কিন্তু কই?
ক’দিনের কড়ারে গেছে নাপিত-বৌ, সে খবর নবকুমারের জানবার কথা নয়, তবু আশা করছিল পূজোর আগে অবশ্যই। আর পূজোর উৎসবের সঙ্গে হৃদয়ের আর এক উৎসবকে যুক্ত করে নিয়ে অবিরত বিহ্বল হচ্ছিল সে।
পূজো আসছে!
বৌ আসছে!
পূজোটা জানা, কিন্তু না-জানি কেমন সে বৌ।
বিয়ে হয়েছিল পনেরো পার হয়ে, এমন কিছু অজ্ঞানের বয়সে নয়, তবু লাজুক-প্রকৃতি নবকুমার বিয়ের কোন অনুষ্ঠানের সময়ই একটু চকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেও কনে বৌকে দেখে নেবার চেষ্টা করে নি। এখন যদি কেউ বদলে অন্য মেয়ে গছিয়ে দেয়, ধরার সাধ্য হবে না নবকুমারের।
এমন কি এই কদিন ধরে শত চেষ্টাতেও বৌয়ের নামটা মনে আনতে পারছে না সে। এতদিন অবশ্য মনে আনবার খেয়ালও হয় নি, নাপিত-বৌয়ের অভিযানই সহসা নবকুমারকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে কৈশোর থেকে যৌবনের ধাপে।
বিয়ের সময় সম্প্রদানকালে নামটা তো দু-একবার উচ্চারিত হয়েছিল মনে হচ্ছে, কিন্তু কে তখন ভেবেছে এই নামটা মনে রাখবার দায়িত্ব তার! নবকুমার তো তখন অবিরাম ঘামছে!
ওই ঘামটাই মনে আছে, নাম-টাম নয়।
একে তো বিয়ের বর, তা ছাড়া শ্বশুরের সেই দৃপ্ত উন্নত চেহারা, গম্ভীর স্বর আর রাশভারী ভাব। সেটাও সেই ভয়কে বাড়িয়ে দেওয়ার সহায়তা করেছিল।
তা ছাড়া বাসরঘরে আরও কত রকম ভয়।
সে ভয় এখনও বুঝি একটু একটু আছে। কিন্তু বৌ শব্দটি মিষ্টি। ভয়ের মধ্যেও রোমাঞ্চ।
কও না কথা মুখ তুলে বৌ,
দেখ না চেয়ে চোখ খুলে!
মনের মধ্যে বাজছে সুর আর শব্দ। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বৌয়ের আসন্ন আবির্ভাব নিয়ে আলোচ• করবার ক্ষমতাও নেই নবকুমারের। পাড়ার বন্ধু যারা খবরটা শুনেছিল তারা যদি একটু-আধটু ঠাট্টা করছে, “ধেৎ, ধেৎ” ছাড়া আর কোনও উত্তর দিতে পারছে না সে।
অথচ যখন ভবতোষ মাস্টারের কাছ থেকে পড়া সেরে সন্ধ্যায় কাঁচদীঘির নির্জন পাড় দিয়ে বাড়ি ফিরেছে তখন অনুচ্চারিত শব্দে বার বার ফিরিয়ে ফিরিয়ে গেয়েছে–
এনেছি বকুলমালা, করবে আলা
তেল-চোয়ানো তোর চুল!
… …
মিশি দাঁতের হাসিটি বেশ,
মুখখানি বেশ ঢলঢলে!
তারপর কি? তাই তো! মুখখানি বেশ ঢলঢলে, মুখখানি বেশ-পরের লাইনটা কিছুতেই মনে পড়ে না, কোথা থেকে যে শিখেছিল তাও মনে পড়ে না। তবু ওই অসমাপ্ত গানটাই অপূর্ব সুরে গুঞ্জরিত হতে থাকে সমস্ত রাস্তাটা।
ক’দিনের প্রত্যাশার পর আজ বাড়ি ফিরে এলোকেশীর প্রদত্ত সমাচারে বুকটা ছলাৎ করে উঠল। আর সেই বিয়ের দিনের মত ঘাম ছুটে গেল মুহূর্তের মধ্যে।
নাপিত-বৌ এসেছে শুনেছিস? বলে উঠলেন এলোকেশী।
বাঘিনীর মত বসেছিলেন দাওয়ার ধারে। ছেলে এসে পা-টা হাতটা ধোবে, এটুকু সময়ও দেরি সইল না তার। দিয়ে বসলেন সংবাদ। অন্ধকারেই বলে বসলেন, আলোটাও আনলেন না ছেলের সামনে।
নবকুমারের কাছে অবশ্য এ সংবাদ অন্য অর্থ বহন করে এনেছে, তাই তার চিত্তে বিহ্বলতা তাই মার বর্তমান অবস্থা ধরতে পারল না সে। ধরতে পারল না কণ্ঠস্বরের ভীষণতাও। তাই না-জানা একটা সুখে শিউরে উঠল।
কিন্তু কতক্ষণের জন্যেই বা!
