পড় তো শুনি?
সুকুমারী একটু শঙ্কিত দৃষ্টিতে বড়জায়ের দিকে তাকায়। নিভাননীর সামনে পড়া? তিনি এটাকে কোন আলোয় নেবেন? গুরুজনের প্রতি অসম্মাননা? কিন্তু নিভাননীই অভয় দেয়, নাও, পড়ই শুনি। হাবা কালা কানা অন্ধদের জ্ঞান দাও।
অতএব সুকুমারী একটু কেশে একটু ইতস্তত করে পড়ে–
এসো মা জননী দুর্গে ত্রিনয়নী,
এসো এসো শিবজায়া,
সন্তানের ঘরে এসো দয়া করে,
মহেশ্বরী মহামায়া।
তোমারে হেরিতে আশাভরা চিতে
রয়েছি আকুল হয়ে,
আসিবে মা তুমি এই মর্ত্যভূমি,
পুত্র কন্যা সাথে লয়ে।
একটি বৎসর শূন্য আছে ঘর
দুঃখে আছি নিরবধি,
দিবস রজনী কাটে দিন গুনি,
কবে দিন দেবে—
ওমা এ কি, শেষ নেই যে? সুকুমারী অবাক হয়ে বলে, এ স্তোত্তর কোথায় পেলে ঠাকুরঝি?
আর বল কেন? ভুবনেশ্বরী কুণ্ঠা দমন করতে হাতপাখাখানা তুলে জোরে জোরে নাড়তে নাড়তে বলে, সত্যর কীত্তি। লিখছিল–কুমোর এসে কাঠামো বাধছে শুনে ফেলে দিয়ে ছুটে গেল। আমি কুড়িয়ে তুলে–
তা নকল করেছে কোথা থেকে?
সকৌতূহল প্রশ্ন করে সুকুমারী।
নকল করেছে তা মনে হল না ছোটবৌ, ভুবনেশ্বরী যাকে বলে, দোনামোনা সেই সুরে বলে, ও মুখপুড়ী নিয্যস নিজেই বেঁধেছে।
কি যে বল ঠাকুরঝি, সুকুমারীর কণ্ঠে অবিশ্বাস, নিজে বাঁধবে কি? অতটুকু মেয়ে এসব কথার মানে জানে?
জানে না কি করে বলি বৌ, মুখপুড়ী লুকিয়ে লুকিয়ে তোমার ননদাইয়ের কবরেজী শাস্তরের বইগুলো পর্যন্ত টেনে পড়তে বসে।
সে কথা আলাদা। পারুক না পারুক আম্বা করে বসে কিন্তু ছন্দ বেঁধে আখর মিলিয়ে এত বড় স্তোত্তর তৈরি কি সোজা নাকি?
ছোটবৌয়ের এই অবিশ্বাসের সুর ভুবনেশ্বরীকে ঈষৎ থতমত করছিল, কিন্তু মেঘ উড়িয়ে দিল নিভাননী, যে নিজে এতক্ষণ মুখে আষাঢ়ের মেঘ নামিয়ে ছোটজায়ের অবলীলাক্রমে’র দিকে তাকিয়ে দিল। সুকুমারীর কথা শেষ হতেই হাত নেড়ে বলে উঠল নিভাননী, তা এতে আশ্চয্যি হবার কি আছে ছোটবৌ? ঠাকুরঝি মনে বেদনা পাবে তাই রেখে-ঢেকে বলা, ঠাকুরঝির ওই মেয়েটিই কি সোজা? কতদিন আগে ভোদার নামে ছড়া বাঁধে নি ও? এ নয় মা-দুগগার নামে বেঁধেছে। তবে ভাবনার কথা বটে। ঠাকুর-জামাইয়ের দবদবায় আমরা দশজনা নয় মুখে চাবি দিয়ে আছি, কিন্তু কুটুম তো তা মানবে না? একবার টের পেলে–
কথা শেষ হল না, মোক্ষদার হন্তদন্ত মূর্তি দেখা গেল খোলা দরজার সামনে। চলে এস মেজবৌমা, ঝটপট চলে এস, ওদিকে এক কাণ্ড হয়েছে।
কাণ্ড হয়েছে!
কী সেই কাণ্ড!
ভুবনেশ্বরীর মুখে কথা যোগায় না, হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। সুকুমারী তো আগেই ঘোমটা টেনে বসেছে। তবে নিভাননীর কথা আলাদা, এ বাড়ির গিন্নীর পদটা তার, এগিয়ে গিয়ে বলে, কিসের কাণ্ড মাউইমা?
