উঁচু ‘পোতা’র ঘর, দরজার বাইরে থেকে ছোটদের পক্ষে ভিতরটা স্পষ্ট দেখাও সম্ভব নয়।
মোক্ষদা বিনা বাক্যব্যয়ে কপাটের সামনে এসে দাঁড়ান, অতএব ঘরেই আছেন তিনি। সত্য বিরক্ত কণ্ঠে বলে, কি গো, মুখে বাক্যি-ওক্যি নেই কেন? কাঠোয়ার বৌ গেল কোথায় সেটা বলবে তো? ঘাট থেকে আরম্ভ করে সাত চৌহদ্দি ছিষ্টি খুঁজে এলাম
সহসা মোক্ষদা সরে দাঁড়ালেন, এবং সেই শূন্য স্থানে রামকালীর মূর্তিটা দেখা গেল।
বাবা!
সত্য বজ্রাহত!
এখানে বাবা! আর সত্য মুখের তোড় খুলে দিয়েছে! ছি ছি! কিন্তু বাবা এখানে কেন? তা হলে নির্ঘাত কাটোয়ার বৌয়ের হঠাৎ কোনও অসুখ করেছে, পিসঠাকুমারা তাই নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। ছি, ছি, এদিকে এই কাণ্ড, আর সত্য কিনা পান সাজার তাগাদা দিতে এসেছে! বাবা কি বলবেন! বাড়ির কোনও খবর রাখে না সত্য এইটাই প্রমাণ হবে!
মনে মনে জিভ কেটে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বেচারা। আজ আর মানসিক চাঞ্চল্য নিবারণ করতে অভ্যাসগত শাড়ির আঁচলটা নিয়ে চিবোবার উপায় নেই, পরণে উৎসব উপলক্ষে নিজের বিবাহকাল লব্ধ একখানা ভারী বালুচরী চেলি।
রামকালী ঘাড় ফিরিয়ে মোক্ষদা ভগ্নীদ্বয়কে উদ্দেশ করে মৃদুস্বরে বললেন, স্বাভাবিক ভাবে যার যা কাজ করো গে যাও, বৃথা ঘরের মধ্যে বসে থাকবার দরকার নেই। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। এসে মেয়েকে একটা সহজ পরিহাসের কথা বলে উঠলেন, ইস! মেলাই সেজেছিস যে!
কথাটা মিথ্যা নয়, শুধু বালুচরী কেন, মেয়েকে আজ একগা গয়না পরিয়ে সাজিয়েছে ভুবনেশ্বরী। কমগুলি গয়না তো হয় নি সত্যর বিয়ের সময়, পরে কবে? বাপের কথায় লজ্জিত হাসি হেসে মাথা নিচু করল। এবার রামকালী পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে গেলেন, ভাগ্নে-বৌমাকে কে ডাকছে?
ভাগ্নে-বৌমা অর্থে আপাতত শঙ্করীকেই বোঝাল। সত্য বাবার কথায় নয়, বাবার কণ্ঠস্বরে থতমত খেল, অসহায়-অসহায় চোখে বলল, ওই তো ওরা, যারা এক বরজ পান নিয়ে সাজতে বসেছে।
তাদের বলে দাও গে উনি আজ আর পান সাজতে পারবেন না। হঠাৎ যেন রামকালীও অসহায়তা বোধ করলেন, তাই তাড়াতাড়ি বললেন, আচ্ছা থাক, তোমার এখন আর ওদিকে যাবার দরকার নেই, যারা পান সাজছেন সাজুন।
কথায় কথায় পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছেন রামকালী, ঘরের পিছনে ঢেঁকি ঘরের দিকে ইচ্ছে করেই। সত্য সে খেয়াল করে না, ম্লানমুখে প্রশ্ন করে, কাটোয়ার বৌয়ের অসুখ কি বেশী বাবা?
অসুখ? কে বলবে? রামকালী চমকে উঠে সামলে নিয়ে গম্ভীর ভাবে বলেন, শোন, ওঁকে বৃথা ডাকাডাকি করো না। অসুখ করে নি, ওঁকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
.
আশ্চর্য! এ কথা কেন বললেন রামকালী!