ক্ষণকালের মধ্যেই নিষ্ঠুর সত্য প্রকাশিত হল।
মান্যগণ্য বেহাইয়ের উদ্দেশে ‘ছোটলোক’, ‘চামার’, আসপদ্দাবাজ’ ইত্যাদি শোভন-সুন্দর বিশেষণমালা প্রয়োগ করে এলোকেশী জানালেন, “মেয়ে পাঠাল না।”
মেয়ে পাঠাল না!
এ কি অদ্ভুত বাণী!
মেয়ে না পাঠানো যে সম্ভব, সে কথা তো একবার মনের কোণেও আসে নি নবকুমারের!
কিন্তু এ কথায় আর কি কথা কইবে নবকুমার! আর উত্তরের প্রত্যাশা করেও কথা বলেন নি এলোকেশী।
আরও খানিকক্ষণ ধরে বেয়াইয়ের পয়সার গরম তুলে, নাপিত-বৌকে ঘুষ দিয়ে হাত করার বার্তা জানিয়ে, অবশেষে হঠাৎ আবিষ্কার করলেন এলোকেশী, ছেলেটা সেই অবধি উঠোনেই দাঁড়িয়ে আছে কাঠ হয়ে।
মাতৃস্নেহ জেগে উঠল।
আর দাঁড়িয়ে থেকে কি করবি, হাত-মুখ ধো! বলে এলোকেশী উচ্চগ্রামে চিৎকার করলেন, ভাত নেমেছে সদু?
রান্নাঘর থেকে সাড়া এল, নেমেছে মামীমা।
আয় মুখ ধুয়ে, ভাত দিই। বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন এলোকেশী। আর নবকুমার আস্তে আস্তে গায়ের কোটটা খুলে দেয়ালে লাগানো একটা গজালে টাঙিয়ে রেখে চলে গেল খিড়কির পুকুরের দিকে।
হঠাৎ মনটা কেমন শিথিল আর ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। যা ছিল না, কোন দিনই যার স্বাদ জোটে নি, তেমন জিনিস হারালেও এমন শূন্যতা বোধ আসে? সব ফাঁকা-ফাঁকা ঠেকে?
কিন্তু তখনই বা হয়েছে কি!
আসল কথা পাড়লেন এলোকেশী ছেলেকে খেতে দিয়ে, পিদ্দিমের সলতে উসকে পা ছড়িয়ে বসে।
সে মুখ দেখে বুক কেঁপে উঠল নবকুমারের।
আমি এই তোকে বলে রাখছি নবা, শেষবেশ একটা চিঠি চামারটাকে দেওয়াব কর্তাকে দিয়ে, তাতেও যদি মেয়ে না পাঠায়, এই সামনের অঘ্রাণেই তোর আবার বিয়ে দেব।
আবার বিয়ে!
মা কি আজকে বুক ধড়াস ধড়াস করিয়েই মারবে নবকুমারকে?
আবার বিয়ে!
তার মানে আবার আর একবার নবকুমারকে নিয়ে সেই নকড়া-ছকড়া খেলা, আবার আর একটা বাড়িতে গিয়ে সেই সম্প্রদান, সেই বাসর, সেই কানমলা, সেই ঘাম।
ঘাড়টা প্রায় পাঁতের সঙ্গে ঠেকে যায় নবকুমারের। মুখ দিয়ে কথাও বেরোয় না, মুখের মধ্যে ভাতের গ্রাস ঢোকে না।
হঠাৎ একসময় কটুক্তি থামিয়ে এলোকেশী বলেন, খাচ্ছিস কই?
