বিস্ময়ের ঘোর কাটতে কিছুক্ষণ লাগে। পুণ্যির চাইতে নেড়ুই বেশী বিস্ময়াহত। যে দুরূহ কর্মের চেষ্টায় তার ঘাম ছুটে যায়, এত অনায়াসলীলায় সেটা করে ফেলে সত্য!
তাছাড়া কেমন করে?
মা সরস্বতী কি সহসা ওর উপর ভর করেছেন? যেমন নাকি শুনতে পাওয়া যায় কবি কালিদাসের উপর করেছিলেন?
লেখা শব্দ কটির উপর চোখ রেখে ঝিম হয়ে তাকিয়ে থাকে নেড়ু। আর পুণ্যি স্পর্শ বাচিয়ে তালপাতাখানার উপর ঝুঁকে পড়ে বিস্ফারিত নেত্রে বলে, কোথ থেকে শিখলি রে সত্য? কে শেখালে?
শেখাতে আবার কার দায় পড়েছে, আমি নিজে নিজেই শিখেছি! দেখে দেখে!
নিজে নিজেই শিখেছিস? দেখে দেখে?
না তো কি?
দো’ত কলম পেলি কোথা?
দো’ত কলম কে দিচ্ছে! সত্য ঝোঁকের মাথায় তার গোপন কথাটি প্রকাশ করে বসে, বটপাতার ঠুলি গড়ে, তার মধ্যে পুঁইমেটুলির রস গুলে কালির মতন করি।
তাজ্জব বনে যাওয়া দুটি প্রাণী ক্ষীণকণ্ঠে বলে, আর পাত কলম?
তোরা আর হাঁ-করা কথা কস নে বাপু। পৃথিবীর তালগাছ কি কেউ সিঁদুকে বন্ধ করে খেছে, না আকিঞ্চন করে খুঁজলে একটা শরকাঠি মেলে না?
গিন্নীর মতন মুখ করে ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে সত্য।
এতক্ষণে বুঝি হদিস পায় পুণ্যি। তা সেও গিন্নীদের মত গালে হাত দিয়ে বলে, তাহলে তুই শুকিয়ে মশ করিস? উঃ ধন্যি বাবা! কাউকে টেরই পেতে দিস না? কখন হাত পাকাস?
সত্য রহস্যের হাসিতে মুখ রঞ্জিত করে বলে, যখন তোরা থাকিস না।
কিন্তু সত্য! পুণ্যি চিন্তিত স্বরে বলে, খেয়াল করে তো করছিস, দেখে আহ্লাদও হচ্ছে, কিন্তু হাজার হোক মেয়েমানুষ, এতে তোর পাপ হবে না?
কেন, পাপ হবে কেন? সত্য সহসা উদ্দীপ্ত তেজের সঙ্গে বলে ওঠে, মেয়েমানুষরা যে রাতদিন ঝগড়া কেদল করছে, যাকে তাকে গালমন্দ শাপমন্যি করছে, তাতে পাপ হয় না, আর বিদ্যে শিখলে পাপ হবে? বলি স্বয়ং মা সরস্বতী নিজে মেয়েমানুষ নয়? সকল শাস্তরের সার শাস্তর চার বেদ মা সরস্বতীর হাতে থাকে না?
নেড়ুর আর বাক্যস্ফুর্তি নেই।
এত বড় অকাট্য যুক্তির সামনে পড়ে গিয়ে যেন বিরাট একটা দৃষ্টির দরজা খুলে যায় তার চোখের সামনে।
সত্যিই তো বটে, মা সরস্বতীটি স্বয়ং নিজেই তো মেয়েমানুষ।
এতবড় স্পষ্ট সত্য কি করে এত দিন তার দৃষ্টির বাইরে ছিল? আর এই সত্যবতীটাই বা কেমন করে উদঘাটন করে ফেলেছে সেই সবাইয়ের ভুলে থাকা, অথচ পরম স্পষ্ট কথাটাকে।
নে পুণ্যি, ঘাটে যাই চ।
আলোচনায় ইতি টেনে দিয়ে উঠে পড়ে সত্যবতী, আর দেরি করলে গিন্নীরা ভাত গেলবার জন্যে হাক পাড়বে, ভাল করে চানই হবে না।
কথাটা মিথ্যা নয়, জলে পড়লে সহজে আশ মিটতে চায় না এদের। সাঁতার দিতে দিতে হাঁপিয়ে না পড়া পর্যন্ত ভাল করে চান হয় না।
চ, বলে উঠে পড়ে পুণ্যি, কিন্তু নেড়ুর সঙ্গে চোখে চোখে একটা ইশারা হয়ে যায় তার।
কিন্তু না, অসদভিপ্রায় ছিল না তাদের, বলে দেওয়ার মনোভাবও ছিল না আর। সত্যর কিন্তু প্রকাশ করে সকলকে চমৎকৃত করে দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল।
সত্য যে তাদেরই একজন।
সত্যর মহিমায় তো তাদেরই মহিমা!
