আজ এসেছেন আর এক প্রশ্ন নিয়ে।
অবশ্য আপাতত প্রশ্ন তাড়াতাড়ি পৌঁছবার। একখানা গ্রাম পার হয়ে তবে দেবীপুর। বিদ্যারত্নের গ্রাম।
পালকি থেকে আর একবার মুখ বাড়িয়ে দেখে বেহারাদার তাগাদা দিতে গিয়ে থেমে গেলেন রামকালী, থাক, এত বিচলিত হবার দরকার নেই, পোঁছে ওরা দেবেই ঠিক।
বিচলিত হওয়াকে ঘৃণা করেন রামকালী। তবু মনে মনে অস্বীকার করে লাভ নেই, আজ একটু বিচলিত হয়েছেন। কোথায় যেন হেরে গেছেন রামকালী, তারই একটা সূক্ষ্ম অপমানের জ্বালা মনকে বিধছে।
কিন্তু রামকালীর মধ্যে এই পরাজয়ের গ্লানি কেন? সংসারের একটা বুদ্ধিহীন মেয়ে যদি একটা অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকেই, তাতে রামকালীর পরাজয় কেন?
.
ঘোড়ায় এলে এতক্ষণে পৌঁছে যেতেন, কিন্তু কোন বয়োজ্যেষ্ঠ বা গুরুস্থানীয়ের সামনাসামনি সাধ্যপক্ষে ঘোড়ায় চড়েন না রামকালী। তাই পালকিতেই বেরিয়েছেন। বেরিয়ে এসেছেন একটু সঙ্গোপনেই। জেলেদের জাল ফেলার ব্যাপারটা সামান্য তদারক করেই। বাড়তি কিছু মাছ উঠলে উঠুক। খাদ্যবস্তু কখনো বাড়তি হয় না। ওরা এখন যেভাবে কাজ করছে করুক, রামকালীর অনুপস্থিতি টের না পেলেই মঙ্গল। টের পেলেই কাজে ঢিলে দেবে।
কারুর ওপর কি ভরসা করার জো আছে?
কাকা আছেন, সেজকাকা। কিন্তু তাকে কোন কাজকর্মের ভার দেওয়াও বিপদ। কারণ তাঁর মতে ডাকহক চেঁচামেচি এবং নির্বিচারে সকলকে ধমকাতে পারাই পুরুষের প্রধান গুণ। আর বয়েস হয়ে গেলে পৌরুষের পরিমাণটা যে তার একতিলও কমে নি, সর্বদা সেটা প্রমাণ করতেও রীতিমত তৎপর সেজকাকা। তাই তাকে ডেকেডুকে কর্তৃত্বের ভার দেওয়া মানে বিপদ বাধানো।
আর কুঞ্জ? কুঞ্জর কথা কি বলারই যোগ্য?
মিষ্টির ভিয়েনের কানাচে হাতে মুখে রসমাখা আর মুখভর্তি ছানাবড়া ঠাসা কুঞ্জর তৎকালীন চেহারাটা একবার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তখন যখন দেখেছিলেন, মনটা বিরক্তিতে ভরে গিয়েছিল, এখন হঠাৎ একটা মমতা-মিশ্রিত অনুকম্পার ভাব মনে এল।
যে মানুষ লুকিয়ে-চুরিয়ে নিজের ছেলের বিয়ের ভোজের মিষ্টান্ন খেতে বসে, তার উপর অনুকম্পা ছাড়া হৃদয়ের আর কোন্ ভাববৃত্তি বিকশিত হবে?
এরা কি রাগেরই যোগ্য?
আশ্চর্য! রাসুটা হচ্ছে ঠিক বাপের মতই অপদার্থ। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে খুব একটা আশার আলো চোখে পড়ে না। কিন্তু তার জন্য হতাশা আনেন না রামকালী–আপন শক্তিতে বিশ্বাসী, আপন কেন্দ্রে অটুট অবিচল তিনি।
ওদের কথাকে চিন্তার জগতে ঠাই দেন না রামকালী, কিন্তু সত্যটা মাঝে মাঝে তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। শুধু সেই একটা ভয়ঙ্কর সরল মুখ থেকে উচ্চারিত ভয়ঙ্কর জটিল প্রশ্নগুলোই চিন্তিত করে তোলে রামকালীকে তা নয়, চিন্তিত করে তোলে সত্যর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।
সংসার কি সত্যবতীকে বুঝবে?
