রঘুটার কি হয়েছে দেখ তো!
কি আবার হল? বেপরোয়া ছেলেগুলো রঘুর গায়ে হাত দিয়ে প্রথমটা হাসির ফোয়ারা ছোটাল, দেখছিস চালাকি, কি রকম মটকা মেরে পড়ে আছে! এই রঘু, গায়ে কাঠপিঁপড়ে ছেড়ে দেব, ওঠ বলছি!
শুধু গায়ে কাঠপিঁপড়ে নয়, কানে জল, পায়ে চিমটি ইত্যাদি করে ঘুম ভাঙ্গাবার সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করার পর বেদম ভয় ঢুকল ওদের। নিশ্চিত হল, এ ঘুম আর ভাঙবে না রঘুর, এ একেবারে ‘মরণ-ঘুম’। নইলে অমন হলদে রংটা ওর এমন বেগুনে হয়ে উঠবে কেন?
চল পালাই। বলল একজন।
পালাব? নেড়ু রুখে দাঁড়ায়।
পালাব না তো নিজেরাও রঘুর সঙ্গে যমের দক্ষিণ দোরে যাব নাকি? কর্তারা কেউ দেখ আস্ত রাখবে আমাদের?
যা বলেছিস। তুষ্ট ঠাকুর্দা ওই দুই দুধের বাঁক দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেবে।
বাঃ, আমাদের কি দোষ? আমরা কি মেরে ফেলেছি?
তা কে মানবে? বলবে তোদের সঙ্গে খেলছিল, তোরাই কিছু করেছিস। চল্ চল্, কে কমনে দেখে ফেলবে!
নেড়ু ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে, খুব ভাল কথা বলেছিস! বলি রঘু আমাদের বন্ধু না? ওকে শ্যাল-কুকুরে খাবে, আর আমরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচাব?
রঘু বন্ধু, এ কথা সকলের মনেই কাজ করছিল, কিন্তু ভয় কাজ করছিল তার চাইতে অনেক বেশী। কাজেই আর একজন বাস্তববাদী এবং ঈশ্বরবাদী বালক উদাসমুখে বলে, ভগবান ওর কপালে যা লিখেছে তাই হবে। আমাদের কি সাধ্যি যে খণ্ডাই!
আর রঘুর মা যখন বলবে, তোদের সঙ্গে খেলতে গেছল রঘু, সে তো বাড়ি ফিরল না। কোথায় সে গেল বাবা? তখন কি বলবি?
বলব আজ রঘু আমাদের সঙ্গে খেলতে যায় নি।
মিছে কথা বলবি?
তা কি করব? বিপাকে পড়লে স্বয়ং নারায়ণও মিছে কথা বলে।
বলে! তোকে বলেছে! নেড়ু তীব্রকণ্ঠে বলে ওঠে, পাহারা দে তোরা ওকে, আমি দেখি গিয়ে মেজকাকা আছেন নাকি!
আর মেজকাকা! যমে ওকে গ্রাস করেছে রে নেড়ু!
তাতে মেজকাকা ডরায় না। জটাদার বৌ তো মরে গেছল বাঁচান নি? কত লোককেই তো বাঁচান। আমি যাব আর আসব। তবে কপালক্রমে যদি দেখা না পাই, তাহলেই রঘুর আশায় জলাঞ্জলি।
অগত্যা রঘুর বাস্তববাদী বন্ধুরা ‘য পলায়তি’ নীতি ত্যাগ করে রঘুর মৃতদেহ পাহারা দিতে সম্মত হল। মায়া কি তাদেরই করছিল না? কিন্তু কি করবে?
.
তারপর এই জলন্ত আগুনের মত সংবাদটাই আগুনের মতই এখান থেকে ওখানে, এঘর থেকে ওঘর, দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিয়ে গ্রামসুদ্ধ সবাইকে টেনে এনেছে এই বুড়ো বটতলায়।
তারপর চলছে জল্পনা-কল্পনা।
সর্দি-গর্মি?
শরৎকালে?
তা হবে না কেন? শরতের রোদই তো বিষতুল্য। গণেশ তেলির শালীর ছেলেটা সেবার ঠিক এই রকম করে
আর জীবন স্যাকরার ভাইপোটা?
নেপালের ভাগ্নীটাও তো।
আরে বাবা, সে এ নয়, সে অন্য ঘটনা!
আমার পিসশ্বশুরের দেশেও একবার কাঁদের নাকি বুড়ো বাপ ঘাট থেকে আসতে গিয়ে-
সহসা সমুদ্র কল্লোলে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কবরেজ মশাই আসছেন!
বাড়ি ছিলেন না, কোথা থেকে যেন ফিরেই শুনে পালকি করেই বুড়ো বটতলায় এসে হাতি হয়েছেন।
শায়িত বালকের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন রামকালী, চমকে বললেন, কখন হয়েছে এ রকম?
নেড়ুর দিকে তাকিয়েই বললেন।
নেড়ু সভয়ে ঘটনাটা বিবৃত করল। রামকালী নিচু হয়ে ঝুঁকে ছেলেটার হাতটা তুলে ধরে নাড়ী পরীক্ষা করে নিঃশ্বাস ফেললেন, তারপর আস্তে মুখ তুলে বললেন, কাদের ক্ষেতের আঁখ খেয়েছিলি?
অন্য সব বালকরাই নাগালের বাইরে, নেড়ুই রাজসাক্ষী, তাই নিরুপায় স্বরে গুপ্তকথা প্রকাশ করে, ইয়ে–বসাকদের।
কিছু কামড়েছে বলে চেঁচিয়ে ওঠে নি একবারও?
না তো! নেড়ু অবাক হয়। সমগ্র জনসভা একটি মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে চিত্রাপিত পুত্তলিকাবৎ দণ্ডায়মান। এমন কি তুষ্টরা পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেছে, হাঁ করে তাকিয়ে আছে, বোধ করি কোনও একটু ক্ষীণ আশায় বুক বেঁধে।
সর্দি-গর্মি নয়। নিষ্ঠুর নিয়তির মত উচ্চারণ করেন রামকালী, সাপের বিষ!
সাপের বিষ!
