সদু কেন ভুতো ন ভবিষ্যতি করে গাল দিয়ে ঘোষণা করলেন এলোকেশী, যে আমার খেয়ে আমার পরে আমার সংসার ভাঙবার তাল খুঁজবে, তাকে ঝেটিয়ে দূর করে দেব তা এই বলে রাখছি সদু। আমার ছেলেকে কানে বিষ-মন্তর দিয়ে পর করে নিতে চাস লক্ষ্মীছাড়ি! উঠুক তোর মামা আহ্নিক করে, দেখাচ্ছি মজা!
সদু প্রতিবাদও করে না, নিজের সাফাইও গায় না এবং এ প্রশ্নই তোলে না, তার অপরাধ কোথায়? এমন কি তার মুখ দেখে এই মনে হয়, এই বাক্যবাণের লক্ষ্য বুঝি তার অপরিচিত কেউ!
নীলাম্বর আহ্নিক সেরে উঠে বাইরে তামার কুশিতে সূর্যার্ঘ্য নিবেদন করে কুশিটা মাটিতে উপুড় করে, আর এক দফা সূর্যপ্রণাম সেরে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াতেই এলোকেশী দুধকলা দিয়ে কালসাপ পোষার নজীর তুলে স্বামীকে অবহিত করিয়ে দিয়ে বলেন, তুমি যদি এই দণ্ডে চিঠি লিখে রওনা করে না দেবে তো আমার মাথা খাবে।
নীলাম্বর আহাহা করে উঠে বলেন, দিব্যি গালাগালির কি আছে। পত্র লিখছি, কিন্তু পাঠাবার কি হবে তাই ভাবছি। নাপতে-বৌ-তো–
কেন গাঁয়ে কি ও ভিন্ন আর মানুষ নেই? রাখাল তো গেছল সেবার?
রাখাল যাবে? কিন্তু অতখানি পথ একেবারে একলা! তাই ভাবছি।
তা হলে গোবিন্দ আচায্যির ছেলে গোপনাকে পাঠাও। গাঁজার পয়সা দিলে রাজী হয়ে যাবে।
গোপনাকে কুটুমবাড়ি পাঠাব! কি বলতে কি বলে আসবে!
আসুক না। এলোকেশী বীরদর্পে বলেন, ওই গেজেলের কটুবাক্যিতে যদি মিনসের চৈতন্য হয়! তার পর দেখি কেমন সোহাগিনী মেয়ে নিয়ে ঘরে বসে থাকতে পারে! গোপনাকে এও বলে দেবে, ওখানে আশেপাশে কুলীনের মেয়ের সন্ধান পায় কিনা দেখে আসতে। নাকের সামনে হলেই ভাল হয়।
নীলাম্বর আর কথা বাড়ান না, কাগজ কলম নিয়ে বসেন। এবং অনেক মুসাবিদান্তে একখানি চিঠির খসড়া করেও ফেলেন।
তাতে এই কথাই বিশদ বোঝানো থাকে, রামকালী যদি পূর্ব জিদ বজায় রাখতে চান, তাঁর কপালে অশেষ দুঃখ আছে। ছেলের তো আবার বিয়ে দেবেনই এঁরা, তা ছাড়া আরও যা করবেন ক্রমশ প্রকাশ্য। রীতিমত ভয় দেখানো চিঠি।
পত্রের ভাব ও ভাষায় এলোকেশী প্রীতিপ্রকাশ করেন। অতএব নীলাম্বর তৎপর হন পাঠাবার চেষ্টায়। কিন্তু মনে তার দুশ্চিন্তা, রামকালীর একমাত্তর মেয়ে সত্যবতী! বেশী টান কষলে দড়ি না ছিঁড়ে যায়।
এত কথার কিছুই নবকুমার জানে না। সে স্কুলে।
বেলায় যখন ফিরল, সদুর কাছে গিয়েই আগে দাঁড়াল। সদুদি, তেল!
