কই দেখি কত! বলেই সত্য একটা কাজ করে বসে। হাতটা একবার মাথায় মুছে নিয়ে চট করে মা সরস্বতীর উদ্দেশে একটা প্রণাম নিবেদন করে নেড়ুর এইমাত্র রক্ষিত তালপাতার গোছায় এক টান মারে।
অ্যাই অ্যাই, ও কী হচ্ছে! শিহরিত নেড়ু ভয়ঙ্কর একটা ভয়ের সুরে বলে ওঠে, সত্য? তুই তালপাতায় হাত দিলি?
দিলাম তা কি! নির্ভীক স্বর সত্যর, আমি তো মা সরস্বতীকে পেন্নাম করে হাত দিয়েছি।
পেন্নাম করলেই সব হল? তুই না মেয়েমানুষ? মেয়েমানুষের তালপাতায় হাত ঠেকলে কি . জানিস না?
সত্য ইতিমধ্যে নেড়ুর সারা সকালের শ্রমফল নিরীক্ষণ শুরু করে দিয়েছে। বলা বাহুল্য খানি মাত্র পাতা কালি-কলঙ্কিত, বাকী সবগুলিই নিষ্কলুষ নিষ্কলঙ্ক। কাজেই আর একবার হি হি-র পালা।
খুব যে বলছিলি অনেক মকুশ করেছিস? কই কোথায়? দোয়াতে বুঝি কালির বদলি জল ভরেছিস? তাই চোখে ঠাহর হচ্ছে না?
সত্যর বিদ্রপের ভঙ্গী বড় তীক্ষ্ণ, কারণ উক্ত মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে চোখের তারা পাতার যতটা সম্ভব কাছে নিয়ে এসেছে সে, মুখে কৌতুকের আলোর ঝলমলানি।
এটা সহ্য করা শক্ত।
নেড়ু এক হ্যাঁচকায় নিজ সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে, বেশ থাক্। আমার বিদ্যে না হোক তোর কি? নিজের কি হয় দেখ। বলে দিচ্ছি গিয়ে সবাইকে, তালপাতে হাত দিয়েছিস তুই।
আর কেউ হলে সবাইকে বলে দেওয়ার ভীত-প্রদর্শনেই কাবু হয়ে পড়ে এবং আপসের সুরে আচ্ছা বেশ ভাই দেখলাম! ইত্যাদি অভিমানসূচক বাণী উচ্চারণ করে শত্রুপক্ষের মন নরম করে থাকে। কিন্তু সত্যর মনোভাব আপসহীন। তাই ভিতরে যাই হোক, বাইরে বিন্দুমাত্র বিচলিত ভাব দেখায় না সে, সমান জোরের সঙ্গেই বলে, বলে দিবি তো দিবি, সবাই আমার কি করবে শুনি? শূলে দেব?
দেয় কিনা দেখিস! চালাকি নয়!
কেন, মেয়েমানুষ তালপাতে হাত দিলে কি হয়? কলকেতায় তো কত মেয়েমানুষ লেখাপড়া করে।
তোকে বলেছে করে! পড়লে চোখ কানা হয়ে যায় তা জানিস?
কক্ষনো না, মিছে কথা! বড্ডই তুই জানিস! যারা পড়ছে তারা সব অমনি কানা হয়ে যাচ্ছে।
কলকেতা নামক অ-দৃষ্ট সেই দেশটায়, কদাচ কখনও যেখানের নাম কানে আসে, সেখানে সত্যিই কোনও মেয়েমানুষ লেখাপড়া করে কিনা এবং করলে তাদের চক্ষুযুগলকে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন রাখতে পারে কিনা, এ সম্পর্কে নেড়ুর স্পষ্ট কিছু জানা নেই, তবু নিজের অভিমতকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে সে, এখন না যাক–আসছে জন্মে যাবে। অমনি না!
আসছে জন্মে। হি-হি-হি! তাদের আসছে জন্মটা তুই দেখে এসেছিস বুঝি? আমি এই তোকে বলে দিচ্ছি নেড়ু, ওসব কিছু হয় না। বিদ্যে তো ভাল কাজ, করলে কখনও পাপ হতে পারে?
