এখন আপনারা স্থির করুন, এই অপরাধে আমাকে ত্যাগ করবেন কিনা?
যেন বক্তৃতা-মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন রামকালী, এমন ধীর-স্থির সমুন্নত সেই মূর্তি!
একে ত্যাগ!
সম্ভব!
কিন্তু তাও হওয়া সম্ভব বৈকি। সমাজ বলে কথা!
নিবারণ চৌধুরীর মামা বেঁটেখাটো বিপিন লাহিড়ী একটা জলচৌকি টেনে এনে তার উপর দাঁড়িয়ে উঠে বিয়ে চিবিয়ে বললেন, ত্যাগ করাকরির কথা নয়, ভবিষ্যতে যা বিচার তা হবে। কিন্তু বর্তমানে আজ তো আর আমাদের এখানে খাওয়া হয় না রামকালী।
রামকালী দুই হাত জোড় করে শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আমি কাউকে অনুরোধের দ্বারা পীড়ন করতে চাই না, তবে এইটুকুই শুধু জানাচ্ছি, আমি সেই মতিভ্রষ্টা মেয়েকে মৃত বলেই গণ্য করব। মানুষের সমাজ থেকে তার মৃত্যু হয়েছে। আহারের পূর্বে এ কথাটি নিবেদন করতে যারপরনরাই দুঃখ বোধ করছি আমি, কিন্তু আমার বিবেকের কাছে এইটাই কর্তব্য বলে মনে হল আমার।
বিপিন লাহিড়ী মনে মনে খুব ভেঙচান, আগে বলাই কর্তব্য ভাবলাম! ওরে আমার যুধিষ্ঠির! এই যজ্ঞির খাওয়াটা পণ্ড করলি? ভাল হবে–তোর ভাল হবে?
চোখে জল এসে যাচ্ছিল বিপিন লাহিড়ীর। তবু কথা বলেন তিনি, আমার মনে হয়, খবরটা তোমার এখন গোপন রাখাই উচিত ছিল রামকালী।
সে আমি ভেবেছিলাম। রামকালী আবার একবার সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, কিন্তু পরে মনকে ঠিক করে নিলাম। আমার এত বড় কলঙ্ক সত্ত্বেও যদি আপনারা আমাকে ত্যাগ না করেন, তাহলে পরম ভাগ্য বলে মানব। আর যদি তা করেন, সে শাস্তি মাথা পেতে নেব।
এবার আর ঝড় নয়, গুঞ্জনধ্বনি!
সে ধ্বনি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তা এতে তোমার আর কলঙ্ক কি?
আছে বৈকি! আমার অন্তঃপুর উচিত মত রক্ষা করবার অক্ষমতাই আমার কলঙ্ক, আমার অপরাধ। মার্জনা আমি চাইব না, এই অপরাধের মার্জনা নেই, শুধু আমার প্রতি আপনাদের স্নেহ ভালবাসার কাছে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছি, আপনারা পরে আমার প্রতি যে শাস্তির আদেশ দেন মাথা পেতে নেব, শুধু আজ আপনারা দয়া করে আহার করুন।
আর একবার ঝড় উঠল।
অসন্তোষের? না উল্লাসের?
