সাতকাণ্ড রামায়ণ গাইবার সময় এখন আমার নেই বামুন-বৌদি, দু দিন দু রাত পায়ের ওপর, সব্বাঙ্গ যেন ভেঙে আসছে। ঘরে যাই এখন।
ঘরে আর যাবি কেন, বাঁড়ুয্যে-গিনী নিষ্প্রভ ভাবে বলেন, এখানেই নয় দুটো।
না বাবা, ওতে আর দরকার নেই। কথায় বলে ভাইয়ের ভাত ভেজের হাত। ঘরে গে দু-দুও জিরোই, তারপর বোঝা যাবে।
আরো নরম হতে হয়, আরো তোয়াজ করতে হয়। শক্তের ভক্ত পৃথিবী।
হ্যাঁলা, তা মাথায় বিষবাণ বিধে রেখে দিলি, উদ্ধার কর! মেয়ে কি বলল তাই বল্? তুই কুটুমের বাড়ি থেকে গিয়েছিস, তোর সামনে কি বাচালতা করল?
করল কি আর গাছে চড়ল? তা নয়। তবে ঠাকুরমাদের সঙ্গে খুব হাত মুখ নেড়ে বক্তিমে করছিল দেখছিলাম। গিন্নীরা বলছিল, কুটুম চটানো ঠিক নয়, তোমার বেয়াইয়ের দুর্বুদ্ধির নিন্দে করছিল, তা দেখি ঘরের মধ্যে ঝাঁজ দেখাচ্ছে, বাবার কথার ওপর কথা! বাবার চাইতে তোমাদের বুদ্ধি বেশী! বে’র সময় যদি কথা হয়ে গেছল বারো বছর বয়েস না হলে তারা বৌ নিয়ে যাবে না তো নিতে পাঠায় কোন্ আইনে, এই সব!
কিন্তু বাঁড়ুয্যে-গিন্নীর তখন আর বাকস্ফূর্তির ক্ষমতা নেই। পুত্রবধূর বাকবিন্যাস-প্রণালীর সংবাদে সে ক্ষমতা লোপ পেয়েছে তার।
কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে থেকে সনিঃশ্বাসে বলেন, হ্যাঁলা বৌ, তুই তো আমাকে খুব উপহাস্যি করলি বেটার আবার বে দেব বলেছি বলে, তা তুই-ই নিজে মুখে স্বীকার কর, এ বৌ নিয়ে ঘর করা যাবে? বাবার জন্মে তো এমন কথা শুনি নি নাপিত-বৌ যে শ্বশুরঘরে যাওয়ার কথা নিয়ে ঘরবসতের বৌ কথা কয়, চিপটেন কাটে!
বাপের একটা তো, একটু বাপসোহাগী আছে। তা ও দোষ কি আর থাকবে? আপনিই যাবে। কথাতেই তো আছে গো–হলুদ জব্দ শিলে, চোর জব্দ কিলে, আর দুষ্ট মেয়ে জব্দ হয় শ্বশুরবাড়ি গেলে!
জানি নে মা, আমার তো ভয়ে পেটের মধ্যে হাত-পা সেঁদিয়ে যাচ্ছে। বুড়ো বয়সে বেটার বৌয়ের হাতে কি খোয়ার আছে তা জানি না। আবার বে দেব আর কোথা থেকে! তোর বামুনদাদা যে বেয়াইয়ের বিষয়-সম্পত্তির ওপর ট্র্যাক করে বসে আছে। বলে বাপের একটা মেয়ে, বাপ চোখ বুজলে সব মেয়ে-জামাইয়ের।
শোন কথা! এবার গালে হাতের পালা নাপিত-বৌয়ের, ওই বিরিঙ্গির গুষ্টি, অমন সব সোনারচাঁদ ভাইপো রয়েছে, তারা পাবে না? তা ছাড়া ভাগভেন্ন তো নয়!
তা জানি নে বাপু, কত্তা বলে তাই শুনি। বলে বাপটা একবার চোখ বুজলে হয়!
কার চোখ আগে বোজে, কে কার বিষয় খায়, কে বলতে পারে বামুন-বৌদি! বেয়াইয়ের তো তোমার সোনার গৌরাঙ্গর মতন চেহারা, এখনো বে দিলে বে দেওয়া যায়! যাক গে বাবা, তোমাদের কথা তোমরা বোঝ, যাই, উঠি। বামুনদাদাকে পত্তরখানা দিও।
নাপিত বৌ উঠতে যায়, আর সেই মুহূর্তেই বামুনদাদার আগমনবার্তা ঘোষণা করে খড়মের খট খট।
এ কী, নাপিত-বৌ ফিরে এলি যে!
