একবারের চেষ্টায় পারে নি, তাই দ্বিতীয়বার আবার! কিন্তু খটকা লাগছে একটা জায়গায়, বকাবকিটা তো তার পরবর্তী ঘটনা। তা ছাড়া সত্যবতী বর্ণিত কুল খাওয়া শব্দটা! যা শুনে এত চিন্তার মধ্যেও হাসি এসে গিয়েছিল তার।
কাশীশ্বরীও ওই সন্দেহ ব্যক্ত করেছেন।
রামকালী চাটুয্যের বাড়িতে এমন একটা ঘটনাও ঘটা সম্ভব!
ভয়ানক একটা যন্ত্রণা অনুভব করলেন রামকালী। না, শঙ্করীর অপঘাত মৃত্যু ভেবে নয়, চাটুয্যে বাড়ির সম্ভ্রম নষ্ট বলেও নয়, যন্ত্রণা বোধ করলেন নিজের ত্রুটির কথা ভেবে। আরও হুশিয়ার থাকা উচিত ছিল তার, আরও যথেষ্ট পরিমাণে সাবধান। একটা নিতান্ত তুচ্ছ মেয়েমানুষ যেন রামকালীর ক্ষমতার তুচ্ছতাকে ব্যঙ্গ করে গেল।
মেয়েটার এ ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করা যাচ্ছে না।
হঠাৎ অনুভব করলেন সত্য পিছিয়ে পড়েছে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখে থমকে গেলেন। সহসা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে কান্না শুরু করেছে সত্যবতী।
রামকালী পিছিয়ে এলেন। গম্ভীরভাবে বললেন, তোমার কাঁদবার দরকার নেই।
বাবা! এবার আর নিঃশব্দে নয়, ডুকরে ওঠে সত্য, সব দোষ আমার। কাটোয়ারা বৌ তো রাতদিন বলত, মরণ হলে বাঁচি, আমি যদি তখন তোমাকে বলি তো একটা প্রিতিকার হয়। মনে করতাম অলীক কথা, রাজ্যি সুদ্দু মেয়েমানুষই তো রাতদিন মরণ-মরণ করে–তেমনি। কাটোয়ার বৌ সত্যি ঘটিয়ে ছাড়ল! মা নেই বাপ নেই ভাই নেই, স্বামীপুতুর কেউ নেই মানুষটার, শুধু গালমন্দ খেয়ে খেয়ে বেঘোরে মরে গেল! তুমি আগে টের পেলে
কান্নাটা বড় বেশী উথলে উঠল সত্যর।
.
রামকালী কি হঠাৎ তড়িতাহত হয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছেন? নইলে মুখের চেহারা তাঁর হঠাৎ অত অদ্ভুতভাবে বদলে গেল কি করে? যে ভ্রূকুটি নিয়ে একটা তুচ্ছ মেয়েমানুষের ধৃষ্টতার দিকে তাকিয়েছিলেন, সে কুভ্রূটি মিলিয়ে গেল কেন? হঠাৎ একটা ধাক্কা খেয়ে কি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল তার এতক্ষণকার চিন্তাধারা?
কান্না থামাও! বলে আস্তে আস্তে চলে গেলেন তিনি বারবাড়ির দিকে। গিয়ে দাঁড়ালেন ভিয়েন-ঘরে যেখানে কুঞ্জ তখন জলচৌকিটা ঘুরিয়ে নিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে বসে একসরা গরম ছানাবড়া চাখছেন।
বললেন, বড়দা, আমাকে একবার বেরোতে হবে, তুমি দেখো অতিথিদের যেন কোন অমর্যাদা না হয়।
আ-আমি! মিষ্টি গলায় বেধে গেল কুঞ্জর।
হ্যাঁ, তুমি। নয় কেন? তুমি বড়!
