রামকালী সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারকয়েক দেখে কোনও মন্তব্য না করে শান্তভাবে বলেন, কলকাতায় অনেক মেয়ে লেখাপড়া করছে, এ কথা তোমায় কে বললে?
ছোটমামী।
তাই নাকি? তিনি কোথা থেকে–ও তিনি যে কলকাতারই মেয়ে! তাই না?
এ উদ্দেশটা ভুবনেশ্বরীকে। কিন্তু ভুবনেশ্বরী তো আর কত বড় মেয়ের সামনে গলা খুলে কথা বলতে পারে না, ঘাড় কাত করে সায় দেয়।
তা তিনি জানেন লেখাপড়া? তোমার মামী?
একটু একটু জানেন। বেশি করে কবে আর শিখতে পেল বেচারা? শুধু বলছিল, একজন মেম নাকি দেশী ইস্কুল খুলেছে, আর একজন সায়েব বিলিতী ইস্কুল খুলে দিয়েছে, কলকাতার মেয়েরা আর মুখ্যু থাকবে না।
মেয়েদের লেখাপড়া শিখে লাভ কি? তারা কি নায়েব গোমস্তা হবে? সকৌতুক হাস্যে মেয়েকে প্রশ্ন করেন রামকালী।
এবার সত্যবতীর তেজের পালা। সব সইতে পারে সে, সইতে পারে না ব্যঙ্গ।
নায়েব গোমস্তা হতে যাবে কেন? লেখাপড়া শিখে নিজে নিজে রামায়ণ মহাভারত পুরাণ বই টই পড়তে পারে তো? কবে কথকঠাকুর কোথায় পড়বেন বলে অপিক্ষে করে থাকতে হয় না।
মেয়ের এই ক্রুদ্ধমূর্তি আর সগর্ব উক্তি কি রামকালীর খুশির খোরাক হয়? তাই আরও একটু উত্তপ্ত করতে চান তাকে?
তা মেয়েমানুষের এত বেদপুরাণ জানবার দরকারই বা কি?
এবার সত্যবতী স্থান পাত্র বিস্মৃত হয়ে নিজ মূর্তি ধরে, এত যদি না দরকারের কথা তো মেয়েমানুষের জন্মাবারই বা দরকার কি, তাই বল তো বাবা শুনি একবার?
মেয়ের এই দুঃসাহসে ভুবনেশ্বরীর বুক থরথর করে, অত বড় মানুষটার মুখে মুখে এতখানি চোপা!
হবে না, হবে না–এ মেয়ের ককখনো শ্বশুরবাড়ি ঘর করা হবে না।
কিন্তু ভুবনেশ্বরীকে চমকে দিয়ে সহসা হেসে ওঠেন রামকালী, বেশ সশব্দেই।
তার পর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি লেখাপড়া শিখতে চাও?
চাই তো, পাচ্ছি কোথায়?
ধরো যদি পাও?
তা হলে রাতদিন লেখাপড়া করব।
অতটা করতে হবে না। নিয়ম করে কিছুক্ষণ পড়লেই হবে। কাল থেকে দুপুরবেলা এই সময় আমার কাছে পড়বে।
পড়বে!
ভুবনেশ্বরী আর কথা না বলে পারে না।
হ্যাঁ, পড়বে লিখবে! পুঁইমেটুলির কালি দিয়ে নয়, সত্যিকার দোয়াত কলমই দেব ওকে।
বাবা!
সত্যর মুখ দিয়ে মাত্র এই দুটি অক্ষর সম্বলিত শব্দটা বেরোয়। আর ভুবনেশ্বরীর দু চোখে শ্রাবণ নামে।
১৬. বসেছে কাব্যপাঠের আসর
বসেছে কাব্যপাঠের আসর।
ঋতুরঙ্গ কাব্য। বর্ষাখণ্ড শেষ করে প্রকৃতিদেবী সবেমাত্র শরৎখণ্ডের মলাটখানি খুলে ধরেছেন, এখনও তার ভিতরের শ্লোক পড়তে বাকী এখনও কাশের বনে বনে শুরু হয় নি শ্বেতচামরের ব্যজনারতি, শুধু ভোরের বাতাসে লেগেছে অকারণ পুলকের স্পন্দন। শুধু আকাশের নীলে দর্পনের স্বচ্ছতা, পাখীদের শিষে উল্লাসের তীক্ষ্ণতা। দেবী অনন্তকাল ধরে একই কাব্য আবৃত্তি করে চলেছেন, শেষ লাইনের পরই আবার গোড়ার লাইন, তবু সে কাব্য পুরনো হয়ে যায় নি, পুরনো হয়ে যায় না। অনন্তকালের মানুষের কাছে বয়ে নিয়ে আসে আশার বাণী, প্রত্যাশার স্বপ্ন, উৎসাহের সুর।
উৎসাহের জোয়ার লেগেছে বাংলার গ্রামে গ্রামে। প্রতীক্ষার উৎসাহ।
মা দুর্গা আসছেন!
