দীনতারিণী অকূলের কূল হিসেবে মিয়মাণভাবে বলেন, তা তুমি না হয় রামকালীকে বুঝিয়ে বলো?
রক্ষে করো বড়বৌ। আমি আর হেয় হতে চাই না। আমি লাগাতে যাব, আর তিনি মেয়েকে শাসন তো দূরের কথা, উলটে আরও আশকারা দেবেন।
অগত্যাই দিশেহারা দীনতারিণী ভুবনেশ্বরীর প্রতিই দৃষ্টিক্ষেপণ করেন, তা তুমিও তো সময়ান্তরে যখন তার মনমেজাজ ঠাণ্ডা দেখবে, একটু বুঝিয়ে বলতে পার মেজবৌমা? সত্যি যে মেয়ে তোমার স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। পরের ঘরে পাঠাতে তো হবে?
ভুবনেশ্বরী অবশ্য এ কথার কোন উত্তর দেয় না। দেওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। যদিও তার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তবু গুরুজনের সমক্ষে স্বামী সম্পর্কে উল্লেখই যে যারপরনাই লজ্জাজনক। ভুবনেশ্বরী যে রামকালীর সঙ্গে কথা কয়, এত বড় লজ্জার কথাটা শাশুড়ী এই লোকসমাজে প্রকাশই বা করে বসলেন কেন? ছি ছি!
লজ্জা প্রতিকারের আর কিছু না দেখে মাথার ঘোমটাটাই আর খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে মাথা হেঁট করে ভুবনেশ্বরী।
তা মাথাটা আর ভুবনেশ্বরী উঁচু করতে পায় কখন?
স্বামীকেও যে তার বড় ভয়।
তবু বড়ই চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছে সে মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে। অহরহ সকলেই যে বলছে–ও মেয়ে শ্বশুরঘর করতে পারবে না।
.
আসামী এক, বিচারকও এক, শুধু কাঠগড়া আর অভিযোক্তা আলাদা।
তবে আসামীকে প্রথমেই হাজির করে না ভুবনেশ্বরী, তাকে শাসিয়ে রেখে এসে, অনেক কৌশলে ভয়ানক একটা দুঃসাহসিক চেষ্টায় দিনের বেলা একবার স্বামীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে ফেলে সে। রামকালী যখন মধ্যাহ্ন-বিশ্রাম করছেন, সে সময় কাছে এসে ঘোমটা দিয়ে দাঁড়ায়।
রামকালী ঈষৎ আশ্চর্য হয়ে বলেন, কিছু বলবে?
স্বামীর স্নেহকোমল সুরে সহসা চোখে জল এসে যায় ভুবনেশ্বরীর, উত্তর দিতে পারে না, শুধু ঘোমটাটা একটু কমায়।
কি হল? রামকালী মৃদু কৌতুকে বলেন, বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছে হচ্ছে?
না। ভুবনেশ্বরী মাথা নেড়ে বাষ্পরুদ্ধ স্বরে বলে, বলছি সত্যর কথা।
সত্যর কথা! কেন? আর একটু হাসেন রামকালী, আবার কি মহা অপরাধ করে বসল সে?
করছে তো সব সময়। অভিমানের আবেগে কথায় জোর আসে ভুবনেশ্বরীর, তুমি তো সবই হেসে ওড়াও। কথা শুনতে হয় আমাকেই।
বাজে কথা গায়ে মাখতে নেই মেজবৌ।
বাজে? মেয়ে কি করেছে শুনলে আর
কি করেছে?
লিখেছে।
লিখেছে! লিখেছে কি?
তা জানি না। নেড়ুর তালপাতে কি সব বইয়ের কথা লিখেছে। আবার নাকি আস্পদ্দা করে বলেছে, আরও অনেক লিখতে পারে। বুকের পাটা কত, বাগান থেকে তালপাতা কুড়িয়ে শরকাঠি যোগাড় করে পুইমেটুলির রস দিয়ে লেখা শিখেছে!
এর পর রামকালী চমকৃত না হয়ে পারেন না। বলেন, তাই নাকি? গুরুমশাইটি কে? নেড়ুই নাকি?
