নবকুমারকে খাইয়ে মামী-ভাগ্নী দুজনে রান্নাঘরে বসে পড়ে খেতে। ওরা তো আর ভাত বেড়ে পিড়ি পেতে খাবে না, কাসি গামলা যাতে তাতে খেয়ে নেবে মাটিতে থেবড়ে বসে। তা এ সময় গল্পটা চলে ভাল। ফি হাত ধমক দিলেও ভাগ্নীকে নইলে চলেও না এলোকেশীর। কথা কইবার সঙ্গী বলতে দ্বিতীয় আর কে?
খাওয়ার পর রান্নাঘর ধোয়ার ভার সৌদামিনীর।
ঘর ধুয়ে পরদিনের জন্যে রান্নার কাঠ গুছিয়ে চকমকি ঠিক করে রেখে কাজ-করা কাপড় কেটে ৩বে শুতে যায় সদু। শোবার জন্যে তার নামে একটা ঘর আছে বটে, বিছানাও আছে বটে, কিন্তু সে ঘরে সে বিছানায় কতটুকুই বা শুতে পায় সে? নীলাম্বর যতক্ষণ না আসেন এলোকেশীকে আগলাতে হয়, কারণ এলোকেশীর বড় ভূতের ভয়।
নীলাম্বর আসার পর তার জল চাই কিনা, তামাক চাই কিনা খোঁজখবর করে তবে সদুর ছুটি। তা সে ছুটিটা প্রায় রাতের আধখানা গড়িয়ে গিয়ে হয়।
অবিশ্যি তার পর বাকী রাতটা সদুকে কে আগলাবে, এ প্রশ্ন ওঠে না। সদু তো সদু! ওকে যদি তা নিয়ে আক্ষেপ প্রশ্ন করো, নিশ্চয় হেসে উঠে বলবে, ভূতই আমায় আগলায়। জানো না– আমি যে শাকচুন্নী!
তবু সদু মামীকে ভালোবেসে মামাকে ভক্তিসমীহ করে, নবকুমারকে প্রাণতুল্য দেখে।
তার এই বত্রিশ বছরের জীবনে ভালবাসার, ভক্তি করবার, স্নেহ করবার জন্যে পেলই বা আর কাকে?
.
ভোরবেলাই ঘুমটা ভেঙে গেল।
কারণ কিছু মনে নেই, তবু যেন মনে হল নবকুমারের, বুকটায় কী একটা পাষাণভার চেপে রয়েছে। যেন আস্ত একটা পাহাড়ই কেউ বুকের ওপর বসিয়ে দিয়েছে কোন্ ফাঁকে! রাত্রে ঘুমের মধ্যেও ছিল যেন কি এক আতঙ্কের স্বপ্ন।
একটুক্ষণ খোলা জানলার দিকে চেয়ে বসে থাকতে সব মনে পড়ল। মনে পড়ল মায়ের শপথবাণী। মনে পড়ে হাত-পা ছেড়ে এল।
ধীরে ধীরে উঠে পড়ল, বেরিয়ে এল ঘর থেকে কেঁচার খুঁটটা গায়ে দিয়ে। ভোরের দিকে বেশ শীত-শীত পড়ে গেছে। আর শরৎকালের সকালের এই গা-সিরসিরে হাওয়াটাই তো কোন উধাও পাথারে মনটাকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়।
বাইরে এসে দেখল সৌদামিনী উঠোনে ছড়াঝাট দিচ্ছে। কাছে গিয়ে বলল মা ওঠে নি সদুদি?
মামী। সকালবেলাই হেসে গড়িয়ে পড়ে সৌদামিনী। মামি আবার এমন সময়ে কবে ওঠে রে নবু? ভোর ঠাকুরের সঙ্গে যে মামীর বিরোধী।
খচখচ ঝাঁটা চালাতে চালাতে বলে সদু, সরে দাঁড়া নবু, ধুলো লাগবে।
লাগুক গে। বলে বরং কাছেই সরে এল নবকুমার, কাছে এসে হঠাৎ শীতকালে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গীতে বলে উঠল, সদুদি, তুমি মাকে বলে দিও, ওসব পারব-টারব না।
ঝাঁটা বন্ধ হল সৌদামিনীর!
