এই দেখ কাজের গুরু কামাই, নিভাননী নিচু গলায় বলে,কে আবার এখন বেড়াতে এল কাজ পণ্ড করতে! নে ছোট বৌ, ওঠ, দুয়োর খোল্।
সুকুমারীর অবশ্য মনোভাবটা ঠিক বড় জায়ের সমর্থক নয়, একঘেয়ে কাজ করতে করতে বাইরের হাওয়া একটু ভালই লাগে তার। নিভাননী যদি একটু গল্প-গাছা করতে জানে, মুখ বুজে খালি কাজ আর কাজ।
দরজা খুলেই সুকুমারী উল্লাসধ্বনি করে ওঠে, ওমা কি আশ্চর্য, পুবের সূয্যি কি পশ্চিমে উঠেছে আজ, না যার মুখ কখনও দেখি নি তার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছি?
এ হেন সংলাপে নিভাননীরও ব্যাজার মুখ কৌতূহলে সরস হয়, সে মুখ বাড়িয়ে বলে, কে এলো গো, কার সঙ্গে এত রসের কথা?
এই যে ডুমুরের ফুল, ঠাকুরঝি। বলে সুকুমারী তাড়াতাড়ি ননদের পা ধোবার জল আনতে ছোটে। ভুবনেশ্বরী মুখের ঘোমটা নামিয়ে দাওয়ায় বসে পড়ে ধুলো পা ঝুলিয়ে। ভাদ্দরের কড়া রোদে তার ফর্সা মুখটা লাল-টকটকে হয়ে উঠেছে, ঘোমটা দেওয়ার দরুন চুলের গোড়ায় আর গলার খাঁজে ঘাম গড়াচ্ছে।
এমন করে ভররোদে হেঁটে আসা ভুবনেশ্বরীর পক্ষে সত্যিই অভাবনীয় ঘটনা। একে তো আসাই তার কম, তাছাড়া যদি আসার বাসনা প্রকাশ করে, পাকি করে পাঠিয়ে দেন রামকালী। যদিও এর জন্যে বাড়ির আর পাঁচজন ঠেস্-টিটকারি দিতে ছাড়ে না, পাড়ার সমবয়সী বৌরা বলে ‘বাদশার বেগম’, তবু রামকালীর নির্দেশ মেনে চলতেই হয়।
কিন্তু আজ ব্যাপারটা কি?
পা ধোবার জল আর গামছা এগিয়ে দিয়ে একখানা ঝালর-বসানো হাতপাখা নিয়ে ননদকে বাতাস করতে থাকে সুকুমারী। একে তো গুরুজন, তায় আবার বড়লোকের ঘরনী।
কার সঙ্গে এলে? নিভাননী প্রশ্ন করে।
ভুবনেশ্বরী কিন্তু সে কথার উত্তরের আগেই বলে ওঠে, পাখায় ঝালর বসিয়েছে কে গো?
কে আবার, ছোটগিন্নি! নিভাননী অগ্রাহ্যে মুখ বাঁকিয়ে বলে, রাতদিন যিনি সংসারের সব্বতাতে বাহার কাটছেন!
সুকুমারীর মুখটা চুন হয়ে যায়, ভুবনেশ্বরী তাড়াতাড়ি বলে, তা বাহার কাটা তো ভালই, কেমন খাসা দেখাচ্ছে!
হোক গে, নিভাননী আর একবার মুখ বাঁকায়, এখন অবধি তো গাই দোয়াতে শিখল না, কুলো পাছড়াতে পারল না। পেঁকিশালে গিয়ে যা রঙ্গ, যদি দেখ তো বুঝবে। না পারে ‘পাড়’ দিতে, না পারে হাতে হাতে নেড়ে দিতে, পাড়াপড়শীকে তোয়াজ করে ডেকে এনে কাজ উদ্ধার করতে হয়। আসল কাজ চুলোয় দিয়ে ভাঁড়ারের হাঁড়ি-কলসীর গায়ে চিত্তির কেটে, শিকের দড়িতে কড়ির থোপনা গেঁথে, আর পাখার ঘাড়ে শালুর ঝালর ঝুলিয়ে গেরস্তর সগৃগের সিঁড়ি হবে!