সদু পলায় করে তেল এনে ওর হাতে দিয়ে বলে, দেখলি তো, বললাম কাজ কিছু হবে না, শুধু আমার কপালে ঝাটা, তাই হল। তোর শ্বশুরের মৃত্যুবাণ তৈরি, এতক্ষণে বোধ হয় পাঠানোও হয়ে গেল। যদি বা দুদিন দেরি হত, তোর অমত শুনে মামী একেবারে ধেই ধেই।
হাতের তেল আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বেচারা নবকুমার।
সদু বোধ করি ওর মুখভঙ্গী দেখেই করুণাপরবশ হয়ে বলে, যাক গে, তুই আর ও নিয়ে মন উচাটন করিস নে, দিতে হয় আর একবার টোপর মাথায় দিবি। কত আর কষ্ট! তোর একটা বৌ পেলেই হল। তবে মনে নিচ্ছে এবার তালুইমশাই নরম হবে, যতই হোক মেয়ের বাপ!
হঠাৎ নবকুমার একটা বেখাপপা এবং অবান্তর কথা বলে বসে, সায়েবরা শুধু একটা বিয়ে করে, কখনো অনেক বিয়ে করে না।
ব্যস, আর যায় কোথা!
সদুর হাসির ধুম পড়ে যায়। ওমা, তাই নাকি? ও বুঝেছি, ওই সায়েবদের বই পড়ে তোরও সেই বুদ্ধি মাথায় ঢুকেছে! তা হারে নবু, সায়েবরা যদি একটা বৈ বিয়ে করে না তো বাকী মেমগুলোর কী দশা হয়? বিধাতা পুরুষ যখন পৃথিবী ছিষ্টি করেছিল, তখন একটা করে বেটাছেলে আর দেড়কুড়ি করে মেয়েমানুষ গড়েছিল, এ তো জানিস? তা হলেই বল, বাকীগুলোর গতি কে করবে, যদি একটা বৈ বিয়ে না করে?
যত সব আজগুবী! যদিও নবকুমার মার আড়ালে বেশ সশব্দেই কথা বলে, পৃথিবী সুদ্ধ বেটাছেলে বুঝি দেড়কুড়ি করে–
মুখের কথা মুখেই থাকে, রঙ্গস্থলে এলোকেশী দেখা দেন, বলি নবা, চান করতে যেতে হবে কিনা? যখন দুটোয় এক হবে, অমনি হাসি-মস্করা। হ্যাঁলা সদি, তোকেও বলি, ও কি তোর সমবয়সী? তা তো না, রাতদিন কেবল কানে কুমন্তর দেওয়া! রোস, বৌ একটা আসুক না ঘরে, হাঁড়ি গলায় গেঁথে দেবার লোক হোক, তোকে একবারে ঝেটিয়ে বিদেয় করি।
মাতৃ সন্নিধানে নবকুমারের সর্বদাই চোরের ভূমিকা। তাই সদুদির এই অপমানে তার প্রাণটা ছটফটিয়ে উঠলেও মুখ দিয়ে রা ফোটে না। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই, সদুর মুখের রেখায় কোনভাব বৈলক্ষণ্য ফোটে না। সে যথাপূর্বং হাস্যবদনে নবুকে চোখ টিপে ইশারা করে, যার এই অর্থ হয় যা নাইতে যা, মামী ক্ষেপেছে!
হাতের তেল তেলো থেকে সবটাই গড়িয়ে গেছে, তেলালো হাতটাই শুধু মাথায় ঘষতে ঘষতে সোজা কাঁচদীঘিতে চলে যায় নবু। আজ আর যেন খিড়কি পুকুরে মন ওঠে না।
যেতে যেতে হঠাৎ সেই একদিন দেখা শ্বশুরের ওপর ভারী রাগ এসে যায় নবকুমারের। এত ঝামেলার কিছুই তো হত না, যদি সেই মেয়ে না কি পাঠাতেন তিনি!
বুকটায় শুধু পাষাণভারই নয়, যেন কাঁটাও বিধেছে। দূর ছাই!
১৮. সপরিবার তুষ্টু গয়লা
সপরিবার তুষ্টু গয়লা মাঠে এসে বুক চাপড়াচ্ছে আর পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে। তুষ্টুর পরিবার জলে পড়ে কি আগুনে পড়ে এইভাবে লুটোপুটি খাচ্ছে এখান থেকে ওখান।