আসছেন বাপের বাড়ি। কৈলাস থেকে মর্ত্যলোকে। এ কথা গল্পকথা নয়, বাংলার অন্তরের সত্য বিশ্বাসের কথা। বৎসরান্তে মা মাতৃরূপে আর কন্যারূপের সমন্বয় সাধন করে নেমে আসেন মাটি-মায়ের কোলে, এসে মায়ের কাছে সুখদুঃখের কথা কন, বিদায়কালে চোখের জল ফেলেন, এ কথা কি অবিশ্বাসের? দেবতার সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন পাতিয়ে, দেবতাকে ঘরের লোক করে নিয়েই তো বাঙ্গালির ঘরকনা। তাই তারা শিবের বিয়ে দেয়, ইতু-মনসার ‘সাধ’ দেয়, ভাদুকে সোহাগ করে আর পার্বতাঁকে পতিগৃহে পাঠাতে চোখের জলে বুক ভাসায়। আর সবাই তবু দেবদেবী, উমা যে সেই ঘরের মেয়ে। মহিমায় তার সহস্র নাম থাক, আসল নাম যে সেই উমা নামটি। শরৎ পড়তেই ভিখারী বৈষ্ণবরা সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায় খঞ্জনীর তালে তালে। আয় মা উমাশশী, নিরখি মুখশশী, দিবানিশি আছি আসার আশায়।
হয়তো একটি গ্রামে একটি মাত্র ভাগ্যবানের বাড়িতেই কন্যারূপিণী জগন্মাতার পদার্পণ ঘটবে, কিন্তু গ্রামের প্রতিটি ঘরের অন্তরবীণায় বাজছে আগমনীর সুর।
এবারে আশ্বিনের প্রথম দিকেই পূজো, তাই ভাদ্র পড়তে পড়তেই সাজ সাজ রব। সংসারের নিত্য রান্না খাওয়া বাদে অন্য সব কিছুতেই যে করা চাই মাসখানেকের মত আয়োজন। পূজোর মাসে তো আর কেউ মুড়ি ভাজবে না, চিড়ে কুটবে না, মুড়কি মাখবে না, পক্কান্ন রাঁধবে না, মেটে ঘরের দেয়াল নিকোবে না? এমন কি সলতে পাকানো, সুপুরি কাটা, নারকেলকাঠি চাছা, সবই সেরে রাখতে হবে দেবীপক্ষ পড়ার আগে। কোজাগরীর পর আবার এসব কাজে হাত, আবার কথায় ফোড় তোলা, আর তার সঙ্গে সদ্য-বিগত উৎসবের স্মৃতি রোমন্থন।
ভাদ্র মাসে শুধু যে আগমনীর প্রস্তুতি তাও তো নয়, বর্ষার পর যে অনেক কাজ এসে জোটে গেরস্তর মেয়েদের। স্যাঁৎসেঁতে বিছানা কথা, তোরঙ্গে তোলা কাপড় চাঁদর, ভাঁড়ারের সচ্ছরের মজুত বড়ি আচার, মশলাপাতি, ডাল কড়াই,–সব কিছুকে টেনে ভাদুরে রোদ খাওয়ানো তো কম কাজ নয়।
ভুবনেশ্বরীর মা নেই, ভাজেরাই সংসারের গিন্নী, কদিন থেকে দুপুরভোর এই কর্মকাণ্ড নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে তারা। আজ পড়েছে নাড় দিয়ে। হাঁড়িভর্তি মুগের নাড়ু, নারকেলের নাড় করে মাচায় তুলে রাখতে পারলে মাসখানেকের মত জলপানের দায়ে নিশ্চিন্দি। আর পূজোর মাসে ছেলেপুলের পাতে দুটো ভালমন্দ দিতেও হয়। ভুবনেশ্বরীর বড় ভাজ নিভাননী জোর হাতে নারকেল কুরছিল আর ছোট ভাজ সুকুমারী আঁতা ঘুরিয়ে মুগ ভাঙছিল, হঠাৎ উঠোনের দরজার শিকল নড়ে উঠল।
