.
কিন্তু বলবার কিছু আর আছে নাকি?
আছে বলবার মত মুখ?
অথচ এত বড় ভয়ানক কথা রামকালীকে না জানিয়ে করবেন কি মুখ দুটো মেয়েমানুষ? হিতাহিত জ্ঞান কি আর কিছু আছে তাদের? মোক্ষদার আর কাশীশ্বরীর! শঙ্করী যে কাশীশ্বরীরই নাত-বৌ!
ভয়ঙ্কর খবরটা এখনও পাঁচকান হয় নি, এখনও সংসারে সবাই আপন আপন কাজে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিন্তু কতক্ষণ আর অন্যমনস্ক থাকবে লোক? কতক্ষণ আর তাদের কান বাঁচিয়ে রাখা যাবে? তার পর? এক কান থেকে পাঁচ কান, তার পরই তো লহমায় পাঁচশ কান। খড়ো চালার পাড়ায় আগুন লাগাও যা, আর একটা বিধবার কলঙ্ক-কেলেঙ্কারী প্রকাশ হয়ে যাওয়াও। এ চাল থেকে ও চাল তো এ মুখ থেকে ও মুখ। হাড়হাবাতে লক্ষ্মীছাড়া মেয়েমানুষটা নিডুবি হবার আর দিন পেল না!
যদি জলে ডুবে নিডুবি হয়ে থাকে তো সেও বরং ভাল কথা, কিন্তু যদি ভরাডুবি করে বসে থাকে?
কাশীশ্বরীর ধারণা তাই। তাই তিনি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে পড়ে আছেন। আর মর্মে মর্মে অনুভব করছেন, কেন সেই সর্বনাশীর খুড়োখুড়ী ও মেয়েকে ঘরে রাখে নি, উপযাচক হয়ে কাশীশ্বরীর গলায় গছিয়ে গেছে। হায় হায়, কালই তো টের পেয়েছিলেন কাশীশ্বরী, নাপিত-বৌয়ের কথার আঁচে, তবে কেন আবাগীর বেটিকে দুয়ারে তালা লাগিয়ে আটকে রাখেন নি! পাঁচটা কুটুমের কাছে সাফাই গাইতে বললেই হত, হঠাৎ মাথাটার কেমন দোষ হয়ে গেছে শঙ্করীর, তাই কাজের বাড়িতে ছেড়ে রাখতে সাহস করেন নি!
মোক্ষদা কিন্তু জলে ডোবার কথাই তোলেন। কোন্ রাত্তিরে কখন উঠে এ কাজ করেছে কিছু টের পাই নি রামকালী, সকালবেলাও বলি চানে গেছে না কোথায় গেছে। বেলা হতে মাথায় বজ্রাঘাত। আমার স্থির বিশ্বাস, বড় পুকুরে গিয়ে ডুবেছে কপালখাকী। এইবেলা জাল ফেলালে
না! রামকালী জলদগম্ভীর স্বরে বলেন, জাল ফেলা হবে না।
জাল ফেলা হবে না!
যন্ত্রচালিতের মত উচ্চারণ করেন মোক্ষদা।
না। এতগুলো লোকের খাওয়া পণ্ড হতে দেব না আমি।
মোক্ষদা প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ভাবে বলেন, কিন্তু একটা জীবের জীবনের চাইতে যজ্ঞিটাই বড় হল তোমার বিচারে?
শুধু আমার বিচারে নয়, যে কোন বুদ্ধিমান লোকের বিচারেই। রামকালী ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলেন, বলছ সকাল থেকে দেখতে পাও নি, ধরে নিতে হবে কাজটা হয়ে থাকে তো রাতেই হয়েছে। এখন জাল ফেললে জীবটা জীবন্ত উঠবে তোমাদের বিশ্বাস?
