ভুবনেশ্বরী কিন্তু দাওয়ায় উঠে দালানের চৌকাঠ পার হবার সাহস সঞ্চয় করতে পারে না, উঠোনের পৈঠেতেই বসে পড়ে বলে, আমার হাত পা উঠছে না বড়বৌ, তুমি দেখ গে।
শোন কথা! তুমি এখেনে এমন করে বসে থাকলে চলবে কেন? ভীমের গদা বুকে পড়লেও তো বুক পেতে নিতে হবে ঠাকুরঝি! কণ্ঠস্বর সহানুভূতিতে কোমল হয়ে আসে নিভাননীর, চল, আমি তোমায় আগলে দাঁড়াই গে।
ভয় যতই তীব্র হোক, ভয়ের আকর্ষণটাও যে ততোধিক তীব্র। কাজে কাজেই উঠে পড়ে ভুবনেশ্বরী। আস্তে আস্তে দাওয়ায় উঠে দালানের কোণের দিকের একটা জানলায় উঁকি মারে। নিভাননী অবশ্য দরজায় পৌঁচেছে।
কিন্তু ব্যাপারটা কি হল?
ভালমন্দের মত তো কিছু দেখাচ্ছে না। অন্তত সত্যর শ্বশুরবাড়ি থেকে আগতা হৃষ্টপুষ্টাঙ্গী রমণীটির হিসেবে তো মনে হচ্ছে পুরোপুরি ভালই।
হয় কোনও দাসী, নচেৎ নাপিতমেয়ে, এ ছাড়া আর কে-ই বা আসবে? যেই হোক, আপাতত তার আদরটা প্রায় মহারাণীর মত। জল খাওয়াতে বসানো হয়েছে তাকে, চারিদিকে ঘিরে বসে আছেন দীনতারিণী, কাশীশ্বরী, মোক্ষদা, শিবজায়া, ছোটজেঠী, তা ছাড়া আশ্রিতা প্রতিপালিতার ঝাঁক।
সকলের মুখের চেহারাতেই একটি ভক্তি-বিনম্র সমীহ ভাব।
আর মধ্যমণিটির মুখচ্ছবিতে অহংবোধের দৃপ্ত মহিমা। তার সামনে কানাউঁচু বড়সড় পাথরের খোরা, তার মধ্যস্থলে মন্দিরাকৃতি শুকনো চিড়ের স্থূপ, পাশে একটি উঁচু কালো পাথরবাটি ভর্তি দই এবং সন্নিকটে একখানি অঙট কলার পাতে স্থাপিত ছড়াখানেক চাটিম কলা, গণ্ডাচারেক দেদো মণ্ডা, একরাশ ফেনী বাতাসা এবং ক্ষীরের ছাঁচ, চন্দ্রপুলি, নারকেলনাড়, বেসননাড়ু ইত্যাদি বেশ একটি বড়গোছের সম্ভার।
অর্থাৎ ঘরে সংসারে যত প্রকারের মিষ্ট বস্তু ছিল, সব কিছু দিয়ে তুষ্ট করার চেষ্টা চলছে কুটুমবাড়ির নাপতিনীকে।
হ্যাঁ, নাপতিনীই।
মালুম হয় দীনতারিণীর কথাতেই। নিতান্ত কাকুতিভরা কণ্ঠে বলছেন তিনি, আর দুটোখানি চিড়ে দিই নাও নাপিত বেয়ান, আর বেয়ানই বা কেন, হিসেবে তো মেয়ে সুবাদ হচ্ছ, মেয়ে বলি। আর দুটো চিড়ে একেবারে মেখে জব্দ করে নাও মেয়ে, দইয়ে ভিজলে ও আর কটা? সেই কোন ভোরে বেরিয়েছে। রোদে একেবারে মুখচোখ সিটিয়ে গেছে।
ভুবনেশ্বরী বোধ করি বিহ্বলতার বশেই জানলা ছাড়তে ভুলে গিয়েছিল, নিষ্পলক নেত্রে ঠায় তাকিয়েছিল সেই দেবমূর্তি আর তার নৈবেদ্যের দিকে, হঠাৎ একসময় পিছনে একটা মৃদুকণ্ঠের আভাসে চমকে ফিরে তাকাল, পিছনে সারদা।
এখানে দাঁড়িয়ে কেন মেজখুড়িমা?
দাঁড়িয়ে কেন? এমনি। ঘরে ঢুকতে পা উঠছে না। ও কেন এসেছে বড়বৌমা?
