বেশ বাবা, তোমাদের জেদই থাক, রাগ নিয়ে ধুয়ে জল খাও তোমরা।
ওদিকে বিদ্যারত্ন রামকালীকে বলছিলেন, কালের সমুদ্রে একটা মানুষের জীবনমরণ সুখদুঃখ কিছুই নয় রামকালী, সমুদ্রে বুদ্বুদ মাত্র। কুলত্যাগিনী বধূকে সন্ধান করবার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু সমাজকে তো একটা জবাব দিতে হবে?
যা সত্য তা বলবে সাহসের সঙ্গে। সত্যকে স্পষ্ট করে বলতে পারা চাই। সেটাই ধর্ম। সেই বিপদগামিনীকে তুমি তো আর ঘরে নিচ্ছ না? ভেবে নাও তার মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু পণ্ডিতমশাই, এ আমি ভাবতেই পারছি না। আমার ঘরের কথা নিয়ে অপরে আলোচনা করবে।
রামকালী, তোমার দেহে একট দুষ্টু রোগ হওয়া অসম্ভব নয়, তা যদি হয় কি করবে তুমি? বিধাতার বিধান মেনে নিতেই হবে। তা ছাড়া হয়তো এরকম একটা কিছু প্রয়োজনও ছিল। হয়তো তোমার ভিতর কোনখানে একটু অহমিকা এসেছিল।
অহমিকা! পণ্ডিতমশাই, আমি’র প্রতি মর্যাদাবোধ থাকাটা কি ভুল? অন্যায়?
এই একটা জায়গা বড় গোলমেলে রামকালী, আত্মমর্যাদাবোধ আর অহমিকা-বোধ, এ দুটোর চেহারা যমজ ভাইয়ের মত, প্রায় এক, সূক্ষ্ম আত্মবিচারের দ্বারা এদের তফাৎ বোঝা যায়। তা ছাড়া তুমি ব্রাহ্মণ! রজোগুণ তোমার জন্য নয়। কিন্তু আজ তোমার চিত্ত চঞ্চল, তুমি এখন বিশেষ ব্যস্তও, কাজেই আজ এস। আলোচনা থাক।
রামকালী কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে ভূমিসংলগ্ন দৃষ্টিতে কি যেন ভাবলেন, তারপর সহসা মাথা তুলে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন, আচ্ছা, আপনার নির্দেশ শিরোধার্য করলাম।
আর একবার বিদ্যারত্নের পদধূলি নিয়ে বেরিয়ে এসে পালকিতে চড়লেন রামকালী। ফেরার মুখে আর বেহারাদের তাড়া দেবার কথা মনে এল না। বিদ্যারত্নের একটা কথা তাকে বিশেষ ধাক্কা দিয়েছে। বিদ্যারত্ন বললেন, তুমি ব্রাহ্মণ, রজোগুণ তোমার জন্য নয়।
কিন্তু তাই কি সত্য? ব্রাহ্মণের মধ্যে তেজ থাকবে না? থাকবে কেবলমাত্র রজোগুণ-শূন্য স্তিমিত শান্তি?
.
