এই হল তা তো বুঝলাম, কিন্তু আমার কি হবে তাই বল? দাঁড়িয়ে অপমান হতে বলিস আমায়?
অপমান! তুষ্টু বীরবিক্রমে বলে ওঠে, বলি একটা ঘাড়ে বিশটা মাথা কার আছে কবরেজ ঠাকুর যে আপনাকে অপমান্যি করবে?
মাথা এ গাঁয়ের এক একজনের একশটা করে, বুঝলি রে তুই! বলে হাসলেন রামকালী, আর ঠিক সেই সময় নেড়ু আর একবার মিহিগলায় ডাক দিল, মেজখুড়ো!
আরে, এ ছোকরা তো ভাল বিপদ করল! কে তোকে পাঠিয়েছে শুনি?
পিসঠাকুমা।
রামকালী বিরক্তভাবে বললেন, তা আমি বুঝেছি, নইলে আর কার এত– বোধ করি কার
বে আক্কেল হবে বলতে যাচ্ছিলেন, সামলে নিলেন। ছোটদের সামনে গুরুজন সম্পর্কে তাচ্ছিল্যসূচক মন্তব্য করবার মত অসতর্কতা এসেছিল বলে রীতিমত বিরক্ত হলেন নিজের উপর। অথচ মোক্ষদার মত কাণ্ডজ্ঞানহীন গুরুজন সম্পর্কে সকলপ্রকার সমীহনীতি মেনে চলাও শক্ত।
অসতর্কতা সামলে নিয়ে বললেন, বল গে যাও আমার এখন বিস্তর কাজ, তার যা বলবার যখন ভেতরে যাব তখন যেন বলেন।
তুমি এ কথা বলবে পিসঠাকুমা জানে, তাই আমাকে বলে দিল– নেড়ু ঢোঁক গিলে বলে, বলে দিল বল গে যা বড় পিসঠাকুমার ভেদবমি হয়েছে, বাঁচে কি না, এক্ষুনি দরকার।
মুখটা আরো কুঁচকে উঠল রামকালীর। পিসীর ভেদবমির দুর্ভাবনায় নয়, মেয়েমানুষের বিবেচনাহীন আবদারের ধৃষ্টতা দেখে। রোগ যে কাশীশ্বরীর হয় নি সেটা নিশ্চিত, তবু অনর্থক হয়রানি করতে ডাকাডাকি। হয়তো বা অভ্যাগত কুটুম্বিনীদের নিয়ে কোনরূপ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, আর সালিশ মানতে ডাকা হয়েছে রামকালীকে। কিন্তু এই কি তার সময়?
সাতপাড়া লোক নেমন্তন্ন হয়েছে, একদিনের যোগাড়ে যজ্ঞি, মাথায় পর্বত বয়ে ঘুরছেন রামকালী, তখন কিনা এই সব মেয়েলিপনা!
তা ছাড়া আরও বিরক্তিকর, ছোট ছেলেটাকে মিথ্যে কথায় তালিম দিয়ে পাঠানো। কিন্তু যে রাগিণী মোক্ষদা, নেড়ুকে ফেরত দিলে নির্ঘাত নিজেই এখুনি রণরঙ্গিনী মূর্তিতে বার-উঠানেই হানা দেবেন এবং পাঁচজনের কান বাচাবার চেষ্টামাত্র না করে বকাবকি শুরু করবেন, পয়সার দেমাকে ধরাকে সরা দেখিস নে রামকালী, গুরুজন বলে একটু সমেহা করিস।–হ্যাঁ, এরকম কথা স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন মোক্ষদা, দ্বিধামাত্র করেন না।
সংসারের এই একটা মানুষকে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারলেন না রামকালী। পারতেন, অনায়াসেই পারতেন, যদি সত্যিই রামকালীর গুরুজনে সমীহবোধ না থাকত। গুরুজন হয়েই মোক্ষদা রামকালীকে জব্দে ফেলেছেন।
কিন্তু শুধুই কি গুরুজন বলে জব্দ?
আরও একজনের কাছেও কি মাঝে মাঝে জব্দ হয়ে পড়েন না রামকালী? যে মানুষটা নিতান্তই লঘুজন! হ্যাঁ, মনে মনে স্বীকার না করে পারেন না রামকালী, মাঝে মাঝে সত্যবতীর কাছে জব্দ হতে হয় তাঁকে, হার মানতে হয়। কিন্তু তাতে কি বিরক্তি আসে?