পালকি থেকে নেমে পড়লেন রামকালী।
বিদ্যারত্নের মাটির কুটির থেকে একটু দূরে। সেটাই সভ্যতা, সেটাই গুরুজনের সম্ভ্রম রক্ষা। গুরুজনের চোখের সামনে গাড়ি পালকি থেকে নামা অবিনয়।
মাটির ঘর দালান দাওয়া, দাওয়ার নিচের উঠোনে আঁকা ছবির মত বেড়া ঘেরা ছোট্ট ফুলবাগানটি। বিদ্যারত্নের নিজের হাতের বাগান, নিজের হাতের দেওয়া বেড়া। টগর দোপাটি গাঁদা বেল মল্লিকা রক্তজবা করৰী সন্ধ্যামণি, নানান গাছে সারা বছরই ফুলের সমারোহ। এছাড়া বেড়ার ধারে আছে তুলসী কেয়ারি। গঙ্গাস্নানের পর পূজোর আগে একবার গাছগাছড়াগুলির তদারক করে যাওয়ার অভ্যাস বিদ্যারত্নের। পায়ে খড়ম, পরনে নিজের হাতে কাটা সুতোর ধুতি ও উত্তরীয়– পিতলের ঝারায় জল নিয়ে গাছের গোড়ায় গোড়ায় ঢালছিলেন বিদ্যারত্ন, রৌদ্রে, রামকালীর ছায়া পড়তেই মুখ তুলে তাকালেন।
হৈ হৈ করে সম্ভাষণ করে উঠলেন না বিদ্যারত্ন। হঠাৎ আবির্ভাবের জন্য বিস্ময় প্রকাশও করলেন, শুধু রামকালীর প্রণাম শেষ হলে তাঁর মাথায় হাত রেখে বললেন, এস, দীর্ঘায়ু হও।
শান্ত, সৌম্য মুখ, শ্যামবর্ণ ছোটখাটো চেহারা, মাথার চুলগুলি ধবধবে পাকা, কিন্তু দৃঢ়নিবদ্ধ মুখের চামড়ায় বলিরেখার আভাসমাত্র নেই। সহজে বিশ্বাস করা শক্তবিদ্যারত্ন মশাইয়ের বয়স আশী ছোঁয়-ছোঁয়। চকচকে সাজানো দাঁতের পাটির শুভ্র হাসিটুকুও বিশ্বাস করতে প্রতিবন্ধকতা করে।
দাওয়ার উপর খান দুই-তিন জলচৌকি, কাছের পৈঠেয় ঘটিতে জল। পা ধুয়ে দাওয়ায় উঠে জলচৌকিতে বসলেন রামকালী, বিনত হাস্যে বললেন, আপনার তো আহ্নিকের বেলা হল!
তা হল। বিদ্যারত্ন প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন, বলবে কিছু–যদি বলবার থাকে?
বলবার কিছু আছেই, নচেৎ এমন অসময়ে ব্যস্ত হয়ে আসার কারণ কি?
রামকালী আর গৌরচন্দ্রিকা করলেন না, মুখ তুলে পরিষ্কার কণ্ঠে বললেন, পণ্ডিতমশাই, আজ আবার এক প্রশ্ন নিয়ে আপনার দরবারে এসে দাঁড়িয়েছি। বলুন মানুষ বড়, না বংশমর্যাদার অহঙ্কার বড়?
.
ঠিক এই একই সময় একটা ছোট মেয়ে ওই একই ধরনের প্রশ্ন করছিল, অন্য কাউকে নয়, নিজের মনকেই। আচ্ছা এও বলব, মানুষ বড়, না তোমাদের রাগটাই বড়?
কী আশ্চয্যি, কী আশ্চয্যি! জলজ্যান্ত একটা মানুষ হারিয়ে গেল তবু গিন্নীরা কিনা সত্যর ওপর চোখ রাঙাচ্ছেন, খবরদার দুটি ঠোঁট ফাঁক করবি না, কারুর যদি কানে যায় তো তোদের সব কটার হাড়মাস দু ঠাই করব।