হ্যাঁ, বেরোবেন রামকালী। জেলেদের ঘরে গিয়ে বলতে হবে, পুকুরে আর একবার জাল ফেলানো দরকার। বাড়িতে কাজ, সন্দেহ করার কিছু নেই। ভাববে মাছের কমতি পড়েছে।
তবে রামকালী যেন বুঝছেন, ওটা নিরর্থক। কাশীশ্বরীর নাতবৌ নিজে ডুবে মরে নি, সংসারটাকে ডুবিয়েছে।
রামকালী কি তবে এবার নির্দেশের আশ্রয় খুঁজবেন? নিজের ওপর কি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন? নইলে যে প্রাণীটাকে শুধু প্রাণীমাত্র ভেবে তার ওপর বিরক্ত হচ্ছিলেন তার ধৃষ্টতার বহর দেখে তাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখছেন কেন? কেন ভাবছেন তারও কোনো প্রাপ্য পাওনা ছিল সংসারে? তাই রামকালী উপদেষ্টার দরকার অনুভব করছেন!
১৪. পালকি থেকে মুখ বাড়িয়ে
ওরে বাবা-সকল, একটু চোটপায়ে চল, তাগাদা আছে।
পালকি থেকে মুখ বাড়িয়ে আর একবার তাগাদা দিলেন রামকালী। মধ্যাহ্নের মধ্যে গিয়ে পৌঁছাতে না পারলে বিদ্যারত্ন মশাইয়ের সঙ্গে দেখা হবে না। প্রাতঃসন্ধ্যা সেরে গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে পড়েন বিদ্যারত্ন, যেটা বিদ্যারতের আবাসস্থান থেকে অন্তত তিন ক্রোশ দূরে। যাতায়াতের এই ছ ক্রোশ পাড়ি দিয়ে নিত্যাস্নানপর্ব সমাধা করে পুনরায় ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়েন তিনি গৃহবিগ্রহের ভোগ দিতে। তৎপরে প্রসাদ গ্রহণ, তার পর আবার সামান্য সময় বিশ্রাম, এই মধ্যবর্তী সময়টা কারও সঙ্গে দেখা করেন না বিদ্যারত্ন। কাজেই তার কাছে যেতে হলে ওই গঙ্গাস্নান সেরে ফেলার মুহূর্তে, নয় অপরাহ্নে।
কিন্তু অপরাহ্ন পর্যন্ত সময় কোথা রামকালীর প্রয়োজন যে বড় জরুরী!
জীবনে যখনই কোন সমস্যা সমাধানের জরুরী প্রয়োজন পড়ে, তখন রামকালী বিদ্যারত্নের দরবারে এসে হাজির দেন।
অবশ্য সে রকম প্রয়োজন জীবনে দৈবাৎই এসেছে।
সেই একবার এসেছিল নিবারণ চৌধুরীর মায়ের গঙ্গাযাত্রার ব্যাপারে। তিরানব্বই বছরের বুড়ী সজ্ঞানে গঙ্গাযাত্রা করলেন, আর সে নির্দেশ রামকালীই দিয়েছিলেন। কিন্তু বুড়ী যেন রামকালীর বিদ্যা-বুদ্ধিকে পরিহাস করে পাঁচ দিন গঙ্গাতীরের হাওয়া খেয়ে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠল। তারপর তার বায়না আমায় তোরা বাড়ি নে চল! শরীরে শক্তি আছে, বয়সে মন অবুঝ হয়ে গেছে। নিবারণ চৌধুরী রামকালীকে এসে ধরে পড়লেন, বলুন কি বিহিত?
সেই সময় চিন্তায় পড়েছিলেন রামকালী।
গঙ্গাযাত্রীর মড়া ফের ভিটেয় ফেরত নিয়ে গেলে সংসারের মহা অকল্যাণ, সদ্য ভিটেটায় তো তোলাই যাবে না তাকে। পেঁকিঘরে কি গোয়ালে বড় জোর রাখা যায়, কিন্তু নিবারণ চৌধুরীর মনোভাব দেখে মনে হয়েছিল, সেটুকুতেও তিনি নারাজ। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করেন তিনি সংসারে এত বড় অকল্যাণ ঘটাতে বুক কাঁপছে। বার বার তাই কবরেজ মশাইয়ের কাছে বিধিবিধান চেয়েছিলেন।
সেই সময় এসেছিলেন রামকালী বিদ্যারত্নের কাছে। এসে প্রশ্ন করেছিলেন, বিদ্যারত্ন মশাই, বলুন শাস্ত্র বড় না মাতৃমর্যাদা বড়?