চোখ গোল গোল করে বলল, কি বলে দেব মামীকে? কী পারবি না?
ওই সব! নবকুমার বলে ওঠে, শুনলে তো কাল নিজের কানে, আবার শুধোচ্ছ কেন?
নাঃ, তুই আমায় অথই জলে ফেললি নবু! কালকের দিনভোর কত কথাই তো শুনেছি, কোনটা তোর মনে গিথে আছে, তা কেমন করে বুঝব?
আঃ, আচ্ছা জ্বালায় ফেললে তো! নাপিত পিসির ব্যাপারে রেগে গিয়ে মা যা বলল মনে নেই তোমার?
ও হরি, তাই বল! তোর আবার বিয়ে দেবে, এই কথা তো? ফের সদুর সেই হি-হি হাসি, সেই চিন্তেয় রাতভোর ঘুমুস নি বুঝি? নাকি সেই ঠাকুরঘরে কে, না আমি তো কলা খাই নি তাই? মামী পাছে প্রিতিজ্ঞে বিস্মরণ হয়ে যায় তাই আমি পারব না আমি করব না বলে স্মরণ করিয়ে দিতে এসেছিস?
আঃ সদুদি, ভাল হবে না বলছি। আমি এই তোমায় বলে রাখছি ওসব পারব না। আবার ওই কানমলা-টানমলা–ওরে বাবা!
সদু ফের হাতের কাজে মনোনিবেশ করে বলে, তা আমায় বলে কি হবে? মামীকে বল!
আমি বলব? আমি বলব মাকে?
সদু হাসতে হাসতে বলে, বলবি না কেন? ডাগর হয়েছিস, সাহস হচ্ছে না?
মার কাছে সাহস! হুঁ! এই তোমায় বলছি সদুদি, আমি তোমার কাছে বলে খালাস, যা বিহিত করার তুমি করবে।
সৌদামিনী ফের হাত থামিয়ে বলে, বেশ বলব মামীকে, নবুর আমাদের প্রেথম পক্ষের ওপর বড় আঁতের টান, ওকে ত্যাগ দিয়ে অন্যত্তর বিয়ে করবে না!
সদুদি ভাল হবে না বলছি! বলি, আবার এই সব ভুতুড়ে কাণ্ডর দরকার কি? নাই বা পাঠাল কেউ মেয়ে, পরে ঘরের মেয়ে নইলে বুঝি সংসার চলে না?
কই আর চলে? সদু হাত মুখ নেড়ে বলে, চলে আর এই আদি-অন্তকাল ধরে মানুষে ওই সব ভূতুড়ে কাণ্ড করত না, বুঝলি রে নবু! এর পর ওই পরের মেয়েই জগতের সেরা আপন হবে।
ছাই হবে! ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলে নবকুমার, কই, জামাইবাবুর তো হল না।
সদুর উচ্ছাস কমে, একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, ও-কথা বাদ দে। আমার মতন ছাই-পোরা কপাল যেন অতি বড় শত্রুরও না হয়!
নবকুমার সদুর ভাবান্তরে ঈষৎ থতমত খেয়ে বলে, আমি কিছু ভেবে বলি নি সদুদি। কিন্তু যা বললাম, তোমাকে আমার রক্ষেকত্তা হতে হবে!
বেশ বলব মামীকে, যা দেখেছি দু-ঘা ঝাটা আছে ললাটে।
.
তা সদুর কথা মিথ্যা নয়। এলোকেশী সেই ব্যবস্থাই করেন।
তবে ললাটের-ঝাঁটাটা দৃশ্যমান নয় এই যা। শব্দ অদৃশ্য। তবু এলোকেশী যখন কথার তুবড়ি ছোটান, মনে হয় তার মুখ থেকে আগুনের হলকার মত দৃশ্যমানই কিছু বার হচ্ছে বুঝি!
শাক বাছতে বাছতে কথাটা পেড়েছিল সৌদামিনী, ওগো মামী, তুমি তো বলছ ওরা পশুপাঠ মাত্তর মেয়ে না পাঠালে তুমি ছেলের আবার বিয়ে দেবে, এদিকে ছেলে তো বেঁকে বসে আছে!
কী! কী বললি?
মুহূর্তে অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেল।
