তা কাজটা কি?
এবার ভুবনেশ্বরী থতমত খায়, কাজটা কি সেটা নিভাননীর সামনে বলা সঙ্গত কিনা এতক্ষণে খেয়াল হয়। আসলে এসেছে সে সুকুমারীর কাছে একখণ্ড লেখা কাগজ নিয়ে, যে কাগজের হিজিবিজি রেখাগুলো এক দুর্বোধ্য কুটি হেনে তার দিকে ক্রমাগত তাকিয়ে আছে আজ কদিন থেকে।
সত্যবতীর লেখা একখণ্ড কাগজ।
জিনিসটা ভুবনেশ্বরীকে ভাবিয়ে তুলেছে। ঘরের কোণে ঘাড় গুঁজে লিখছিল সত্যবতী, হঠাৎ বুঝি দালানে কুমোর এল এই বার্তা পেয়ে ছুটে চলে গিয়েছিল নেড়ু পুণ্যি আরও কুচোকাঁচাঁদের সঙ্গে, কাগজখানা চৌকিতে পাতা শেতলপাটির তলায় খুঁজে রেখে। ভুবনেশ্বরী কৌতূহলপরবশ হয়ে পাটিটি ঈষৎ উঁচু করে তুলে দেখতে গিয়েছিল কেমন আখর সত্যর হাতের কিন্তু দেখতে গিয়েই স্তম্ভিত হয়ে গেল, গোটা গোটা আখরে ঠিক পদ্যর ছাঁদে এ কি লিখছিল সত্য?
নকল করছিল?
কিন্তু নকল করবে যদি তো সামনে বই খোলা কই? সর্বনেশে মেয়ে নিজেই পয়ার বাঁধছে নাকি? ভয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল ভুবনেশ্বরীর, কিন্তু কাকে দেখিয়ে রহস্যের মীমাংসা হবে?
রামকালীকে তার বড় ভয়।
রাসুকে বলতে গেলে পাঁচকান হবার সম্ভাবনা। তাছাড়া বাড়িতে আর যারা লিখন-পঠনক্ষম, সকলেই তো ভুবনেশ্বরীর শ্বশুর ভাসুর, ভেবে আর কুলকিনারা পাচ্ছিল না বেচারা। তারপর সহসাই মনে পড়ল সুকুমারীর কথা।
সুকুমারী পড়তে জানে।
বামালটা সরিয়ে ফেলে সুকুমারীর কাছে আসার তাল খুঁজছিল সে দু-তিন দিন থেকে। আড়চোখে দেখেছে, সত্য কখন একসময় শেতলপাটি উল্টে লণ্ডভণ্ড করে খোজাখুঁজি করেছে, আবার ‘ধুত্তোর’ বলে নতুন কাগজ নিয়ে বসেছে! সে কাগজে আর কোন্ রহস্যের রেখা এঁকেছে সত্য, সে কথা ভুবনেশ্বরীর অজ্ঞাত, জিজ্ঞেস করতে গেলে সত্য মারমুখী হয়। বাড়ির লোকের জ্বালায় যে একদণ্ড নিরিবিলিতে বসবার জো নেই তার, এ কথা স্পষ্ট গলায় ঘোষণা করতে বাধে না সত্যবতীর।
অতএব এই টুকরোটুকুই ভরসা।
ঘাড় গুঁজে গুঁজে কি এত লেখে সে জানবার জন্যে মায়ের মন নানা কারণেই ব্যাকুল হয়। ব্যাকুল হয় কৌতূহলে, ব্যাকুল হয় আশঙ্কায়।
সত্যকে যে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে!
হায়, সত্য যদি ভুবনেশ্বরীর মেয়ে না হয়ে ছেলে হত! বাপের উপযুক্তই হত। কিন্তু ভুবনেশ্বরীর কপালে এক তরকারি নুনে বিষ। একটা সন্তান, তা মেয়ে!
কি গো ঠাকুরঝি, বাক্যি-ওক্যি নেই কেন? নিভাননী অবাক হয়। এত কুণ্ঠা কিসের?
গরীব ননদ নয় যে আশঙ্কা করবে ধার চাইতে এসেছে ভাজের কাছে।
আর চেপে রাখা চলে না, ঢোক গিলে বলতেই হয় ভুবনেশ্বরীকে– এসেছিলাম ছোট বৌয়ের কাছে, একটা কাগজ পড়ানোর দরকার ছিল।
কাগজ! নিভাননী আকাশ থেকে পড়ে, কাগজ কিসের? কোন পাট্টা কোবালা নাকি?
