এখন পাঠাব না।
তা কখন পাঠাবেন? আমার ছেরাদ্দর সময়? আমি যে ভেবে থই পাচ্ছি না রে নাপিত-বৌ, মেয়ের বাপের এত বড় বুকের পাটা! পৃথিবীতে এখনও চন্দ্র-সূর্য্যি উঠছে, না থেমে গেছে? এ কথা ভেবে বুক কাপল না যে, তোর মেয়েকে যদি ত্যাগ দিই!
নাপিত-বৌ নিষেধ অগ্রাহ্য করে মুখে পান-দোক্তা পুরে বলে, বুক কাঁপবে! হুঁ! একটা কেন একশটা মেয়েকে ঘরে ঠাই দেবার, ভাত কাপড় দে’ পোষবার ক্ষমতা তাদের আছে। লক্ষ্মীমন্তর ঘর বটে।
খুব বুঝি গিলিয়েছে! বড়য্যে-গিন্নী দুরন্ত ক্রোধকে পরিহাসের ছদ্মবেশ পরিয়ে আসরে নামান, তাই বেয়াইবাড়ির লক্ষ্মীর ঘটায় চোখ ঝলসেছে! বলি ঘরে ভাত থাকলেই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আশ্রয় ঘোচাতে হবে? এত বড় আস্পদ্দার পর আর ওদের মেয়ে আনব আমি?
খাওয়ার কথা তুলে খোটা দিও না বামুন-বৌদি, তোমাদের আশীর্বাদে নাপিত-বৌয়ের অমন খাওয়া ঢের জোটে। তবে হ্যাঁ, নজর আছে বটে। শুধু পয়সা থাকলেই হয় না, নজর থাকা চাই।
কথাটা অর্থবহ এবং সে অর্থ বড়য্যে-গিন্নির অন্তরে ছুঁচের মত গিয়ে বেঁধে, তবু তিনি নিজেকে সংযত করে বলেন, তা নজরের পরিচয় কি দেখাল? বিশ ভরির চন্দরহার গড়িয়ে দিয়েছে তোকে, নাকি পঁচিশ ভরির গোট?
উপহাস্যির কিছু নেই, যা অনেয্য তা বললে চলবে কেন? একজোড়া ফরাসড্যাঙার থান, একখানা কেটে ধুতি আর নগদ পাঁচ টাকা কে দেয় গা কুটুমবাড়ির লোককে?
দেবে না কেন, যারা মেয়ে ঘরে আটকে রেখে দিতে চায়, তারা ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করে কুটুমের লোকের। নইলে তুই তাদের যাচ্ছেতাই শুনিয়ে দিয়ে না এসে সুখ্যেত করছিস বসে বসে! তোর ওপর আমার ভরসা ছিল, এ তল্লাটে তোর মতন মুখ তো কারুর দেখি না, আর তুই-ই ডোবালি? বাঘিনী হয়ে মেড়া বনে এলি?
কী যে তকরার করো বামুন-বৌদি, মেয়ের বাপ নিজে তফাতে দাঁড়িয়ে গিন্নীকে বলে দিল, মা, কুটুমবাড়ির মেয়েকে বলে দাও, বিয়ের সময় কথা হয়েছিল মেয়ের কুমারীকাল পুন্ন না হলে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হবে না, সে কথা তারা হয়ত বিস্মরণ হয়ে গেছেন, আমি তো হই নি। সময় হলে যাবে বৈকি!
বড়য্যে-গিন্নী বিবাহকালের শর্ত উল্লেখে ধেই ধেই করে ওঠেন, কী বললি নাপিত-বৌ, বিয়ের কালের শত্ত-সাবুদের কথা তুলেছে? কথা অমন কত হয়–বলে লাখ কথা নইলে বিয়ে হয় না–বলি তাদের চরণে খত লিখে দিয়েছিল কেউ? আমার ঘরের বৌ আমার যদি আনতে ইচ্ছে হয়! আচ্ছা আমিও দেখছি কত তাদের আস্পদ্দা, কত তাদের তেজ! মেয়েকে শুধু ভাত-কাপড় দিলেই যদি সব মিটে যেত, তা হলে আর কেউ তাকে বিয়ে দিয়ে পরগোত্তর করে দিত না, বুঝলি নাপিত-বৌ? আসছে মাসেই বেটার আবার বিয়ে দেব আমি, এই তোকে বলে রাখলাম।
নাপিত-বৌ নিমকহারাম নয়। অনেক খেয়ে অনেক পেয়ে এসেছে, তাই বেজার মুখে বলে, সে তোমাদের কথা তোমরা বুঝবে, বেয়াই তো পত্তর লিখে দিয়েছে বামুনদাদার নামে, ন্যাও রাখো।
তুই যে তাজ্জব করলি নাপিত-বৌ, এই কদিনে তোকে তুক করল না গুণ করল লো! তাই ঘরশত্তুর বিভীষণ হলি! কেবল ওদের কোলে ঝোল টেনে কথা বলছিস! কই, পত্তর কোথা?