কেন আর? সারদা অস্ফুট ম্রিয়মাণ গলায় বলে, এসেছে মস্ত উদ্দেশ্য নিয়ে। বৌ নিয়ে যাবার বার্তা পাঠিয়েছেন তাঁরা। আশ্বিন পড়তেই নিয়ে যাবেন বলছে।
আশ্বিন পড়তেই! বলো কি বড়বৌমা! এই কদিন বাদ?
তাই তো বলছে। একেবারে নাকি পুরুত দিয়ে দিন দেখিয়ে পাঠিয়েছেন তাঁরা।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে ভুবনেশ্বরীর বুক ছিঁড়ে একটা প্রশ্ন ওঠে, সত্য টের পেয়েছে?
তা আর পায় নি?
কি করছে?
তা তো জানি না খুড়িমা। ভয়ে ভয়ে ঘরে গিয়ে সেঁধিয়েছে বোধ হয়!
আমি যে বাড়ি ছিলাম না–এটা কেউ টের পেয়েছে?
এবার সারদা একটু সত্য গোপন করে, বলতে পারছি না মেজখুড়িমা, বোধ হয় পান নি কেউ। গোলেমালে ব্যস্ত আছেন সবাই।
সত্য কথা বলা চলে না।
কারণ অনুপস্থিত ব্যক্তি সম্পর্কে যে ধরনের আলোচনা হয়, সেটা যথাযথ প্রকাশ করলে লাগিয়ে দেওয়া ভাঙিয়ে দেওয়ার পর্যায়ে পড়ে।
ব্যস্ত থাকলেই বাঁচন ভুবনেশ্বরী আর একটা দীর্ঘশ্বাস-বাক্যে উচ্চারণ করে। কিন্তু এখন হঠাৎ এ কি বিপদ বড়বৌমা!
বড়বৌমা কিছু বলার আগেই নাপিত-মেয়ের মাজা-ঘষা চাচা গলাটি ধ্বনিত হয়, বাপ বাড়ি নেই বলে মত দিতে ছুতো করছ কেন মাউইমা? আমি তো আর আজই নে যাচ্ছি না। আমাকে এ মাসের কটা দিন এখেনে থেকে একেবারে আশ্বিনের তেসরা তারিখে নিয়ে যেতে বলেছে।
১৭. জগতের সমস্ত বিস্ময়
জগতের সমস্ত বিস্ময়কে কি একটিমাত্র প্রশ্নের মধ্যে প্রকাশ করা যায়? সেই একটি প্রশ্নের মধ্যেই ধিক্কার দেওয়া যায় জগতের সর্বাপেক্ষা অসহনীয় ধৃষ্টতাকে?
আরো কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব কিনা জানি না, কিন্তু দেখা গেল অন্তত একজনের পক্ষে তা সম্ভব হয়েছে!
বারুইপুরে বায্যে-গিন্নীর একটিমাত্র ছোট্ট প্রশ্নে ধ্বনিত হল বিশ্বের সমস্ত বিস্ময় আর সমস্ত ধিক্কার-বাণী।
পাঠাল না!
না।
পথশ্রান্ত নাপিত-বৌ শুধু এই একটি শব্দ উচ্চারণ করে পা ছড়িয়ে বসল।
প্রথম বড় ঢেউয়ের পরবর্তী আর একটি ছোট ঢেউ।
তুই হার মেনে ফিরে এলি?
এবার বিস্ময় আর ধিক্কারের পালা নাপিত-বৌয়ের, শোনো কথা! তাদের মেয়ে, তারা পাঠালে না, আমি কি তাদের ঘর থেকে মেয়ে কেড়ে নিয়ে আসব?
এবার বাড়ূয্যে-গিন্নী নিজেই পা ছড়িয়ে বসলেন, দুই ভ্রূ এক জায়গায় এনে জড়ো করার চেষ্টা করতে করতে বললেন, ছুতোটা কী দেখাল?
শোনো কথা! ছুতো আবার কিসের, সোজাসুজি মুখের ওপর ঝাড়া জবাব, এখন পাঠাব না।
নাপিত-বৌ আঁচল খুলে পানের কৌটো বার করে।
এক্ষুনি মুখে পান ভরিস নে নাপিত-বৌ, চোদ্দবার উঠবি পিক ফেলতে। আমার কথাগুলোর আগে উত্তর দে। বলি ছুতো যুক্তি কিছু না–শুধু পাঠাব না?