একট আগেও কি সিদ্ধান্ত করেছিলেন তিনি এ সংবাদটা আর কারও কাছে প্রকাশ করবেন না? হয়তো আর কেউ হলেই করতেন না, হয়তো ভুবনেশ্বরী এসে প্রশ্ন করলেও তাকে এই ডাকাডাকি করো না বলেই থেমে যেতেন, কিন্তু সত্যর ওই উজ্জ্বল বিশ্বস্ত মস্ত বড় বড় চোখ দুটোর সামনে যেন সত্য গোপন করা কঠিন হল। আর রামকালীর চিন্তাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে এমনও মনে হল, এই ন বছরের মেয়েটার কাছে বুঝি তিনি চিন্তার ভাগ নেবার আশ্রয় খুঁজছেন।
কিন্তু সত্যর তো ততক্ষণে হয়ে গেছে!
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?
আস্ত একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
তাতে আবার মেয়েমানুষ! বেটাছেলে নয় যে পায়ে হেঁটে কোথাও চলে গেছে! মেয়েমানুষকে খুঁজে না পাওয়ার অর্থই নির্ঘাত বড়পুকুরের কাকচক্ষু জল। অবশ্য এ জ্ঞানটা সত্যর সম্প্রতিই হয়েছে সারদাকে উপলক্ষ্য করে। তাই চমকে উঠে বলে, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? হায় আমার কপাল, ওই ভয়ে বড়বৌকে সমস্ত রাত ঘরে ছেকল তুলে রেখে দিলাম, আর কাটোয়ার বৌ এই করল! হে ঠাকুর, আমি কেন দুটোকেই ছেকল দিলাম না?
বড় বৌমাকে ছেকল দিয়ে রেখেছিলে? চমৎকৃত রামকালী প্রশ্ন করেন।
না দিলে– সত্য উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলে, নিশ্চিন্দি হয়ে ঘুম আসে? জলচৌকির ওপর জলচৌকি বসিয়ে কত কাণ্ড করে ছেকলে হাত দিয়েছি! ভোরের বেলা মাকে বলেকয়ে খুলিয়ে দিই। হায় হায়, কাটোয়ার বৌকেও যদি বলেই সত্য সহসা সুর ফেরায়, করুণ রসের পরিবর্তে বীর রসের আমদানি করে, যাক, সে বেচারা মরেছে না জুড়িয়েছে। মানুষটা একদিন ঘাট থেকে আসতে একটু দেরি করেছে, লক্ষ্মীর ঘরে সন্ধ্যে দিতে পারে নি, তার তরে কী গঞ্জনা কী বাক্যিযন্ত্রণা! একটা মনিষ্যি, তাকে দশটা মানুষে তাড়না! বড় পিঠাটি কি সোজা নাকি? গাল দিয়ে দিয়ে আর আশ মেটে না। অত বাক্যযন্ত্রণায় পাষাণ পিরতিমে হলেও জলে গে ঝাঁপ দেয়।
রামকালী যেন ক্রমশ রহস্যের সূত্র পাচ্ছেন। বললেন, বকাবকিটা কখন হল?
এই তো কালই। অবশ্যি বৌয়েরও দোষ আছে, জল নিতে গেছ জল নিয়ে চলে এস, সন্ধ্যেভোর ঘাটে বসে থাকার দরকার কি? তবে হ্যাঁ, এনাদেরও লঘুপাপে গুরুদণ্ড! অবীরে বিধবা, মনেপ্রাণে কি সুখ আছে ওর? দু দণ্ড নয় ছিলই ঘাটে, তার জন্যে অত গালমন্দ! এই গ্রীষ্মকালে কুল কোথায় তার ঠিক নেই, সকল গাছই তো নেড়া, তবু বলে কি ঘাটে যাবার ছুতোয় কুল খাচ্ছিলি, আরও সব কত কথা– বলেই হতাশ নিঃশ্বাস ফেলা সত্য, আমি তার মানেই জানি না বাবা।
রহস্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাল সন্ধ্যায় ঘাটে যে নারীমূর্তিটি দেখেছিলেন রামকালী, সে মূর্তি তা হলে সারদার নয়, কাশীশ্বরীর নাত-বৌয়ের! আত্মহত্যার চেষ্টাই ছিল তার তখন!