ফিরে দেখলেন বাড়ি লোকে লোকারণ্য। নিমন্ত্রিতেরা প্রায় সকলেই এসে গেছে। রান্নাও প্রস্তুত। শুধু রামকালীর অনুপস্থিতিতে ভোজে বসিয়ে দেবার ব্যবস্থাটা ঠিকমত হচ্ছে না, সকলে মিলে শুধু গুলতানি চলছে।
এই চনচনে সময়ে দূর থেকে পরিচিত পালকি-বেহারাদের হুম হুম্ আওয়াজ কানে এল। আশায় অধীর হয়ে উঠল সবাই এসে গেছেন, এসে গেছেন রবে গম্ গম্ করে উঠল জনতা। সকলেই অবশ্য ধরে নিয়েছিল আচমকা কোন রোগীর মরণ-বাচন সংবাদ পেয়ে বাধ্য হয়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছে রামকালীকে। কুঞ্জও সেই কথাই বলে রেখেছিলেন।
অন্দরমহলে মেয়েদের মধ্যে শঙ্করী সম্পর্কে কানাঘুষো শুরু হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু বারমহল সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত।
রামকালী এসে দাঁড়াতেই বয়োজ্যেষ্ঠ অতিথি-অভ্যাসগতের দল হৈ হৈ করে এগিয়ে এলেন, ব্যারামটা কার রামকালী? কোন্ গায়ে? কে যেন দেবীপুরের দিকে পাকি যেতে দেখল, এইখানেই কারও—
না, কারও ব্যায়রাম শুনে আমি যাই নি– রামকালী একবার লোক-ভর্তি আটচালার সমস্তটায় চোখ বুলিয়ে নিলেন, তার পর একটু থেমে বললেন, আমি বেরিয়েছিলাম অন্য প্রয়োজনে, সে প্রয়োজেনের কথা আপনাদের সকলকেই জানাব। যদিও আপনারা এখনো অভুক্ত ও ক্ষুধার্ত, আমার কথা শুনে ঠিক কি মনোভাব আপনাদের হবে তাও সম্পূর্ণ বুঝতে পারছি না, তবু আহারাদির পূর্বেই কথাটা ব্যক্ত করা উচিত মনে করছি আমি। বলতে আপনারা সকলে অনুমতি করুন আমাকে।
নিঃশব্দ জনতার মাঝখানে রামকালীর ভরাট কণ্ঠস্বর গম্ গম্ করে উঠল, অনেকেরই বুক কেঁপে উঠল একটা অজানা আশঙ্কায়।
কুঞ্জ হঠাৎ পিছনদিকে হঠে গিয়ে ধুলোর উপর বসে পড়লেন, রাসু ভিড়ের একেবারে পিছনেই ছিল সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল কাকার আরক্ত গৌরমুখের দিকে। সমাগতেরা অনুধাবন করতে পারছেন না ব্যাপারটা কি। আহার্য বস্তুতে কি কোনও অনাচার স্পর্শ ঘটেছে? কিন্তু তাই বা কি করে বলা যায়? রামকালীর আচমকা বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নটাও যে রয়েছে।
তবে কি সহসা রামকালীর কোন জ্ঞাতির মৃত্যু ঘটেছে? এই বিরাট ভোজের রান্না সব অশৌচান। হয়ে গেছে? সেই সংবাদ পেয়েই রামকালী…। রামকালী কি এমন অর্বাচীন যে এই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে সেই তথ্য এসে প্রকাশ করবেন? মৃত্যুসংবাদ কানে না শুনলে তো অশৌচ হয় না, উনি নিজে গা ঢাকা দিয়ে বেড়ালে তো আর এখানের অন্নগুলো অশৌচান্ন হয়ে যেত না? বলে এমন ক্ষেত্রে ঘরের মরা কাঁথা কাথা চাপা দিয়ে রেখে লোকে দিন উদ্ধার করে নেয়।
তবে?
রামকালী যে তার বক্তব্য জ্ঞাপন করতে অনুমতি চেয়েছিলেন, এ কথা কারও মনে ছিল না, ফের চেয়ে সে কথা মনে করিয়ে দিলেন রামকালী।
তা হলে আপনারা আমায় অনুমতি দিচ্ছেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্য অবশ্য। তোর যা বলবার আছে বল।
তা হলে শুনুন, গতরাত্রে আমার পরিবারভুক্ত একটি বিধবা বধূ গৃহত্যাগ করেছে।
আঁ! অ্যাঁ! আঁ!
সহসা ভয়ঙ্কর একটা ঝড় উঠল। কালবৈশাখির দুমদাম এলোমেলো ঝড় নয়, যেন একটা বুনো অরণ্যের চাপাশ্বাস গোঁ গোঁ করে উঠল। সেই শ্বাস শুধু সমবেত কণ্ঠের ওই আহত বিস্ময়ের প্রচণ্ড ধ্বনি।
রামকালী কি এই বজ্রটাকেই প্রস্তুত করছিলেন এতক্ষণ ধরে তাঁর অভুক্ত ক্ষুধার্ত নিমন্ত্রিত অতিথিদের জন্যে?
তুমুল ঝড়ের ধ্বনিতে রামকালীর কথার শেষ অংশ চাপা পড়ে গিয়েছিল, আর একবার সে স্বর গমগম করে উঠল চাপা মেঘমন্দ্রের মত।