এই যে। নাপিত-বৌ নিজের গামছাটার পুঁটলির গিট খোলে।
বড়য্যে-গিন্নীর অবশ্য তৎপরতার অভাব নেই, তিনিও সঙ্গে সঙ্গে পুঁটলির মধ্যে শ্যেনদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, কই, বড়মানুষ কুটুম কী দিয়েছে দেখি!
একটি ছেঁড়া ন্যাকড়ার পুঁটলি খুলে একখানি দোমড়ানো মোচড়ানো চিঠি বার করে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে নাপিত-বৌ প্রাপ্ত সম্পদ দেখায়, এই কেটে, এই কাপড়ের জোড়া, এই গামছা, আর-
ও বাবা, আবার নতুন ঘটি কাঁসি দিয়েছে যে দেখছি! বড়য্যে-গিন্নী বলেন, সাধে কি আর বলছি ঘুষ দিয়েছে! তা নাকুর বদলে নরুণ নিয়ে ফিরলি তুই! কাসিখানা তো দেখছি ভারী পাথরকুচি!
তা ভারী আছে। আর কথাবার্তাও ভাল। বাড়িসুদ্ধ গিন্নীরা যেন আমায় হাতে রাখে কি মাথায় রাখে! সে তুমি যাই বলো বামুন-বৌদি, কুটুম তোমার খুব ভাল হয়েছে। অমন কুটুমের সঙ্গে অসসরস করলে তুমিই ঠকবে। তবে গিয়ে বৌ তোমার মিছে বলব না, একটু বাচাল।
বাচাল!
সহসা যেন পাথরে পরিণত হলেন বাঁড়ুয্যে-গিন্নী।
বাচাল! আর সে কথা এতক্ষণ বলছিস না তুই? হবেই তো, বাচাল হবে না? বাপের চালচলন তো বুঝতেই পারছি, পয়সার গরমে ধরাকে সরা দেখেন, মেয়েকে আসকারা দিয়ে ধিঙ্গী অবতার করে তুলেছেন আর কি! আমিও এলোকেশী বামনী, বাচাল বৌকে কেমন করে ঢিট করতে হয় তা আমার জানা আছে!
তা আর জানা থাকবে না? ঠোঁটকাটা নাপিত-বৌ বলে বসে, আরও একটা মানুষের মেয়েকে ঘরে পুরে কী হালে রেখেছ তা তো আর কারু অজানা নেই। তা এই বৌকে আর তুমি ঢিট করছ কখন, বেটার তো আবার বে দিচ্ছ!
নাপিত-বৌয়ের কথায় এবার একটু ভয় খান বাঁড়ুয্যে-গিন্নী এলোকেশী। ও যা মুখফোড়, পাড়ায় পাড়ায় সমস্ত রটিয়ে বেড়াবে, হাটে হাঁড়ি ভাঙবে। বড়য্যের বৌ আনতে পাঠিয়েছিল, বড়মানুষ বেহাই মেয়ে পাঠায় নি, এ খবর রাষ্ট্র হলে কি আর মাথা হেঁট হবার কিছু বাকী থাকবে? নাপিতবৌকে চটানেটো ঠিক হয়নি চটায় না ওকে কেউ, চটাতে সাহসই করে না। সকলের হাড়ির খবর রাখে, সকল ঘরে যাতায়াত করে, আর সময়-অসময়ে নাপিত-বৌয়ের শরণ না নিলে কারুর চলে না। যেমন তেজী তেমনি বিশ্বাসী, আর তেমনি জোরমন্ত ডাকাবুকো। একটা মদ্দজোয়ানের ধাকা ধরে নাপিত-বৌ। বৌ মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বাপেরবাড়ি করতে নাপিত-বৌ এ গ্রামের ভরসাস্থল। চৈতন্য হয় সেটা এবার, তাই আর একবার সেঁতো হাসি হাসেন বাঁড়ুয্যে গিন্নী, তবে আর কি, যা দেশ-রাজ্যে রাষ্ট্র করে আয়, আমি আবার বিয়ে দিচ্ছি বেটার! মরণ আর কি, গা জ্বলে যায়! কিন্তু তুই-ই বল, রাগে মাথায় রক্ত চড়ে ওঠে কিনা। যাক বিশদ বৃত্তান্ত বল্ দিকি, তুই কি বললি, তারা বলল, মেয়েই বা–