হ্যাঁ, বলেছে ভগবান তোর কান ধরে! ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে সত্য, ভগবান কখনো অমন একচোখা নয়। ওসব বেটাছেলেরাই ছিষ্টি করেছে।
বচসার শব্দ খুব মৃদু হচ্ছিল না, শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুণ্যি এসে দাঁড়ায় এবং সকৌতূহলে প্রশ্ন করে, কি ছিষ্টি করেছে রে বেটাছেলেরা?
সত্য মুহূর্তে অনুত্তেজিত ভাব পরিগ্রহ করে বলে, কিছু না, শাস্তরের কথা হচ্ছে।
শাস্তর!
পুণ্যি হালে পানি পায় না।
সহসা এখানে শাস্ত্রালোচনা শুরু হল কী বাবদ, সেটা অনুধাবন করতে চেষ্টা করে। ইত্যবসরে নেড়ু সেই বলে দেওয়ার সুরে বলে ওঠে, সত্যর সাহসখানা শুনবি পুণ্যিপিসী? তালপাতে হাত দিয়েছে, আবার বলছে দিয়েছি তো হয়েছে কি!
তালপাতে হাত!
এটা আবার আর এক আকস্মিকতা। তালপাতাটা কি জাতীয় সহসা সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে পুণ্যবতী।
তালপাতা কি রে? প্রশ্ন করে সত্যর মুখের দিকে তাকিয়ে।
তাকে হাঁ করে দিয়ে সত্য হেসে উঠে দেওয়ালে পোঁতা পেরেক গোঁজা একখানা তালপাতার হাতপাখা পেড়ে নিয়ে বলে ওঠে, এই যে এই! দেখ, এখন হাতে পোকা পড়ল কিনা আমার!
সত্য! নেড়ু চোখ পাকিয়ে বলে, মা সরস্বতীকে নিয়ে তামাশা করছিস তুই?
প্রত্যেক সময় প্রত্যেক ব্যাপারেই সত্য জিতে যায়, নেড়ু হারে। নেড়ুর মজ্জায় অবস্থিত পৌরুষবোধ এতে যথেষ্টই আহত হয়, আজ সহসা সত্যকে শাসন করবার একটা ছুতো পেয়ে নেড়ুর আর উল্লাসের সীমা নেই। তাই সহসা করতলগত সেই শক্তিটাকে অবহেলায় বাজে খরচ করে ফেলতে পারছে না, রীতিমত করে ভাঙিয়ে খেতে চাইছে চেখে চেখে।
এবার আর হাসে না সত্য, বিরক্তি প্রকাশ করে, সেই ওর অভ্যস্ত ভঙ্গীতে জোড়াভুরু কুঁচকে, হাঁদার মতন কথা কস নে নেড়ু। তামাশা আমি মা সরস্বতীকে করছি না, করছি তোকে। তালপাতে একটু হাত দিয়েছি তো কী কাণ্ডই করছি। যেন সগৃগো মত্য রসাতলে গেছে! শুধু হাত দেওয়া কেন, আমি তো লিখতেও পারি।
লিখতেও পারিস!
যুগপৎ নারী-পুরুষ দুই কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এই সর্পাহত-কণ্ঠবৎ শব্দ। আড়ষ্ট হয়ে গেছে পুণ্যি আর নেড়ু।
কিন্তু নিষ্ঠুর সত্য ওদের এই আঘাতপ্রাপ্ত চিত্তেই আরও আঘাত হেনে বসে, পারিই তো, এই দেখ।
ঝপ করে আলোচ্য তালপত্রখণ্ডের একখানা টেনে নিয়ে দোয়াতে কলম ডুবিয়ে পরিপাটি করে লিখে ফেলে সত্য, কর খল ঘট। লিখে অদৃশ্যের উদ্দেশ্যে আর একটা প্রণাম ঠুকে বলে, আরও কত লিখতে পারি?