.
কিন্তু সদভিপায়ের ফল কি সব সময় সুস্বাদু হয়?
হয় না।
হয় না, সেটাই আর একবার প্রমাণিত হয়ে গেল নেড়ুর সত্যোদঘাটনে।
হুলুস্থুল পড়ে গেল অন্দর-বাড়িতে।
প্রচ্ছন্নে বইতে লাগল রামকালীর মেয়েকে আশকারা দেওয়ার সমালোচনা আর প্রত্যক্ষে ছিছিক্কার পড়তে লাগল সত্যর বুকের পাটার!
ও কি ভেবেছে শ্বশুরঘর করতে হবে না ওকে?
করতে হবেও না, শিবজায়া তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলেন, শ্বশুররা টের পেলে উদ্দিশে হাতজোড় করে ত্যাগ করবে ও বৌকে।
মোক্ষদা বলেন, হারামজাদী যখনই জটার নামে ছড়া বেঁধেছিল, তখনই সন্দ হয়েছিল আমার। এখন বুঝছি।
রাসুর মা কোনদিনই কোন কথায় বড় থাকে না, কাজের পাহাড় নিয়েই কাটায় সারা দিন, কিন্তু আজকের অপরাধের আবিষ্কর্তা নাকি স্বয়ং তারই পুত্ররত্ন, তাই বোধ করি কিছুটা দাবি অনুভব করে কথা বলার।
আস্তে আস্তে বলে, একে তো ঘরের একটা বৌ, যা নয় তাই কেলেঙ্কারি করে গালে-মুখে চুনকালি দিয়ে জন্মের শোধ লোকের কাছে হেয় করে রেখে গেল, আবার ঘরের মেয়েরাও যদি যা ইচ্ছে তাই করতে থাকে-
কথা শেষ করে না রাসুর মা, শুধু দুটো পাতকই যে একই গর্হিতের পর্যায়ে পড়ে সেইটুকুরই ইশারা দেয়।
কাঠ হয়ে তাকিয়ে থাকে ভবনেশ্বরী।
শুধু কাশীশ্বরীই নীরব। তাঁর আর মুখ নেই।
সমালোচনার উদ্দমতা কিছুটা স্তিমিত হলে দীনতারিণী প্রায় মিনতির ভঙ্গীতে বলেন, যাক গে বাবা, এই নিয়ে আর বেশী কথাকথিতে কাজ নেই সেজঠাকুরঝি। প্রবাদে বলে, কথা কানে হাঁটে। কোন্ সূত্রে কার দ্বারা চালিত হয়ে কুটুমবাড়ির কানে উঠবে, হয়ত সেই নিয়ে কি বিপত্তি বাধবে কে বলতে পারে! একে তো
দীনতারিণীও কথায় একটা অকল্পিত সম্ভাবনা উহ্য রেখে টেনে ছেড়ে দেন। কাশীশ্বরীর সামনে আর শঙ্করীর কথা স্পষ্ট করে তোলেন না।
তবু মোক্ষদা উচ্চ চীৎকারে ভবিষ্যদ্বাণী করতে ছাড়েন না, সে তুমি যতই সাবধান হও বড়বৌ, আমি এই আগবাড়িয়ে বলে দিচ্ছি, ও মেয়ের কপালে অশেষ দুঃখ আছে। আজ নয় তুমি আমি চেপে গেলাম, কিন্তু ওকে নিয়ে যারা ঘর করবে, তাদের কি আর গুণ বুঝতে বাকী থাকবে? হবে না তো কি, বাপে শাসন না করলে কি আর বেয়াড়া মেয়ে-ছেলে শায়েস্তা হয়?