ভুবনেশ্বরী দেখে হিতে বিপরীত, এই সূত্র ধরে নিভাননী আরও কোথায় গিয়ে পৌঁছবে কে জানে! তা হলে তো আসল কাজই মাটি। ছোট ভাজকেই যে আজ তার দরকার। তবু ভুবনেশ্বরী আবার একটা ভুল চালই করে বসে। বসে এইজন্যেই যে নিচুতলাদের নিন্দাবাদ করে ওপরওয়ালাদের প্রসন্ন রাখার যে চিরন্তন কৌশল, সে কৌশলটা তার ভাল আয়ত্তে নেই বলেই। নিজের বাড়িতে তো সেই ভয়ে সে কথাই কয় না সহজে। দেখে ঘোমটা আর নীরবতা অনেক বিপদের রক্ষক। কিন্তু এটা নাকি ভুবনেশ্বরীর বাপের বাড়ি, তাই সাহসে ভর করে বলে বসে, কেন বাপু, এই তো বেশ ডাল ভাজছে। মুড়ি ভাজতেও পারে। অত বড় একখানা শহরের মেয়ে, আর কত পারবে?
তা বটে! নিভাননী একটি উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলে, শহর কখনও চোখে দেখিনি, তার মম্মও জানি নে। ঘর-সংসারই বুঝি, আর বুঝি মেয়েমানুষের সেখানে হেরে গেলে লজ্জায় মাথা কাটা যায়… বসো একটু, গুড়ের পানা করে আনি, রোদে এসেছ।
রোদের সময় ঘরে কিছু না থাক, আখের গুড় জলে গুলে তাতে পাতিলেবুর রস মিশিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ এদিকে আছে, নিভাননীর মগজে সেই সহজটাই আসে। কিন্তু সুকুমারীর ওই গুড়ের পানা জিনিসটায় বিষম বিতৃষ্ণা, তাই সে বড়জায়ের ওপর কথা-কওয়া-রূপ অসমসাহসিক কাজটাও করে বসে ননদের প্রতি সমীহে। সসংকোচে বলে ফেলে, কেন দিদি, মিছরি নারকেল গাছের ডাব তো পাড়ানো রয়েছে ঘরে!
রয়েছে সেটা নিভাননীর মনে ছিল না, কিন্তু মনে পড়িয়ে দেওয়ায় অপদস্থের একশেষ হয়ে যায় সে। কে জানে ননদ মনে করল কিনা, ইচ্ছে করেই ডাবের কথাটা বিস্মৃত হয়েছে সে। এই ছোট বৌটা দেখতে ভালমানুষ হলে কি হবে, টিপে ডান। কিন্তু এক্ষেত্রে নিভাননীকে মনের রাগ মনে চেপে হাসতেই হয়। হেসে বলতেই হয়, অই দেখ, ভাগ্যিস মনে করলি ছোটবৌ! আমার অমনিতর ভুলো মনই হয়েছে আজকাল, বুঝলে ঠাকুরঝি! ঠাকুর-জামাইয়ের কাছ থেকে এবার একটা সিঁতিশক্তির ওষুধ খেতে হবে। যা তবে ছোটবৌ, দুটো ডাব কেটে আন্ গে।
আহা, কেন ব্যস্ত হচ্ছ বড়বৌ? ভুবনেশ্বরী অকারণে গলা নামিয়ে বলে, আমি এসেছি বিশেষ একটা দরকারে পড়ে, এখুনি চলে যেতে হবে।
ওমা শোন কথা! এখুনি চলে যেতে হবে কি গো? কি এমন বিশেষ দরকার পড়ল? এলেই বা কার সঙ্গে, যাবেই বা কার সঙ্গে? একা নাকি?
একা? ভুবনেশ্বরী হেসে ওঠে, সে আর এ কাঠামোয় হবে না। এসেছি পিসশাশুড়ির সঙ্গে। দুয়োর থেকে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গেলেন, আবার ফিরতি মুখে ডেকে নিয়ে যাবেন। চুপিসারে চলে এসেছি, ঘরে কেউ জানে না।
ঠাকুরজামাই? নিভাননী রহস্যের হাসি হাসে।
ভুবনেশ্বরী নিভাননীর ঠাকুরজামাইয়ের প্রসঙ্গেই মাথার কাপড়টা একটু টেনে বলে, তিনি তো ভিন গাঁয়ে গেছেন রুগী দেখতে, নইলে আর এত বুকের পাটা! নিতান্ত কারে পড়েই আসা। পিসশাশুড়ী সইয়ের বাড়ি আসছেন শুনে খুব কাকুতি করলাম, বলি, ওই পথ দিযেই তো যাবে পিসীমা! তা সেদিকে ভাল আছেন মানুষটা, কেউ শরণ নিলে তাকে বুক দিয়ে আগলান।