আর বলো না বাছা। সইয়ের বাড়িতে বসেছি কি না-বসেছি, রাখলা ছোঁড়া রণপা নিয়ে গিয়ে হাজির। কি সমাচার? না শীগগির চল, সত্যর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক এসেছে। ভাগ্যিস দিদিকে বলে এসেছিলাম সইয়ের বাড়ি যাচ্ছি।
নাঃ, মোক্ষদার কথা শেষ হতে পারে না, সহসা ভুবনেশ্বরী ডুকরে কেঁদে উঠেছে।
ওমা ও কি। কাঁদছ কেন মেজবৌমা? চল চল, অপিক্ষের সময় নেই। কিন্তু চলবে কে?
ভুবনেশ্বরীর শুধু পা দুখানাই নয়, সমস্ত লোমকূপগুলো পর্যন্ত যে অবশ হয়ে গেছে।
সত্যর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক!
অতএব আর সন্দেহ কি যে সমস্ত জানাজানি হয়ে গেছে। তা ছাড়া আর কি অর্থ থাকতে পারে এরকম বিনা নোটিসে হঠাৎ শ্বশুরবাড়ির লোক আসার? কোথায় কে ঘরশত্রু বিভীষণ আছে সে গিয়ে পলাগিয়ে দিয়েছে সত্যর এই মারাত্মক অপরাধের আর সত্যর বাপের ওই ভয়ানক দুঃসাহসের খবর। এর পর? এর পর আর কি ভুবনেশ্বরী ভাবতে পারে না, শুধু ডুকরোনোর মাত্রাটা বাড়িয়ে বলে ওঠে, ওগো পিসীমা গো, তুমি আমাকে এখানে মেরে ফেলে রেখে যাও, বাড়ি অবধি যেতে পারবো না আমি।
আহা অধোয্য হচ্ছ কেন মেজবৌমা? মোক্ষদা দেহটাকে প্রায় উলটোমুখো ঘুরিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন, এখনকি অধোয্যের সময়? এক্ষুনি না যেতে পারো একটু সামলে নিয়ে ভেজের সঙ্গে যেও, আমি চললাম। পা তো আমারও কাঁপছে, কে জানে কী বার্তা নিজে এসেছে! তা বলে কোত্তব্য ত্যাগ করা চলে না। আচ্ছা, আমি এগোলাম।
‘রণপা’ ব্যতীতই রণপায়ের বেগে অদৃশ্য হয়ে যান মোক্ষদা।
.
ভুবনেশ্বরী যখন নিভাননীর সঙ্গে সন্তর্পণে খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকল, তখন বাড়ির চেহারা নিস্পন্দ।
যেন এইমাত্র কেউ একটা শোকসংবাদ পাঠিয়েছে।
তা হলে?
নিভাননী ফিসফিস করে বলে, বাড়ি এমন থমথমে কেন বল তো ঠাকুরঝি? মন তো ভাল নিচ্ছে না। আর পোড়া মনের স্বধৰ্ম্মই তো কু-কথা গাওয়া। জামাইয়ের কিছু দুঃসংবাদ নেই তো?
আধমরা মানুষটাকে চৌদ্দ আনা মেরে নিভাননী হৃষ্টচিত্তে উঠোনে পা দিয়ে এদিক ওদিক তাকায়।
দালানে কারা যেন নিঃশব্দে জটলা করে বসে রয়েছে, ঘোমটা দিয়ে বোধ করি সারদা ঘোরাঘুরি করছে, ছোট ছেলেমেয়েগুলোর পাত্তা নেই।
এসো ঠাকুরঝি উঠে এসো, নিয়তি যা করবে তা সইতেই হবে, এখন দেখি গে চল কার কি হল।
নিভাননী নিজে বুঝতে পারুক না-পারুক, তার অবচেতন মনের একটা ফটোগ্রাফ নিতে পারলে সেখানে একটা প্রত্যাশার ছবি দেখতে পাওয়া যেত। জামাইটির কিছু হলেই যেন প্রত্যাশাটি পূর্ণ হয়। নন্দাইয়ের দবদবা সেই গহন গভীরে যে একটি অনির্বাণ দাহ সৃষ্টি করে রেখেছে, সেটাও বুঝি কিঞ্চিৎ শীতল হয় এমন একটা কিছু হলে।