মেজখুড়ো! ছেলেটাও কম নয়। তাই রামকালীর কোঁচকানো ভুরু দেখেও ভয়ে পালিয়ে গেল, বলল, পিসঠাকুমা তোমায় চুপি চুপি ডেকে নিয়ে যেতে বলল, খুব বিপদ!
আঃ, এ তো আচ্ছা মুশকিলে ফেলল।
বিপদটা তো দেখছি আমারই! বলে রামকালী হাঁক দিলেন, তুষ্টু, দই সব ভেতর-দালানে তুলে দাও, আর খোঁজ করে দেখ আর কারও ঘরে আরও দু-দশ সের পাওয়া যাবে কিনা।
পাওয়া গেলে তো ঠাকুর মশাই, আমি নিজেই তুষ্টু মাথা চুলকে ধৃষ্টতা করে বসে, তা তোমার আজ্ঞে পাঁচ মণই কি কম? এ তো বড় খোকার পেরথম বিয়ে নয়
রামকালী ভুরুটা একবার কুঁচকেই মৃদু হাসলেন। বললেন, কথাটা গয়লার ছেলের মতই বলেছিস তুই, পেরথম বিয়ে নয় বলে কুটুম্বজনকে খাওয়াতে বসে অপরিতুষ্ট রাখব? আচ্ছা তুই ওগুলো তুলে দে গে, আসছি আমি।
.
নেড়ুর সঙ্গে সঙ্গে ভিতরবাড়িতে ঢুকলেন রামকালী, মাঝখানে প্রকাণ্ড উঠোনটা পার হয়ে। এই মাঝের উঠোনেই ধানের গোলা মরাই, সারা বছরের জ্বালানী কাঠের মাচা, চালার নিচে জালা জালা বীজধান।
নেড়ু দিগ্বিজয়ীর মত কাশীশ্বরীর ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল, কারণ রামকালীকে ডেকে আনার ভার আর কেউ নিতে চায় নি। সত্য পর্যন্ত ঝাড়া জবাব দিয়েছিল, এই দেখলাম বড় পিসঠাকমা চান করে এল, এক্ষুনি আবার কী ব্যায়োয় ধরল যে বাবাকে শত কষ্মের মধ্যে থেকে ডেকে আনতে যাব? মানুষটার কি এখন মাথার ঠিক আছে? ঘরে তো জোয়ানের বড়ি আছে, তাই খেয়ে নাও না।
তুই বেরো দজ্জাল হারামজাদী বলে মোক্ষদা নেড়ুকে ধরেছিলেন।
কিন্তু নেড়ুদের তো আর গিন্নীদের ঘরে ওঠবার হুকুম নেই, তাই এই যে ঠাকুমা– বলে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিচু দরজা, রামকালী খড়ম খুলে মাথা নিচু করে ঢুকলেন। আর সমস্ত ভুলে মোক্ষদা তুই পালা লক্ষ্মীছাড়া ছেলে বলে নেড়ুকে তাড়া দিয়ে বিদেয় করলেন।
রামকালী দেখলেন কাশীশ্বরী মাটিতে শুয়ে আছেন থানের আঁচলটুকু মুখে চাপা দিয়ে। এটা আবার কি! নিশ্চয় কোন মান-অভিমানের ব্যাপার। বিরক্তি এল, তবু শান্তভাবেই বললেন, কি ব্যাপার!
ব্যাপার বেশ উত্তম- চাপা গলায় এটুকু জ্ঞান দান করে মোক্ষদা আরও ফিস ফিস করে বললেন, দুয়োরটা ভেজিয়ে দিয়ে তবে শুনতে হবে।
রামকালী একবার বাইরে তাকালেন। শুচিবাই মোক্ষদাদের এই দিকটা বাদে সারা বাড়ি লোকে লোকারণ্য, এর মধ্যে কপাট ভেজিয়ে গুপ্তমন্ত্রণা! তিনি তো পাগল হন নি! গম্ভীর গলায় বললেন, কপাট থাক, কি বলবার আছে বলো।