প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের উঠোন থেকে ভিতর-উঠোনে পা ফেলেন বাড়ূয্যে।
ফিরে না এসে অকারণ আর কতদিন কুটুমের অন্ন ধ্বংসাব! অবিশ্যি তারা অনেক বলেছিল আর দশদিন থেকে
তা তুই গিয়েছিলি কি করতে? বৌ কই?
পাঠাল না।
বজ্রনির্ঘোষ ধ্বনিত হয় গৃহিণীর কণ্ঠ হতে।
পাঠাল না।
আর একবার প্রমাণিত হল, একটি প্রশ্নের মধ্যেই জগতের সমস্ত বিস্ময় প্রকাশ করা সম্ভব হল।
ছেলেকে খেতে বসিয়ে কথাটা পাড়লেন এলোকেশী। নাপিত-বৌ-নিষিক্ত অগ্নিধারা শরীরের মধ্যে পরিপাক করতে করতে বেগুনেরঙা হয়ে উঠেছিলেন তিনি, তাই ভাতের থালাটা ছেলের পাতের গোড়ায় ধরে দিয়ে যখন পিদ্দিমের সলতেটা একটু বাড়িয়ে পা ছড়িয়ে বসলেন, মায়ের ভীষণাকৃতি মুখ দেখে বুকটা কেঁপে উঠল নবকুমারের।
নবকুমারের বয়স আঠারো-উনিশ হলেও মায়ের কাছে সে দুগ্ধপোষ্যের সমগোত্র। আর মা এবং যম তার মনের জগতে সমতুল্য। মা যখন মুখ ছোটায়, তখন ভয়ে নবকুমারের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁদিয়ে যায়। যার উদ্দেশেই সেই বহ্নিস্রোত প্রবাহিত হোক, নবকুমার ভয়ে কাঁপে।
আজকের গালিগালাজের স্রোতটা আবার নবকুমারেরই শ্বশুরবাড়িকে কেন্দ্র করে, কাজেই খাওয়া আর হয় না বেচারার। ভয়ে লজ্জায় ঘাড়টা নিচু হতে হতে প্রায় থালার সঙ্গে ঠেকে আসে।
নাপিত-বৌ কুটুমবাড়ি যাওয়া পর্যন্ত মনের মধ্যে একটি পুলকের গুঞ্জরণ বইছিল নবকুমারের, ছড়ানো ছিটানো কথায় শুনতে পাচ্ছিল এলোকেশী নাকি বৌকে আনতে পাঠিয়েছেন।
কেমন সেই বৌ, কি তার নাম, কি রকম দেখতে, এসব লজ্জাকর চিন্তাকে কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছিল না নবকুমার। শয়নে স্বপনে একটি মুখচ্ছবি আবছা আবছা ছায়া ফেলে বাড়ির এখানে সেখানে এলোকেশীর কাছে কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, ঘোমটা টেনে টেনে।
শোবার ঘরে? অনবগুণ্ঠনে?
ওরে বাবা, অত দুঃসাহসী কল্পনার সাহস নবকুমারের নেই। সে ভাবনার ধারে-কাছে গেলেই বুক গুরগুর করে ওঠে তার। মার সামনে দাঁড়ালে তো কথাই নেই, আশঙ্কা হয় ছেলের মনের ভিতরটা কাঁচদীঘির জলের ভিতরটার মতই দেখতে পাচ্ছেন এলোকেশী।
না, শোবার ঘরের এলাকায় কি নিজের ধারে-কাছে বৌয়ের উপস্থিতির অবস্থা চিন্তা করে না নবকুমার, করে শুধুই মায়ের ধারে-কাছেই।
নাপিত-বৌয়ের অভিযান কার্যকরী হবে না, এরকম অবিশ্বাস্য দুর্ঘটনার কথা তার স্বপ্নেও মনে আসে নি, তাই এই কদিন প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ভবতোষ মাস্টারের কাছে ইংরেজি পড়া পড়ে বাড়ি ফিরে উৎকর্ণ হয়ে থাকে একটি মৃদু ঝুনঝুন মলের শব্দের আশায়।
