খাচ্ছি তো! এতক্ষণে অস্ফুটে একটা কথা বলে নবকুমার এবং বাক্যের সত্যতা রক্ষার্থে এক গ্রাস ভাত ঠেলেঠুসে মুখের মধ্যে চালান দেয়।
এবার সদু বা সৌদামিনীর রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব। মাটির সরায় একসরা ধোয়াওঠা গরম ভাত নিয়ে এসে অবাক গলায় বলে উঠে সে, ওমা, ই কি! যেখানকার ভাত সেখানে পড়ে! এতক্ষণ কি করলি রে নবু?
খাচ্ছি তো! আরও একবার পূর্ব-কথা এবং পূর্বোক্ত কাজের পুনরাবৃত্তি করে নবকুমার।
দিয়ে যাই আর দুটো?
না না, আর নয়। ভরা মুখে হাত মুখ মাথা সব নেড়ে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে নবকুমার।
খিদে নেই?
নবকুমার আর একবার বলে, খাচ্ছি তো।
এদিকে ঠেলে-ওঠা চোখে জল আসতে চায়।
খিদে আর থাকবে কোথা থেকে? এলোকেশী বলে ওঠেন, শ্বশুরের নিন্দে, করেছি যে! একালের ছেলে তো! কিন্তু তোকে আবারও এই বলে রাখছি নবা, তোর দেমাকে-শ্বশুরের ওই খাড়া নাক যদি না খুঁয়ে ঘষটে দিই তো আমি কি বলেছি বাপ বাপ বলে ওই মেয়ে ঘাড়ে করে নাকে খত্ দিতে দিতে আসে তো ভাল, নচেৎ আবার ছাদনাতলায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে তোকে। এবার আর নবাবের বেটী আনব না, গরীব-গুরবো ঘরের মেয়ে নে আসব।
ওই শোন’ সদু হেসে ওঠে, আর মুখ গোঁজ করে থাকবার কিছু নেই রে নবু, আশ্বাস-বাকি পেয়ে গেলি। এখন বড় বড় থাবায় খেয়ে নে। …বৌ এল না বলে মনের দুঃখে নবু অমন সরলপুঁটির টকটাই ভাল করে খেল না, দেখছ মামী?
সব সময় ন্যাকরা করিস নে সদু, এলোকেশী বেজার মুখে বলে, চব্বিশ ঘণ্টা হাসি-মসকরা কার ভালও বা লাগে! প্রাণে কিসের যে এত উল্লাস তাও তো বুঝি না।
.
কথাটা সত্যি।
উল্লাস আসবার কথা সদুর নয়।
তবু আসে।
তবু রং-তামাশা করে সদু, হি-হি করে হাসে। কিন্তু হাসি আসে কি করে সদু নিজেই কি জানে ছাই!
হয়তো এ জগতে একমাত্র ওইটুকুই ওর নিজের এক্তারে আছে বরে আনায়। দুর্ভাগ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হি-হি করে হেসে বেড়ায় সে বুকের পাথরখানা ঠেলে ফেলে দিতে।
অবিরত ওই পাথরখানা বুকে বইতে হলে কি ঘুরেফিরে আর অসুরের মত খেটে বেড়াতে পারত?
গাঁ-সুদ্ধ সবাই তো ধিক্কার দেয় সদুর ভাগ্যকে, সবাই তো জানে সদুকে বরে নেয় না। অকারণ, শুধু খেয়ালের বশে সদুকে সদুর বর ত্যাগ করেছে। স্বভাবচরিত্র খারাপ তো অনেকেরই থাকে, পরিবারকে ত্যাগ আর কজন করে!
সদুর মা নেই, বাপ নেই, আজন্ম মামার বাড়ি মানুষ। মামা দু-তিনবার চেষ্টা করে করে শ্বশুরবাড়ি রেখে এসেছিল তাকে, কিন্তু কিছুতেই নিজের আসন দখল করতে পেরে উঠল না হতভাগা মেয়েটা। দুর্ব্যবহারের চোটে পালিয়ে আসতে পথ পায় নি।
তদবধি আবার এই মামার বাড়িতেই স্থিতি।
তা ছাড়া উপায় কি?
মামার বাড়িতে আছে, দুবেলা হেঁসেল ঠেলছে, জুতো-চণ্ডী সব নাড়ছে আর মামীর মুখ। খাচ্ছে।
তবু সে হাসে।
বলিহারি!