নেড়ু? নেড়ু বলেছে সাতজন্ম চেষ্টা করলেও নাকি অমন হরফ সে লিখতে পারবে না!
বটে! কই তাকে একবার ডাক তো দেখি? আসামী পাশের ঘরেই অবস্থান করছে, ভুবনেশ্বরী তাকে চোখ রাঙিয়ে বসিয়ে রেখে এসেছে।
স্বামীকে যে খুব বেশী দুশ্চিন্তিত করতে পেরেছে ভুবনেশ্বরীর এমন ভরসা হয় না, শাস্তির মাত্রা কি আর তেমন গুরু হবে? অথচ লঘু শাস্তিতে কাজ হবে বলে মনে হয় না, কারণ সত্যর ভাব যথারীতি অনমনীয়। তাই স্বামীকে একটু তাতিয়ে তোলবার আশায় বলে, ডাকছি, বেশ ভাল করে শাসন করে দিও। শুধু যে আস্পদ্দার কাজ করেছ তাও তো নয়, আলাত পালাত কত সব তক্ক রেছে। কলকাতায় নাকি অনেক মেয়েমানুষ আজকাল লেখাপড়া শিখছে, তাদের তো কই চোখ না হচ্ছে না, বিদ্যের দেবী মা সরস্বতীই তো নিজে মেয়েমানুষ, এই সব বাচালতা। তুমি একটু উচিত শিক্ষা দিয়ে বকবে মেয়েকে, বুঝলে?
শেষাংশে মিনতি ঝরে পড়ে ভুবনেশ্বরীর কণ্ঠে।
সরে গিয়ে পাশের ঘর থেকে ইশারায় ডাকে মেয়েকে। স্বামীর সামনে তো আর গলা খুলতে পারে না।
.
সত্য এসে হেঁটমুণ্ডে দাঁড়ায়।
কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াবার সময় এটাই পদ্ধতি সত্যর। উত্তরদানকালে মুখ তোলে।
রামকালী প্রথমটায় একটুও অন্তত ধমকে দেবেন এ আশা ছিল ভুবনেশ্বরীর, কিন্তু তিনি তাকে হতাশ করলেন। ভাবলেশশূন্য কণ্ঠে সহজভাবে বললেন, তুমি নাকি লিখতে শিখেছ?
মুখটা অবশ্য একটু পাংশু হল সত্যবতীর।
কই, কি লিখেছ দেখি?
অস্ফুটে যা উত্তর দেয় সত্য তার অর্থ এই–অপরাধের পর আর সেই অপরাধের চিহ্ন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। নেড়ু জানে।
আচ্ছা ঠিক আছে। আবার লিখতে পার?
সত্যবতী মুখ তুলে তাকায়।
কই বাপের চোখে তো রুদ্ররোষের চিহ্ন নেই। তবে বোধ হয় তেমন রাগ করেন নি। তাই জবাবে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে সত্য।
আচ্ছা কই, লেখো দিকি।
হাত বাড়িয়ে চৌকির পাশে অবস্থিত জলচৌকিতে রক্ষিত দোয়াত কলম ও খসখসে একখানা বালির কাগজ টেনে নেন রামকালী, বলেন, লেখো–যা শিখেছ লেখো।
এ কী! এ যে হিতে বিপরীত!
ধমক চুলোয় যাক, মেয়ের হাতে আবার কাগজ কলম তুলে দিচ্ছেন রামকালী! নাটকের শেষ দৃশ্যের জন্যে?
অবশ্য এমনও হতে পারে, যাচাই করে দেখছেন নেড়ুর কথার সত্যতা।
সত্যি, আগাগোড়া ব্যাপারে নেড়ুর চালাকি হতে পারে।
কিন্তু তাই কি? হতচ্ছাড়া মেয়ে তো অস্বীকারও করছে না।
ততক্ষণে সত্য ঘাড় গুঁজে দু-তিনটি শব্দ লিখে ফেলেছে। অবশ্য তালপাতার নিয়মে অধিক জোর প্রয়োগে কাগজগাত্রে সামান্য সামান্য ক্ষতের সৃষ্ট হল, কিন্তু লেখা হল।