মোক্ষদা চুপ করে থাকেন উপযুক্ত উত্তরের অভাবে। আর কাশীশ্বরী চাপা গলায় হু-হুঁ করে দে ওঠেন।
থাম! লোকজন খাওয়ার আগে যেন টু শব্দটি না হয়। যদি ডুবে থাকে তো যতক্ষণ না ভেসে, ততক্ষণ তাকে জলের তলায় থাকতে দাও। ডুবলে ভেসে উঠতেই হবে, নদী নয় যে ভেসে চলে যাবে। কিন্তু– পায়চারি থামিয়ে রামকালী কাশীশ্বরীর খুব কাছে সরে আসেন, ঈষৎ নিচু হয়ে চাপা গম্ভীর সুরে বলেন, আর যদি ডুবে না থাকে, বৃথা জাল ফেলার পর সমাজে অবস্থাটা কি দেখাবে অনুমান করতে পারছ? ঘরের বৌ-ঝিকে আগলে আটকে রাখার ক্ষমতা যখন নেই, তখন নিজেদের জিভকেই আগলে আটকে রাখো!
কাশীশ্বরী সহসা কেঁদে ওঠেন, ও রামকালী, তুমি আমায় একটু বিষ দাও বাবা, আমি এই মুখ আর কাউকে দেখাতে পারব না।
ছেলেমানুষি করো না। মৃদুস্বরে ধমকে ওঠেন রামকালী, বিপদে মতি স্থির রাখ। আমাকে বিবেচনা করবার সময় দাও। কিন্তু এই ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি, বলছ তোমাদের কাছে শুতেন অথচ দু-দুটো মানুষ কিছু টের পেলে না তোমরা?
মরণের ঘুম এসেছিল বাবা আমাদের– কাশীশ্বরী আর একবার কেঁদে ওঠেন।
পিসীমা, হাতজোড় করছি তোমায়, হৈ-চৈ করো না। সবাইকে না হয় বলো খুড়োর অসুখের খবর পেয়ে হঠাৎ বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে।
মানুষ তো আর ঘাসের বিচি খায় না রামকালী, মোক্ষদা নিজস্ব ভঙ্গীতে ফিরে আসেন, কাল রাতদুপুর সবাইয়ের সঙ্গে কুটনো কুটেছে লক্ষ্মীছাড়ী
আশ্চর্য! আবার পায়চারি করতে করতে বলে ওঠেন রামকালী, এ রকমটা হল কেন কিছু অনুমান করতে পারছ তোমরা?
কাশীশ্বরী মুখের ঢাকাটা আরও শক্ত করে চাপা দিয়ে বলে ওঠেন, আমি পারছি রামকালী। মতিগতি তার ভাল ছিল না। ধিঙ্গী বয়েস অবধি খুড়োর ঘরে থেকেছে, মা-বাপ ছিল না যে সুশিক্ষে দেবে, উচ্ছন্নে যাওয়ার বুদ্ধির বৃদ্ধি করেছে বসে বসে! আমি বুঝছি জলে ডুবে মরে নি ও, আমাদের মুখে চুনকালিই দিয়েছে।
ঘরটা নিচু-নিচু অন্ধকার মত। জানলা আছে কি নেই, তবু রামকালীর টটকে ফরসা মুখটা আরও কত টকটকে হয়ে উঠেছে, টের পেলেন মোক্ষদা। চেয়ে চেয়ে মনে হল যেন ওই টকটকে মুখটা থেকে উত্তাপ বেরোচ্ছে। বেপরোয়া মোক্ষদাও ভয় খেলেন। কি বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
আর ঠিক এই সময় দরজার গোড়ায় কাসর বেজে উঠল।
মাজাঘষা চাচাছোলা কাসর। ওগো অ ঠাকমারা, কাটোয়ার বৌ গেল কোথায়? পান সাজবার জন্যে যে হাঁক-পাড়াপাড়ি হচ্ছে তাকে। তোমরাই বা দুই বুনে এই বেলা দুপুর অবধি শোবার ঘরে গুলতুমি করছ কেন? চান করে আবার শোবার ঘরে এসে সেঁধিয়েছ যে বড়? আর একবার চানের বাসনা আছে বুঝি? তা তোমাদের বাসনা মেটাও, বৌকে পাঠিয়ে দাও।
ঘরে ঢোকবার অধিকার নেই তাই বাইরে দাঁড়িয়েই বাক্যস্রোত বইয়ে দেয় সত্য। ধারণাও করতে পারে না ঘরের ভিতরে তার বাপের উপস্থিতি সম্ভব।