বলিহারি যাই বাবা!– মামী বলে, পাড়াসুদ্ধ সবাই শুনে শুনে নবকুমারের এখন ধারণা হয়ে গেছে, হাসিটা সদুদির পক্ষে গর্হিত, তাই সে হাসিঠাট্টায় কোনও দিনই তেমন করে যোগ দিতে পারে না। আর আজকের কথা তো স্বতন্ত্রই। আজকের হাসি-ঠাট্টার বিষয়বস্তু তো নবকুমার নিজেই।
দুধটা আনবি, না দাঁড়িয়ে রঙ্গ করবি?
ধমকে ওঠেন এলোকেশী।
ছেলের কোলের গোড়ায় ভাতের থালাটি বসিয়ে দেওয়া ছাড়া আর বেশী নড়াচড়া করেন না এলোকেশী। দ্বিতীয়বার যা কিছু লাগে ‘সদু সদু’ হাঁক। মস্ত সুবিধে, সধু বিধবা পুষ্যি নয়। বিধবা হলে তো এক মহা ঝঞ্ঝাট-রাত্তিরে আঁশ হেঁসেলের ভার দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে আর কোন দ্বিধা দায় নেই। বড় বড় সরলপুঁটির টক সদু তো নিজেও একটু খাবে, অতএব কুটুক বাছুক রাঁধুক।
কর্তা নীলাম্বর বড়য্যের বয়স যাই হোক, রাতে ভাত খাওয়া ছেড়েছেন তিনি অনেক দিন। ঘরের গরুর খাঁটি দুধ দেড়সেরখানেককে মেরে আধসের করে সর পড়িয়ে রাখা হয়, তাতেই বাড়িতে ভাজা টাটকা খই ফেলে গোটা আষ্টেক মনোহরা মেখে আহার সারেন নীলাম্বর।
সে সারা তার সন্ধ্যাহ্নিক সেরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই হয়। নবু মাস্টারের কাছে পড়ে ফেরার আগেই। আবার তিনি যখন বেড়িয়ে ফেরেন, নবুর তখন অর্ধেক রাত্তির, কাজেই এ বেলায় বাপে ছেলেতে দেখা হয় না। ছেলের যে এই এক বেয়াড়া খেয়াল হয়েছে, ইংরিজি শিখবে! ওই ম্লেচ্ছের ভাষা শিখে কি চতুর্বর্গ লাভ হবে কে জানে, তবু খুব একটা বাধাও দেন নি নবকুমারের স্নেহশীল পিতা। বলেছেন, ইচ্ছে হয়েছে পড়ুক!
আসল নষ্টের গোড়া তো ওই ভবতোষ বিশ্বাসটা। কলকেতা থেকে ইংরিজি শিখে এসে গাঁয়ে এখন ইস্কুল খোলা হয়েছে বাবুর। সকাল-বিকেল দুবেলা ইস্কুল বসায়। গাঁয়ের ছোঁড়াগুলোকে ক্ষ্যাপানোর গুরু। কানে মন্তর দিচ্ছে, ইংরিজি না শিখলে নাকি উন্নতি নেই, শিখে কলকাতায় গিয়ে হাজির হতে পারলে সাহেবের অফিসে মোটা মাইনের চাকরি অবধারিত। ছুটছে সবাই ওর ইস্কুলে চালাকের রাজা ভবতোষ ফাসটু বুক, সেকেন বুক, কত সব শক্ত বই কিনে এনেছে কলকাতা থেকে, তাই থেকে পড়িয়ে পড়িয়ে বিদ্যে-দিগগজ করছে সবাইকে।
বামুনের ঘরের ছেলেগুলো যাচ্ছে শুদুরের কাছে বিদ্যে নিতে! কলি পূর্ণ হতে আর কতই বা বাকি!
তবু ছেলেকে বাধা দেন নি নীলাম্বর, কলির তালেই চলেছেন। শুধু ওই ম্লেচ্ছ-ভাষা-শিখে-আসা জামা-কাপড়গুলো ঘরে তোলে না, পরে কিছু ছোয় না, ছেড়ে হাত-পা ধুয়ে গঙ্গাজল স্পর্শ করে, এই পর্যন্ত।