না না,ওমা সে কি? সে সব আমি কোথায় পাব? এ ইয়ে–একটু চিঠির মতন।
চিঠির মতন! সেটা আবার কি বস্তু ঠাকুরঝি? আর সে পড়ানোর লোক তোমার বাড়ি হাঁটকে একটা পুরুষ বেটাছেলে কাউকে পেলে না, সাতপাড়া ডিঙিয়ে একটা মেয়েমাগীর কাছে পড়তে এলে? কিছু গোপন বুঝি?
সুকুমারী গিয়েছে ডাব কাটতে। ভুবনেশ্বরী অসহায় ভাবে একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে সহসাই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলে, কি যে বলো বড়বৌ, গোপন আবার কি? এই সত্যর একটু লেখা। বলি অষ্টপ্রহর কি এত লেখে বসে দেখি তো! বাড়িতে কাউকে দেখালে রসাতল করবে তো মেয়ে?
নিভাননীর কানে আসতে বাকী ছিল না–সত্য লেখাপড়া করছে, তবু অজ্ঞের ভানে বলে, বল কি ঠাকুরঝি, সত্যও কি তার ছোটমামীর মতন লেখাপড়া করছে? কালে কালে হল কি? বলি মেয়ে কি তোমার শামলা এঁটে কাছারী যাবে? সবাই তো তোমার ভাইদের মতন ভালমানুষ নয় যে, যা ইচ্ছে তাই চলে যাবে, শ্বশুররা এ খবর টের পেলে?
কি করব বড়বৌ, জানোই তো তোমাদের ননদাইকে কেমন একজেদা? মেয়ে বললে পড়ব তো পড়ুক। মেয়ে আকাশের চাঁদ চাইলে চাঁদ পেড়ে আনতে যাবেন এমন মানুষ। তাই তো ভাবলাম, কি লেখে বসে দেখি! ছেলেবুদ্ধি!
বড় একটা পাথরবাটিতে ডাবের জল নিয়ে এসে দাঁড়াল সুকুমারী।
ও বাবা কত! এত পারব না ছোটবৌ, তুমি একটু ঢেলে নাও। বলে ভুবনেশ্বরী।
খাও না, রোদে এসেছ।
তা হোক, অতটা নয় বাপু।
অগত্যাই খানিকটা ঢালাঢলি করতে হল সুকুমারীকে। ভুবনেশ্বরী ইত্যবসরে ব্যাপারটাকে লঘুর পর্যায়ে ফেলবার বুদ্ধিটা এঁচে নিয়েছে, তাই ডাবের জলে চুমুক দিতে দিতে ঝট করে বাঁ হাতের মুঠো থেকে কাগজের টুকরোটা এগিয়ে দিয়ে বলে, এই নাও বিদ্যেবতী বৌ, পড় দিকিন এটা! আমরা তো চোখ থাকতে অন্ধ!
জন্ম জন্ম যেন অন্ধই থাকি বাবা- নিভাননী বিষমুখে বলে, যে জাতের দশহাত কাপড়ে কাছা নেই, তাদের আবার এত চোখ-কান ফোঁটার দরকার কি? বলে, কিন্তু জিনিসটার ওপর এমন ভাবে হুমড়ে পড়ে, দেখে মনে হয় চোখ-কান থাকলে মুহূর্তে গ্রাস করে ফেলত। ভুবনেশ্বরী যাই বলুক, জিনিসটায় যেন রহস্যের গন্ধ।
সুকুমারী কাগজখানা উল্টে-পাল্টে বলে, কি এ?
কি তা আমি বলব কেন? তুমি বলো? কৌতুকের হাসি হাসে ভুবনেশ্বরী।
একটা তো ত্রিপদী ছন্দের দেবীবন্দনা দেখছি, কার লেখা? খুব ভাল হাতের লেখা তো?
ত্রিপদী ছন্দ শব্দটা বুদ্ধিগ্রাহ্য নয়, কিন্তু দেবীবন্দনা কথাটার অর্থ জানা, তাই ভুবনেশ্বরীর বুক থেকে যেন একটা পাহাড় নেমে যায়, তবে জিনিসটা দোষণীয় নয়।