বোধ করি বা উল্লাসেরই, তবে জলচৌকির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বেঁটে-খাটো বিপিন লাহিড়ীর গলাটায় শুধু শোনা গেল, আচ্ছা, আজকের মত তোমার অনুরোধ রক্ষা করাই আমরা স্থির করছি।
রামকালী ধীরে ধীরে সরে গেলেন। মাথা সোজা করেই।
১৫. সকালবেলা নেড়ুকে হাতের লেখা
সকালবেলা নেড়ুকে হাতের লেখা মক্শ করতে হয়। পুবের উঠোনের রোদ যতক্ষণ না পেয়ারাতলার ঠিক নিচেটায় এসে পড়বে ততক্ষণ পর্যন্ত নেড়ুকে সেই দুরূহ কর্তব্যটি করেই চলতে হবে, এই নির্দেশ আছে তার উপর। ঋতুভেদে সীমানার কিছু ভেদ হয়, আপাতত ওই পেয়ারাতলা।
অবশ্য তার প্রতি আরও নির্দেশ আছে।
সেটা হচ্ছে তালপাতার গোছাগুলি ও দোয়াত-কলম নিয়ে বসার সময় এবং মকশ’র পর সেগুলি তুলে রাখার সময় ভক্তিভরে মা সরস্বতীকে প্রণাম করা। প্রণাম-মন্ত্রের সঙ্গে প্রার্থনা-মন্ত্রও যুক্ত করা আছে।
দেবীর প্রসন্নতা লাভের উপায় স্বরূপ বিদ্যা অনুশীলনের চাইতে স্তবস্ততি প্রণাম প্রার্থনার উপরই নেড়ুর আস্থা বেশী। কাজেই শব্দবোধের পাতা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি মুড়ে ফেলে, নিঃশব্দ স্তুতিতেই সময় বেশি যায় তার। চোখটা বুজে রেখেও তেরছা কটাক্ষের কৌশলে পেয়ারাতলার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে পরম ভক্তিভরে মন্ত্রোচ্চারণ করছিল সে পাততাড়িটি কপালে ঠেকিয়ে
ত্বং ত্বং দেবী শুভ্রবর্ণে,
রত্নশোভিত কুণ্ডলকর্ণে।
কণ্ঠে লম্বিত গজমোতিহারে,
দেবী সরস্বতী বর দাও আমারে।
লাগ লাগ বাণী কণ্ঠে লাগ–
যাবজ্জীবন তাবৎ থাক্।
দুষ্ট সরস্বতী দূরে যাক।
আমি থাকি গুরুর বশে,
ত্রিভুবন পূরিত আমার যশে।
দেবী-স্তবের কালে কিন্তু নেড়ু ভাবছিল দেবের কথা। সূর্যদেব।
আশ্চর্য! নিষ্ঠুর সূর্যদেবতাকে এত আন্তরিকভাবে মাতুল সম্বোধন করেও ভাগ্নের প্রতি তার মমতার কোনও প্রকাশ দেখতে পায় না নেড়ু। পেয়ারাতলার নিচেটায় আসার যেন কোনও গরজই নেই তার। অথচ তিনি সামান্য একটু কৃপা-দৃষ্টিপাত করলেই, করা মাত্রই, নেড়ুর আজকের মত যন্ত্রণা শেষ হয়। বার বার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একই স্তবস্তুতি কতক্ষণ ধরেই বা করা যায়?
তবু কপাল থেকে কলম তালপাতা নড়ায় না নেড়ু, ঠেকিয়েই থাকে, এইমাত্র ঠেকানোর ভঙ্গীতে।
খুব যে বিদ্যে হচ্ছে! আহা মরে যাই, ছেলের কী ভক্তি রে!
সত্যবতীর শানানো গলা বেজে ওঠে।
বুকটা কেঁপে ওঠে নেড়ুর।
উঃ, যা মেয়ে ও! আর যা জেরা! তথাপি বাইরের প্রকাশে সত্যকে কোন স্বীকৃতি দেয় না নেড়ু,–একই ভাবে চোখ বুজে বিড়বিড় করতে থাকে।
সত্যবতী হি-হি করে হেসে ওকে একটা ঠেলা দিয়ে বলে, এখন যে বড় চোখ বোজা হচ্ছে? এতক্ষণ কি করছিলি? হুঁ বাবা, খালি চোখ পিটপিট আর পেয়ারাতলার দিকে তাকাসনি!
আঃ সত্য! নেড়ু এবার পাতা কলম কপাল থেকে নামিয়ে সযত্নে জলচৌকির উপর স্থাপিত করে বিরক্তি-ব্যঞ্জক গম্ভীর স্বরে বলে, নমস্কারের সময় গোলমাল করছিস কেন?
নমস্কার তো তুই সকাল থেকেই করছিস! এক পোর বেলা হয়ে গেল সেই এস্তক নমস্কারই হচ্ছে! দেখি নি যেন!
ইঃ, দেখেছিস তুই! নেড়ু উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখে। মনে হচ্ছে যেন মাতুল সূর্যদেব এতক্ষণে সদয় হয়েছেন, পেয়ারাতলার ঠিক নিচেটাতে কৃপাকটাক্ষ করছেন। অতএব বুকের বল বাড়ে তার। দৃপ্তকণ্ঠে বলে, কত মক্শ করলাম তখন থেকে!
